ভিতরে যাইতে দাও।
খবর পেয়ে রামকেশব ছুটে এলেন। সম্ভ্রমের সুরে বললেন, আসুন, আসুন বৌ-ঠাকরুন। কাল হেমদাদা এসেছিলেন, তার মুখে নিশ্চয়ই ত্রৈলোক্যদাদার খবর পেয়েছেন–
স্নেহলতা বললেন, হ্যাঁ। সেই জন্যেই তো ছুটে এলাম।
তা জানি। নইলে—
জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকলেন স্নেহলতা।
রামকেশব আবার বললেন, ত্রৈলোক্যদাদা এসেছেন বলে গরিবের বাড়ি আপনার পায়ের ধুলো পড়ল।
চোখ কুঁচকে, মাথা নেড়ে নেড়ে, কপট রাগের গলায় স্নেহলতা বললেন, আমি বুঝি আসি না?
কই আর আসেন। কদিন পর এলেন, চট করে বলে দিতে পারবেন?
রণে ভঙ্গ দিলেন স্নেহলতা। হাসতে হাসতে বললেন, হিসেব-নিকেষ ভবিষ্যতের জন্যে থাক। এখন সেন ঠাকুরপোর কাছে নিয়ে চলুন।
কৌতুকের গলায় রামকেশব বললেন, অমন মোহন হাসি হাসলে চলবে না। কোমর বেঁধে ঝগড়া করব। তবে ছাড়ব।
আচ্ছা, আমি তার জন্যে তৈরি।
দেখা যাবে।
রামকেশব তাদের নিয়ে দোতলার একটা ঘরে এলেন। এ ঘরে সব চাইতে বেশি ভিড়। একটি লম্বামতো সুপুরুষ বৃদ্ধকে ঘিরে রাজদিয়াবাসী অনেক লোকজন বসে আছে।
বৃদ্ধ কিছু বলছিলেন। আর চারধারের জনতা উদগ্রীব হয়ে শুনেছিল। শ্বাস টানতে পর্যন্ত তারা ভুলে গেছে।
ঢুকেই রামকেশব ডাকলেন, সেনদাদা–
বোঝা গেল উনিই ত্রৈলোক্য সেন। রামকেশব বললেন, আপনার আরও শ্রোতা এসেছে। বলে স্নেহলতাকে দেখিয়ে দিলেন, এঁকে চিনতে পারছেন?
একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন ত্রৈলোক্য। ধীরে ধীরে বললেন, চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু ঠিক ধরতে পারছি না।
রামকেশব বললেন, আমাদের বৌ-ঠাকরুন। হেমদাদা–
চোখের তারায় আলো নেচে গেল ত্রৈলোক্যের, আর বলতে হবে না। ওঃ, কতকাল পর আপনাকে দেখলাম। চিনবার কি উপায় আছে! চুলটুল সব পাকিয়ে ফেলেছেন।
চুল পাকবে না? আয়নায় নিজের চেহারাখানা দেখেছেন? আপনিও কিন্তু আর নবীন যুবকটি নেই।
তা যা বলেছেন। বলতে বলতে উঠে এসে স্নেহলতাকে প্রণাম করলেন ত্রৈলোক্য।
বিব্রতভাবে পিছোতে পিছোতে স্নেহলতা বললেন, থাক থাক, আবার প্রণাম কেন?
ত্রৈলোক্য বললেন, আপনি আমাদের প্রণামের পাত্রী, তাই—
রামকেশব এরপর একে একে অবনীমোহন সুরমা সুধা সুনীতিদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন।
পরিচয়-পর্ব চুকলে ত্রৈলোক্য বললেন, বেশ বেশ। বসুন বৌ-ঠাকরুন, বোসো বাবা অবনী। সুরমা তোমরাও বোসো।
সবাই বসবার পর স্নেহলতা বললেন, আপনাকে তো দেখছি। আমার বোন, ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনীরা কোথায়?
বড় নাতি ছাড়া আর সবাই আমাদের বাড়ি দেখতে গেছে।
আপনাদের বাড়ি কি আর বাসের যোগ্য আছে?
কী করে থাকবে বলুন। তকাল আমরা দেশছাড়া। বাড়িঘর এখন জঙ্গলে বোঝাই। সাপখোপের আস্তানা হয়ে উঠেছে। আজ থেকে কামলা লাগল। বাড়ি সারিয়ে সুরিয়ে যেতে হবে তো। রামকেশবের ওপর কদ্দিন আর জুলুম করব! বলতে বলতে হঠাৎ কী মনে পড়তে গলা চড়িয়ে ডাকতে লাগলেন, শ্যামল কোথায় রে, শ্যামল–
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজায় যে ছেলেটি এসে দাঁড়াল তার বয়স চোদ্দ পনেরর মতো, বিনুর প্রায় সমবয়সী, কি বছর খানেকের বড়।
কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, লম্বাটে মুখ, ভাসা ভাসা বড় চোখ, গায়ের রংখানি উজ্জ্বল শ্যাম। সব মিলিয়ে চেহারাটি ভারি মিষ্টি, তাকালেই চোখ স্নিগ্ধ হয়ে যায়। ছেলেটির শ্যামল নাম সার্থক। নামের সঙ্গে চেহারার এমন মিল কদাচিৎ দেখা যায়।
ত্রৈলোক ডাকলেন, আয়—
ছেলেটি ভেতরে এল। ত্রৈলোক্য বললেন, এই আমার বড় নাতি।
স্নেহলতাদের দেখিয়ে শ্যামলকে বললেন, ইনি ঠাকুমা। উনি হলেন পিসিমা, উনি পিসেমশায়, ওরা দিদি। যাও প্রণাম কর।
ঢিপ ঢিপ করে স্নেহলতা-সুরমা-অবনীমোহন-সুধা-সুনীতির পায়ে কপাল ঠেকিয়ে বিনুর পাশে গিয়ে বসল শ্যামল।
এদিকে ঘরে অন্য লোকজন যারা আগে থেকে বসে ছিল, অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। কিছু অবশ্য বলছে না। তবে মুখ টুখ দেখে তা টের পাওয়া যায়।
স্নেহলতা লক্ষ করছিলেন। বললেন, আমরা আসবার আগে কী কথা হচ্ছিল সেন ঠাকুরপো?
এই বর্মার কথা বলছিলাম সবাইকে। রামকেশব বিনুদের পৌঁছে দিয়ে চলে যান নি, একধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বললেন, সেনদাদা, কাল থেকে কতবার যে বর্মার কথা বলছে, লেখাজোখা নেই। সারাদিন লোক আসছে, সারাদিন বকবকানি চলছে। বকতে বকতে মুখে ফেনা উঠবার যোগাড়।
ত্রৈলোক্য হাসলেন, কী আর করা যাবে। লোকে এত আগ্রহ নিয়ে আসছেন। না শুনিয়ে পারি কখনও?
স্নেহলতা বললেন, আমরাও কিন্তু বর্মার গল্প শুনতে এসেছি।
ত্রৈলোক্য বললেন, নিশ্চয়। বলে ভিড়টার দিকে তাকালেন, বৌ-ঠাকরুন এসেছে। তাহলে গোড়া থেকে আবার শুরু করা যাক।
দেখা গেল, এ ব্যাপারে কারোর আপত্তি নেই। সবাই মাথা নেড়ে বলল, হ হ, হেই ভালা। আরেক বার শুনা যাইব।
ত্রৈলোক্য আরম্ভ করলেন। বেশ সুখেই ছিলেন তারা বর্মায়। হঠাৎ কেন যে যুদ্ধ লাগল! আর লাগবিই যদি, পৃথিবীতে ঢের জায়গা পড়ে ছিল। সেসব ছেড়ে জাপানি ব্যাটারা এসে বর্মার ওপর বোমা ফেলল। চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না, পলক পড়তে না পড়তে বহুকাল ধরে তিল তিল সাধনায় গড়ে ওঠা মনোরম জনপদ কিভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। বাড়িগুলো তাসের ঘরের মতো কাত হয়ে পড়ল। রাস্তায় রাস্তায় প্রকাণ্ড গর্ত। আহত মানুষের চিৎকার, মানুষের স্তূপাকার মৃতদেহ, ঘন ঘন সাইরেনের শব্দ, ঝক ঝক জাপানি প্লেনের আক্রমণ–সব মিলিয়ে বর্মা যেন নরকের আরেক নাম।
