বিনুরা দেখল, অনেক লোক স্টিমারঘাটের দিকে ছুটছে। দেখাদেখি ওরাও ছুটল এবং মুহূর্তে সেখানে পৌঁছেও গেল।
স্টিমারঘাটের জেটিটাকে ঘিরে মেলা বসে গেছে যেন। রাজদিয়ার যত দোকানদার-আড়তদার মাছ ব্যাপারি, সবাই ছুটে এসেছে।
স্টিমার, এমনকি জেটির ওপরেও কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। অগুনতি পুলিশ চারদিক ঘিরে রেখেছে। এগুতে চাইলেই লাঠি তুলে তাড়া করে আসছে।
ভিড়ের ফাঁক দিয়ে একসময় বিনুরা দেখে ফেলল, স্টিমার থেকে বিশাল ফৌজ নামছে।
চারপাশের ভিড়টা চাপা ভীতু সুরে বলাবলি করতে লাগল, সৈন্য আইছে। রাইজদাতেও তাইলে যুজ্ঞা আইসা গেল!
হায় আল্লা, কী হইব!
হা ভগমান, কপালে কী লেখছিলা!
২.২৬-৩০ সেটেলমেন্ট অফিস
২.২৬
কয়েকদিনের ভেতরেই দেখা গেল সেটেলমেন্ট অফিসের পেছন দিকে যে বিশাল ফাঁকা মাঠখানা পড়ে ছিল, তারকাটা দিয়ে সেটা ঘিরে ফেলা হয়েছে, এবং তার মধ্যে মিলিটারির জন্য সারি সারি অসংখ্য তবু উঠেছে।
শুধু তাই নয়, বরফকল এবং মাছের আড়তগুলোর ওধারে একেবারে নদীর ধার ঘেঁষে মাইলের পর মাইল নিচু জমি পড়ে ছিল। বর্ষায় জায়গাটা জলে ডুবে যায়, অন্য সময় কাদায় থক থক করে। তার ওপর জলসেঁচি আর বিশল্যকরণীর বন উদ্দাম হয়ে বাড়তে থাকে। কাদাখোঁচা আর পাতিবকের দল নরম মাটিতে হাঁটু পর্যন্ত ডুবিয়ে জলসেঁচির বনে সারাদিন কী যে খুঁজে বেড়ায়!
মিলিটারির নজর পড়ল জায়গাটার ওপর। কোত্থেকে ঠিকাদাররা এসে গেল। চারধারের গ্রাম গঞ্জ থেকে, নদীর ধু ধু চর থেকে, মোটা মজুরির লোভ দেখিয়ে হাজার দুই তিন লোক জুটিয়ে ফেলল তারা। কানের কাছে কাঁচা পয়সার ঝনঝনানি চলতে থাকলে কতক্ষণ কে আর ঘরে বসে থাকতে পারে।
মজুরদের প্রায় সকলেই ভূমিহীন কৃষাণ। অন্যের জমিতে ধান কেটে, হাল দিয়ে এবং আরও হাজারটা উঞ্ছবৃত্তিতে তাদের দিন কাটত। বছরের বেশির ভাগ সময়ই তাদের জীবনে দুর্ভিক্ষ লেগে আছে।
ঠিকাদাররা প্রথমে তাদের মাটি ভরাটের কাজে লাগাল। নিচু জমিটাকে রাস্তার সমান উঁচু করতে হবে।
সারাদিন কাজ তো চলেই, রাত্তিরেও নিশ্বাস ফেলবার সময় নেই। আলো জ্বালিয়ে মাটি ফেলা হচ্ছে তা হচ্ছেই।
স্কুলে যাবার পথে সময় হয় না। তবে টিফিনে কি ছুটির পর শ্যামলকে সঙ্গে নিয়ে বিনু ওখানে চলে যায়। দু তিন মাইল জায়গা জুড়ে হাজার কয়েক লোক ঝোড়া বোঝাই করে এনে মাটি ফেলছে। মজুরদের ব্যস্ততা, ঠিকাদারের লোকদের ধমক, খিস্তি খেউড়, চিৎকার, হই হই–সব মিলিয়ে বিরাট ব্যাপার।
বিনু বলে, ওখানে কী হবে বলতে পার?
শ্যামল বলে, কী জানি—
ঠিকাদারের লোকেরা, যারা মজুর খাটায়, জিজ্ঞেস করলে বলে, দেখ না, কী হয়। বলেই ব্যস্তভাবে চলে যায়।
একদিন দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সেই লোকগুলোকে দেখতে পেল বিনু তাহের, বছির, বুড়ো খলিল। ওরা সবাই চরের মুসলমান। প্রতি বছর ধানকাটার সময় চুক্তিতে কাজ করতে আসে। এবারও অঘ্রাণ মাসে এসে তারা বিনুদের ধান কেটে গেছে।
বছরে মাস দুয়েকের মতো বছিররা রাজদিয়ায় এসে থাকে। আসে অঘ্রাণের মাঝামাঝি, মাঘ পড়তে না পড়তে চলে যায়। কোনও কোনও বার অবশ্য দেরিও হয়, যেতে যেতে মাঘের শেষ কিংবা ফাল্গুনের শুরু।
ধানকাটার মরশুম বাদ দিলে বছরের অন্য সময় বছিরদের রাজদিয়ায় দেখা যায় না। এবারটা কিন্তু ব্যাতিক্রম। এই তো সেদিন ধান কেটে গেল ওরা। এর মধ্যেই আবার মাটি ভরাটের কাজে ফিরে এসেছে।
বিনুকে এগিয়ে গিয়ে কথা বলতে হল না। মাটি ফেলতে ফেলতে বছিররাই তাকে দেখে ফেলল। দেখামাত্র বছির আর তাহের লম্বা লম্বা পা ফেলে কাছে এল। খুশি গলায় বলল, বাবুগো পোলা না?
বিনু মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।
বিনুর হাতে বই খাতা-টাতা ছিল। বছির বলল, ইচকুল(স্কুল) থিকা আসলেন বুঝিন?
হ্যাঁ। একটু আগে ছুটি হল।
হ্যামকত্তায় ভাল আছে?
হ্যাঁ।
জামাইকত্তায়?
হ্যাঁ।
বাড়ির আর হগলে?
সবাই ভাল। তোমরা?
খোদা য্যামন রাখছে।
একটু নীরবতা। তারপর বিনু শুধলো, এখানে কদ্দিন কাজ করছ?
বছির হিসেব করে বলল, দশ দিন। একটু চুপ করে থেকে উজ্জ্বল, উৎফুল্ল মুখে আবার বলল, বাহারের কাম ছুটোবাবু।
বিনু উৎসুক সুরে জানতে চাইল, কিরকম?
রোজ নয় সিকা কইরা মজুরি। তাইলে হিসাব কইরা দ্যাখেন, দশ দিনে কত টাকা পাইছি। বাপের জম্মে অ্যাত টাকার মুখ আর দেখি নাই। বলে তাহেরের দিকে তাকাল বছির, না কি কও তাহের ভাই?
দেখা গেল তাহেরের এ ব্যাপারে দ্বিমত নেই। জোরে জোরে মাথা নেড়ে সে বলল, সাচা কথা।
বছির বলতে লাগল, হেই ইনামগুঞ্জ, নিশিন্দার চর, চরবেউলা, গিরিগুঞ্জ, কেতুগুঞ্জ, ডাকাইতা পাড়া-যেইখানে যত কিষান আছে, হগলে মাটি কাটার কামে আসছে। আসব না ক্যান? অ্যাত মজুরি, অ্যাত টাকা পাইব কই? শুনতে আছি–
কী?
সুজনগুঞ্জেও নিকি মাটি কাটার কাম শুরু হইব।
কে বললে?
পরস্পর কানে আইল।
ওখানে মাটিকাটা কেন?
সৈন্যগো পেয়োজন (প্রয়োজন)।
ওখানেও সৈন্য যাবে! বিনু অবাক।
বছির বলল, হেই তো শুনতে আছি।
বিনু চুপ করে থাকল।
বছির উৎসাহের গলায় বলতে লাগল, এইরকম কাম যদিন মিলে, কিষানরা আর চাষবাস করব না। জমিন ফেলাইয়া হগলে যুজ্যের কামে লৌড়াইব।
তাহের বলল, ভাগ্যে যুজ্যু বাধছিল! দুইখান পহা নাড়াচাড়া করতে পারি, পোলামাইয়ারে দুই বেলা প্যাটভরা ভাত দিতে পারি। হায় রে আল্লা, জম্ম ইস্তক কী দিনই না গ্যাছে!
