ত্রৈলোক্য বলতে লাগলেন, বোমা পড়বার সঙ্গে সঙ্গে রেঙ্গুন টেঙ্গুন থেকে পালোনোর হিড়িক লেগে গেল। কিন্তু যাবে কোথায়? বার্মিজরা গ্রামের দিকে পালাল। আর ইন্ডিয়ানরা ভারতবর্ষের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু আসতে চাইলেই তো আসা যায় না। দশ দিন আরও দিন পর একটা করে কলকাতার জাহাজ। দামের তিন গুণ দিয়েও তার টিকিট পাওয়া যায় না। সেই জাহাজ আসাও একদিন বন্ধ হয়ে গেল। এদিকে রেঙ্গুনে বসে থাকা মানে নির্ঘাত মৃত্যু। অগত্যা বহু মানুষ হাঁটা পথ ধরল, আমরাও পা দু’খানার ওপর ভরসা করে রওনা হলাম।
স্নেহলতা বললেন, তারপর?
সে যে কী কষ্ট, বলে বোঝাতে পারব না বৌ-ঠাকরুন। পাহাড় পর্বত বন-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে দিনের পর দিন হাঁটছি তো হাঁটছিই। হাঁটতে হাঁটতে পা ফুলে গেল। কত লোক যে রাস্তায় পড়ে মরেছে, তার হিসেব নেই। খাদ্য নেই, জল নেই। খিদের জ্বালায় পেট পুড়ে গেছে, তেষ্টায় ছাতি ফেটে গেছে। কোথাও ঝরনা দেখে হয়তো ছুটে গেছি। কাছে যেতেই চোখে পড়েছে, দা হাতে মগেরা দাঁড়িয়ে আছে। দশ টাকা করে দিলে এক বালতি জল পাওয়া যাবে। ভয়ে ভয়ে ফিরে এসেছি। কোথাও বনের ভেতর কলা ফলে আছে। সেখানেও দা হাতে মগ। হাঁটতে হাঁটতে বাচ্চাগুলোর জ্বর হয়ে গেল। তাদের কাঁধে তুলে চলতে লাগলাম।
স্নেহলতা বললেন, আহা রে–
বর্মা থেকে রাজদিয়া পর্যন্ত পথের ভয়াবহ নিদারুণ বর্ণনা দিয়ে যেতে লাগলেন ত্রৈলোক্য, রাস্তায় কতবার যে ডাকাতের হাতে পড়েছি তার হিসেব নেই। শুধু আমরাই তো নই, বর্মা থেকে আরও অনেক মানুষ আসছিল। ডাকাতরা যদি টের পেয়েছে, কারোর সঙ্গে টাকা পয়সা সোনাদানা আছে, গলার কাছে রামদা ধরে সব কেড়ে কুড়ে নিয়েছে। দিতে না চাইলে স্রেফ কেটে ফেলেছে। এভাবে যে কত লোক প্রাণ দিয়েছে তার হিসেব নেই বৌ-ঠাকরুন।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যাচ্ছিল বিনু। হঠাৎ পাশ থেকে কে ডাকল, এই
চমকে সেদিকে তাকাল বিনু। দেখল সেই ছেলেটা, যার নাম শ্যামল। চোখাচোখি হতেই শ্যামল হাসল। বলল, তোমার নাম কি ভাই?
বিনু স্কুলের ভাল নামটাই বলল, বিনয়কুমার বসু–
শ্যামল বেশ সহজ সাবলীল ছেলে, সঙ্কোচ টঙ্কোচ তার নেই বললেই হয়। হাসতে হাসতে বলল, ও তো ভাল নাম। মস্ত বড়। ডাক-নাম নেই তোমার?
আছে। বিনু–
সুন্দর নাম তো।
বিনু বলল, তোমার নামটাও সুন্দর।
শ্যামল বলল, তাই নাকি?
হ্যাঁ।
সবার সঙ্গে দাদু আলাপ করিয়ে দিয়েছেন, শুধু তোমার সঙ্গেই বাদ।
কথাটা ঠিক। বিনু বলল, হয়তো খেয়াল করেননি।
শ্যামল বলল, সে যাক গে। তোমার সঙ্গে আমি কিন্তু সেধে আলাপ করলাম। রাগ করলে না তো?
বা রে, রাগ করব কেন?
তুমি কোন ক্লাসে পড় ভাই?
এবারে নাইনে উঠেছি।
শ্যামল উৎসাহিত হয়ে উঠল, রেঙ্গুনে আমি ক্লাস এইটে পড়তাম। এ বছর নাইনে উঠবার কথা ছিল। ভালই হল, নাইনে ভর্তি হব, তোমার সঙ্গে পড়ব। একটু থেমে বিমর্ষ সুরে আবার বলল, কিন্তু বিনু–
কী?
আমাকে কি এখানে ক্লাস নাইনে নেবে?
কেন নেবে না?
আমার যে ভাই ওখানে অ্যানুয়াল পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। ট্রান্সফার সার্টিফিকেট আনতে পারিনি। আনব কী করে বল? জাপানিদের বোমা পড়ল। সব ফেলে পালিয়ে আসতে হল
বিনু বলল, এখানে ভর্তি হতে হলে একটা অ্যাডমিশন টেস্ট দিতে হবে। আমিও কলকাতা থেকে এসে অ্যাডমিশন টেস্ট দিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম।
চিন্তিত মুখে শ্যামল শুধলো, খুবই কঠিন পরীক্ষা নেয়?
নিজের ফাঁড়া তো কেটে গেছে। মুরুব্বিয়ানা চালে বলল, তেমন কঠিন আর কি—
শ্যামল বলল, বড্ড ভয় করছে।
বিনু শ্যামলের সঙ্গে কথা বলছিল ঠিকই। কিন্তু তার কান দুটো ছিল ত্রৈলোক্য সেনদের দিকে। জাপানি বোমার ভয়ে দুর্গম পাহাড় পর্বত ডিঙিয়ে পালিয়ে আসার দীর্ঘ রোমাঞ্চকর বিবরণ শোনার মতো উন্মাদনা আর কী থাকতে পারে? প্রবল আকর্ষণে ত্রৈলোক্য বিনুকে তার দিকে টানছিলেন।
বিনু যে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে, শ্যামল তা লক্ষ করছিল। বলল, দাদুর কথা বুঝি ভাল লাগছে?
বিনু মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।
দাদু আর কতটুকু বলছে। আমি তোমাকে পরে সব বলব। জাপানিরা প্রথম দিন এসে কেমন। করে বোমা ফেলল, ইংরেজ সৈন্যরা তখন কী করছিল, আমরা কী করছিলাম, রেঙ্গুনের লোকেরা কী করছিল, আমরা কেমন করে এলাম–সব বলব। কত শুনতে পার তখন দেখা যাবে। শোনাতে শোনাতে কান একেবারে ঝালাপালা করে ছাড়ব। এখন আমার সঙ্গে গল্প কর দেখি।
কী আর করা, ত্রৈলোক্য সেনের গল্পের আশা ছাড়তে হল বিনুকে। চোখ কান মেলে শ্যামলের দিকে তাকাল সে।
শ্যামল বলল, তখন কলকাতার কথা কী বলছিলে?
বিনু বলল, আমরা কলকাতায় থাকতাম।
কবে এসেছ?
বছর দেড়েকের কাছাকাছি।
রাজদিয়াতে তোমরা কোথায় থাকো?
কোথায় থাকে, বিনু বলল।
তোমাদের বাড়ি একদিন যাব।
নিশ্চয়ই যাবে।
তোমাকেও আসতে হবে। তোমাকে আমার খুব ভাল লেগেছে।
আসব। তোমাকেও আমার ভাল লেগেছে।
দু’জনের মধ্যে টুকরো টুকরো, এলোমেলো, অসংলগ্ন গল্প চলতে লাগল। কথা বলতে বলতে বিনুর হঠাৎ মনে পড়ল, ঝুমার সঙ্গে এখানেই তার আলাপ হয়েছিল। সেই দুঃসাহসী, ভয়লেশহীন মেয়েটা! কতকাল তার সঙ্গে দেখা হয় না। ঝুমার কথা ভাবতে গিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল বিনুর।
ওধারে একসময় ত্রৈলোক্য সেনের বিচিত্র ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কাহিনী শেষ হল।
