বছির বলল, মাইনষে কয়, যুজ নিকি মোন্দ, আমরা কই যুজ্যু ভালা। যুজুর কালানে (কল্যাণে) বউ-পোলার মুখে হাসন ফুটছে।
আর কিছুক্ষণ হয়তো গল্প টল্প করত বছিররা, তা আর হল না। ঠিকাদারের একটা লোক শকুনের চোখ নিয়ে চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সে প্রায় তাড়া করে এল। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে লোকটা অশ্লীল খিস্তি দিল প্রথমে। তারপর বলল, সুমুন্দির পুতেরা, গপ (গল্প) মারনের জাগা পাও না! দুই ঝোড়া মাটি ফেলাইয়া নয় সিকা পহা গইনা লইতে বড় সুখ! আইজ শালা তোগো মজুরি যদি না কাটি তো আমার নাম ফিরাইয়া রাখিস।
বছির আর তাহেরের মুখ ম্লান হয়ে গেল। বিষণ্ণ সুরে তারা বলল, যাই ছুটোবাবু, অহন আর খাড়নের সোময় নাই।
বিনু বলল, একদিন এস আমাদের বাড়ি।
যামু।
দেখতে দেখতে নদীপাড়ের নিচু জমি উঁচু হল। তার ওপর সারি সারি ব্যারাক উঠল মিলিটারিদের জন্য।
শুধু কি তাই, রাজদিয়ায় আগে বিজলি আলো ছিল না। মিলিটারির কল্যাণে, যুদ্ধের কল্যাণে রাতারাতি তা এসে গেল। অবশ্য বিজলি আলোটা সাধারণ মানুষের জন্য নয়, শুধু মিলিটারির জন্য। রাজদিয়ার একমাত্র বড় রাস্তাটাকে দ্বিগুণ চওড়া করে পিচ ঢেলে চেহারা একেবারে বদলে দেওয়া হল। নতুন নতুন আরও অনেকগুলো কংক্রিটের রাস্তাও তৈরি হল। সব চাইতে মজার ব্যাপার যেটা তা হল এইরকম। এখানকার যত তালগাছ, সেগুলোর মাথা কেটে আলকাতরা দিয়ে কালো রং করে দেওয়া হল, সেগুলোকে এখন অ্যান্টি-এয়ারক্র্যাফট কামানের মতো দেখায়। অনেকগুলো নকল কামানকে নদীর ধারে ধারে আবার হেলিয়ে রাখা হয়েছে।
এখন সারাদিন সারারাত রাজদিয়া জুড়ে কাজ চলছে। অগুনতি ঠিকাদার আর হাজার হাজার মজুর শুধু খেটেই যাচ্ছে। রোড রোলার এবং নানারকম যন্ত্রের শব্দে জায়গাটা আজকাল সরগরম।
রাজদিয়ার গায়ে যেন ময়দানবের ছোঁয়া লেগেছে। এতকাল জায়গাটা যেন ঘুমিয়ে ছিল। শতাব্দীর অতল নিদ্রা থেকে সে আচমকা জেগে উঠেছে।
কদিন আগেও এখানকার জীবন ছিল স্তিমিত, বেগবর্ণহীন, নিস্তরঙ্গ। তিরতিরে স্রোতের মতো যুগ-যুগান্তরের ওপর দিয়ে নিঃশব্দে, চুপিসারে অতি সঙ্গোপনে সময়ের ধারা বয়ে যেত। রাজদিয়ার সেই শান্ত, অচঞ্চল জীবনযাত্রায় হঠাৎ যেন জলোচ্ছ্বাসের বেগ এসেছে।
আগে আগে সারাদিনে গোয়ালন্দের একখানা স্টিমার আসত। আজকাল যাত্রীবাহী স্টিমার তো আছেই। তা ছাড়া, সপ্তাহে একবার করে মিলিটারিদের সেই স্টিমারটা সৈন্যসামন্ত, লরি-ট্রাক-জিপ এবং অসংখ্য সরঞ্জাম নিয়ে আসছে। মিলিটারিদের স্টিমারটা এলে জেটিঘাট থেকে নতুন ব্যারাকগুলো পর্যন্ত রাস্তাটা দিয়ে তোক চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। কাছাকাছি কারোকে এগোতে পর্যন্ত দেওয়া হয় না। সাধারণ পুলিশ টুলিশ নয়, কয়েক শ’ মিলিটারি পুলিশ জায়গাটাকে ঘিরে ফেলে। তারপর কী সব জিনিসপত্র ঢাকাটুকি দিয়ে সবার অলক্ষ্যে ব্যারাকের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
আড়ালে রাজদিয়ার বাসিন্দারা ফিসফিস করে, শালারা কী আনছে কও দেখি?
ক্যামনে কই?
আমার মনে লয়, কামান আর গোলাগুলি।
হইতে পারে। ঢাইকা ঢুইকা আনে ক্যান?
কী জানি। যুজ্যে বুঝি গুপন (গোপন) রাখা নিয়ম।
বিনু লক্ষ করেছে, প্রথম দিন স্টিমারটা এসেছিল দুপুরবেলায়। আজকাল বেশির ভাগ আসে রাতের দিকে। রাত্রিবেলা কখন আসে, টের পাওয়া যায় না। সমস্ত রাত ওখানে থেকে কী করে, কে বলবে। তবে সকাল হলেই রাজদিয়াবাসীরা দেখতে পায়, স্টিমারটা জেটিঘাট ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
আগে ফিটন আর কদাচিৎ দু’একখানা সাইকেল ছাড়া এখানে অন্য কোনও রকম গাড়িটাড়ি ছিল না। ইদানীং দিনরাত রাজদিয়ার হৃৎপিন্ড কাঁপিয়ে মিলিটারি ট্রাক-জিপ ছুটতে থাকে। শোনা যাচ্ছে, এখানে নাকি একটা এরোড্রোমও তৈরি হবে।
মিলিটারি ব্যারাক, রাস্তাঘাট, বিজলি আলো–এত কিছু হয়েছে রাজদিয়াতে, তবু যেন কাজের শেষ নেই। ব্যারাকের উলটো দিকের ফাঁকা জায়গাগুলোতে কাঁচা বাঁশের চালা তুলে ঠিকাদার আর মজুরদের থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে।
আগে রাজদিয়াতে চায়ের দোকান একটাও ছিল না। দোকান দূরের কথা, চা খাওয়ার রেওয়াজই ছিল না। রাজদিয়ার মোট সাতটি বাড়িতে চা ঢুকত। আজকাল মজুরদের অস্থায়ী আস্তানাগুলোর গায়ে কম করে কুড়িটা চায়ের দোকান বসেছে।
.
২.২৭
এক ছুটির দিনের সকালে পুবের ঘরের দাওয়ায় বসে হেমনাথরা আসর জমিয়েছেন। স্কুল কলেজ বন্ধ। রান্নাবান্নার তাড়া ছিল না। সকাল থেকেই দিনটার গায়ে যেন আলস্য মাখানো। স্নেহলতারা। পর্যন্ত রান্নাঘর ছেড়ে গল্প করতে বসেছেন।
কথা হচ্ছিল এই রাজদিয়া নিয়ে। খুব চিন্তিত মুখে হেমনাথ বললেন, কী জায়গা ছিল আর এখন কী দাঁড়িয়েছে।
অবনীমোহন বললেন, আমরা এসেও যা দেখেছি তা আর নেই। রাতারাতি সব বদলে গেল।
তা বদলাক। রাস্তাঘাট হয়েছে। ইলেকট্রিক আলো এসেছে। এখন অবশ্য মিলিটারির জন্যে, দুদিন পর আমাদের ঘরেও আসবে। কিন্তু–
কী?
একটা বড় সাঙ্ঘাতিক খবর শুনলাম অবনীমোহন–
কী খবর মামাবাবু?
মিলিটারিরা মদদ খেয়ে রামকেশবদের পাড়ায় খুব হামলা করেছে। সেদিন নাকি অতুল নাহাদের বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল।
আমিও শুনেছি।
সন্ধেবেলা মেয়েদের নিয়ে রাস্তায় বেরুনো এখন নিরাপদ নয়। পরশু দিন রাত্তিরে দুটো মাতাল টমি রুদ্রবাড়ির আরতিকে তাড়া করেছিল। ভাগ্য ভাল, সেইসময় মিলিটারি পুলিশের একটা জিপ এসে পড়ে। তাতে মেয়েটি বেঁচে যায়। বেশ শান্তিতে ছিলাম আমরা। কী উৎপাত শুরু হল বল দেখি—
