স্নেহলতা ছাড়া একে একে অন্য শ্রোতার দলে চলে যেতে লাগল।
সবাই চলে গেলে ঘর যখন ফাঁকা, স্নেহলতা শুধোলেন, একটা কথা সেন ঠাকুরপো—
ত্রৈলোক্য সেন উৎসুক চোখে তাকালেন, কী?
মগের মুল্লুকে সবই তো ফেলে টেলে এসেছেন। কিছুই আনতে পারেন নি।
হ্যাঁ।
টাকাপয়সার দরকার থাকলে কিন্তু বলবেন। একটুও লজ্জা করবেন না।
আপনাদের কাছে লজ্জার কিছু আছে নাকি। তবে–
কী?
টাকাপয়সার এখন দরকার নেই বৌ-ঠাকরুন।
কিছুই আনতে পারেন নি অথচ পয়সাকড়ির প্রয়োজন নেই, ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছিলেন না স্নেহলতা। বিমূঢ়ের মতো তিনি তাকিয়ে থাকলেন।
স্নেহলতার মনোভাব খানিক যেন অনুমান করতে পারলেন ত্রৈলোক্য। হাসতে হাসতে বললেন, তা হলে আপনাকে একটা কথা বলি–
কী?
হাজার বিশেক টাকা আমি আনতে পেরেছি।
কিভাবে? বিস্ময়ে আর উত্তেজনায় গলা কাঁপতে লাগল স্নেহলতার, ডাকাতরা ধরে নি?
আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে ত্রৈলোক্য সেন বললেন, সে একটা চালাকি করেছিলাম বৌ-ঠাকরুন। পা যেন ভেঙে গেছে, তা দেখাবার জন্যে হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত ব্যান্ডেজ করে নিয়েছিলাম। ব্যান্ডেজের ভঁজে ভাঁজে একশ’ টাকার নোট রেখেছি। লোকের চোখে ধুলো ছিটোবার জন্যে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতাম। কিরকম ফন্দি খাঁটিয়েছিলাম বলুন তো? চোখেমুখে গর্বের ভাব ফুটিয়ে ত্রৈলোক্য তাকালেন।
গালে হাত দিয়ে মাথাটি হেলিয়ে দিলেন স্নেহলতা, বাব্বা, আপনার মাথায় এতও এসেছিল?
ত্রৈলোক্য হাসতে লাগলেন, হাজার হোক ওরা মগ ডাকাত। আর আমি–
আপনি কী?
ঢাকাইয়া পোলা। শব্দ দু’টো পূর্ব বাংলার টান দিয়ে উচ্চারণ করলেন ত্রৈলোক্য।
স্নেহলতা এবার হেসে ফেললেন।
কথায় কথায় বেলা ফুরিয়ে এল। শীতের অবেলায় রোদের রং যখন বাসি হলুদের মতো সেই সময় ত্রৈলোক্য সেনের স্ত্রী, ছেলে, ছেলের বৌ, অন্য নাতি-নাতনীরা নিজেদের বাড়ি দেখে ফিরে এল।
অগত্যা আরও কিছুক্ষণ বসে যেতে হল বিনুদের। স্নেহলতা ত্রৈলোক্য সেনের স্ত্রী এবং ছেলের বৌদের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে ফেললেন।
দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে এল। নদীর দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস ছুটে আসতে লাগল। হিমে কুয়াশায় চারদিক ঝাঁপসা, অস্পষ্ট। কাছাকাছি ঝোঁপঝাড়গুলোর ভেতর থেকে শিয়ালের ডাক ভেসে আসছে। আলোর ছুঁচের মতো অন্ধকারকে বিধে বিঁধে জোনাকিরা একবার জ্বলছে, একবার নিবছে। সারা রাতের জন্য এই জ্বলা এবং নেবার খেলা চলবে।
বাইরের দিকে তাকিয়ে চঞ্চল হলেন স্নেহলতা, এবার আমরা যাই বোন।
ত্রৈলোক্য সেনের স্ত্রী বললেন, এখনই যাবেন দিদি?
হ্যাঁ। রাতের রান্না পড়ে আছে। গিয়ে বসাতে হবে। তোমরা যেও–
বুঝতেই তো পারছেন দিদি, এখন যাওয়ার খুব অসুবিধে। নিজের বাড়িঘরে থিতু হয়ে বসি, তারপর যাব।
বাড়ি যেতে কদ্দিন লাগবে?
আজই সবে কামলা লাগল। সাত আট দিনের আগে সারাই টারাই হবে বলে তো মনে হয়।
বাড়ি গিয়ে বসবার পরই তা হলে যেও।
যাব। আপনারও আসবেন।
আসব। বলতে বলতে উঠে পড়লেন স্নেহলতা।
.
২.২৫
দিনকয়েক পর শ্যামল বিনুদের ক্লাসে ভর্তি হয়ে গেল। এখন রোজই তার সঙ্গে দেখা হয়। দিনের অনেকখানি সময় এক সঙ্গে কাটে দু’জনের।
কলকাতা থেকে আসার পর এখানে বিশেষ বন্ধু টন্ধু পায় নি বিনু। ক্লাসের ছেলেরা অবশ্য ছিল। কিন্তু তাদের সঙ্গে তেমন মিশত না।
বন্ধুর জন্য বিনুর প্রাণের যে জায়গাটা ফাঁকা পড়ে ছিল, শ্যামল এসে তা ভরিয়ে তুলল।
টিফিনের সময় কিংবা স্কুল ছুটির পর বিনুরা নদীর পাড়ে গিয়ে বসে। কখনও হাঁটতে হাঁটতে বরফ কল, স্টিমারঘাটের দিকে চলে যায়।
এর মধ্যে বর্মার অনেক গল্প করেছে শ্যামল। রেঙ্গুন শহর, শোয়েডাগন প্যাগোডা, রয়াল লেক, বর্মিদের জল-উৎসব, সাগরের জলে ভরপুর নীলকণ্ঠ ইরাবতী–এমনি অজস্র গল্প।
একদিন গল্প করতে করতে শ্যামল বলল, জানো বিনু, দু’জনের জন্যে আমার ভারি কষ্ট হয়।
তারা কে?
সুব্রত আর মা-পোয়ে। সুব্রত ছিল আমার প্রাণের বন্ধু, রেঙ্গুনে আমরা এক রাস্তাতেই থাকতাম। বোমা পড়বার পর সবাই যখন পালাচ্ছে, সুব্রতরা জাহাজের টিকিট পেয়ে গেল। ওরা কলকাতায় এসেছিল, তারপর কোথায় গেছে, কে জানে। জীবনে আর হয়তো কোনও দিন ওর সঙ্গে দেখা। হবে না। বলতে বলতে কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে ওঠে শ্যামলের। চোখমুখ বিষণ্ণ দেখায়।
বিনু শুধোয়, মা-পোয়ে কে?
একটা বার্মিজ মেয়ে। ওরা আমাদের পাশের বাড়িতে থাকত। ওর বাবা আমার বাবার বন্ধু। আমাদের বাড়ি ওরা সবসময় আসত, আমরাও ওদের বাড়ি যেতাম। বোমা পড়বার পর মা-পোয়েরা মান্দালয়ের দিকে গেল, আমরা এলাম এই রাজদিয়াতে।
বিনু এবার কিছু বলল না।
একটু চুপ করে থেকে শ্যামল বলল, মা-পোয়ের মা আর বাবা আমাকে খুব ভালবাসতেন। ওঁদের খুব ইচ্ছে ছিল, বড় হলে মা-পোয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে দেবেন। আমার মা-বাবারও ইচ্ছে ছিল।
একটা কথা মনে হতে বিনু তাড়াতাড়ি বলে উঠল, মা-পোয়েরা বার্মিজ না?
হ্যাঁ।
বার্মিজদের সঙ্গে বাঙালির বিয়ে হয়?
অনেক হয়েছে। বর্মায় গিয়ে দেখে এস না–
এরপর আর কেউ কিছু বলল না। শ্যামল উদাস চোখে অনেক দূরে নদীর ওপারে ধু ধু বনানীরেখার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে।
একদিন স্কুল ছুটির পর বিনুরা অলস পায়ে নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ তাদের চোখে পড়ল, স্টিমারঘাটে নতুন একটা স্টিমার এসে লেগেছে। গোয়ালন্দ থেকে রোজ সকালে যে সাদা ধবধবে স্টিমার যাত্রী নিয়ে আসে এটা সেইটা নয়। এর রং ধূসর, আকারেও অনেক বড়।
