হেমনাথ বললেন, ভাল জায়গাতেই উঠেছে। সে জন্যে চিন্তা নেই। স্টিমারঘাট থেকে রামকেশব ত্রৈলোক্যদের নিজের বাড়ি নিয়ে তুলেছে।
আপাতত ওখানেই থাকছে তা হলে?
হ্যাঁ।
কাল একবার যাব।
হ্যাঁ, যাওয়া দরকার।
ম্যাপ বইতে বর্মার মানচিত্র দেখেছে বিনু। ভারতবর্ষের ঠিক গায়েই ব্রহ্মদেশ। আরাকান ইরাবতী পেগু মান্দালয়–সে দেশের নদ-নদী শহর-বন্দরের নাম ভূগোল বইয়ের কল্যাণে তার মুখস্থ। ম্যাপে যত কাছে মনে হয়, ব্ৰহ্মদেশ আসলে তত কাছে নয়–সে কথা বিনু জানে। ভারতবর্ষ, বিশেষ করে এই রাজদিয়া থেকে বর্মা শত শত মাইল দূরে।
রাজদিয়া নামে জল-বাংলার এক অখ্যাত নগণ্য মফস্বল শহরের লোক বর্মায় গিয়ে দীর্ঘ তিরিশ বছর ছিল, জাপানি বোমার ভয়ে এত কাল পর সপরিবারে পাহাড় পর্বত ডিঙিয়ে আবার জন্মভূমিতে ফিরে এসেছে–সমস্ত ব্যাপারটাই যেন অবিশ্বাস্য। একধারে দাঁড়িয়ে ত্রৈলোক্য সেনদের কথা শুনতে শুনতে বিস্ময়ে চোখে আর পলক পড়ছিল না বিনুর। বুকের ভেতর শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ সে চেঁচিয়ে উঠল, তোমার সঙ্গে আমিও যাব দিদা- ত্রৈলোক্য সেনদের দেখবার জন্য মনে মনে সে অস্থির, উন্মুখ হয়ে উঠেছে।
বিনু যেতে চেয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ঝিনুকও সুর ধরল, আমিও যাব ঠামু–
দেখা গেল সুধা সুনীতি, এমন কি সুরমা-শিবানী-অবনীমোহনেরও এ ব্যাপারে বেশ আগ্রহ। বর্মা ফেরত মানুষগুলোকে দেখার জন্য সকলে যেন পা বাড়িয়ে আছে।
স্নেহলতা বললেন, সবাই যাবে। বলেই হেমনাথের দিকে ফিরলেন, ওদের জিজ্ঞেস করেছ?
হেমনাথ বললেন, কী?
টাকাপয়সা কি অন্য কিছুর দরকার আছে কিনা?
না। সবে এসেছে। তা ছাড়া, রামকেশব নিজের বাড়ি নিয়ে গেছে। এক্ষুনি জিজ্ঞেস করাটা খারাপ দেখায়।
একটু চুপ করে থেকে স্নেহলতা বললেন, আমি কিন্তু কাল ত্রৈলোক্য ঠাকুরপোকে জিজ্ঞেস করব।
চিন্তিত মুখে হেমনাথ বললেন, কোবরা। তবে রামকেশবের সামনে না।
তা তোমাকে বলে দিতে হবে না। আমার ঘটে সেটুকু বুদ্ধি আছে। স্নেহলতা হাসলেন।
আছে নাকি? হেমনাথও হাসলেন।
বাকি দিনটা ত্রৈলোক্য সেনদের নিয়ে আলোচনাতেই কাটল।
ত্রৈলোক্য সেনের বাবা ছিলেন নামকরা কবিরাজ, লোকে বলত স্বয়ং ধন্বন্তরি। অম্বিকা কবিরাজ ছুঁলেই নাকি রোগ অর্ধেক সেরে যেত। কবিরাজি তাঁদের কৌলিক ব্যবসা, বংশ পরম্পরায় চলে আসছিল। বিপুল পশার ছিল অম্বিকা কবিরাজের। ঢাকা-বরিশাল-ময়মনসিংহ, দেশ বিদেশ থেকে তার ডাক আসত। প্রচুর পয়সাও করেছিলেন। লোকে সম্মান করত, ভক্তি করত।
জল-বাংলার দুর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসাশাস্ত্র শিখতে অম্বিকা সেনের কাছে ছাত্ররা আসত। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও নিজের ছেলেকে কুলবিদ্যা ধরাতে পারেন নি অম্বিকা সেন। বংশগত ব্যবসা না করুক, ছেলে অন্তত লেখাপড়া শিখে মানুষ হোক, এই আশায় ত্রৈলোক্যকে ইংরেজি স্কুলে পাঠিয়েছিলেন অম্বিকা কবিরাজ। তখন ইংরেজর খুব রবরবা, তার তোপের মুখে ভারতবর্ষের যত প্রাচীন বিদ্যা উড়ে যাচ্ছে। এক-আধ পাতা এ বি সি’ শিখলেও করে খেতে পারবে।
কিন্তু দু’চার বছরের বেশি ইংরেজি স্কুলে যাতায়াত করেন নি ত্রৈলোক্য সেন। আসলে লেখাপড়ায় মনই ছিল না। যৌবনের শুরুতেই বেছে বেছে খারাপ সঙ্গী যোগাড় করেছিলেন। কুসঙ্গে পড়ে নেশা-টেশা ধরেছিলেন, মাঝে মাঝে বাইরে রাত কাটিয়ে আসতেন। অনেক বার যুগীপাড়া, তেলীপাড়া থেকে মার খেয়ে এসেছেন।
ছেলের চরিত্র শোধরাবার জন্য কম বয়সেই বিয়ে দিয়েছিলেন অম্বিকা সেন। সে আমলে মেয়েদের ছোটবেলাতেই বিয়ে হত। ঘরে যাতে ছেলের মন বসে, তাই খুঁজে খুঁজে যুবতী পুত্রবধূ এনেছিলেন। তাতে কাজও হয়েছিল। ত্রৈলোক্য সেন আর বাড়ি থেকে বেরুতেন না।
ছেলেকে তরুণী মেয়ে ঘুষ দিয়ে নিজের ইচ্ছামতো হয়তো চালাতে পারতেন, কিন্তু তার আগেই অম্বিকা সেন মারা গেলেন। বাবার মৃত্যুর পর তার যা কিছু সঞ্চয় ভেঙে ভেঙে খেলেন ত্রৈলোক্য। সেন। তারপর একে একে দেড়শ’ কানি ধানজমি বেচলেন। পৈতৃক বাড়িখানা ছাড়া যখন আর কিছু নেই, সেই সময় একদিন ছেলেপুলে এবং স্ত্রীকে নিয়ে সুদূর বর্মায় পাড়ি দিলেন ত্রৈলোক্য। এত রাজ্য থাকতে কেন যে মগের মুল্লুকে গেলেন, তিনিই জানেন।
সে কি আজকের কথা! তিরিশ বছর আগে, তখন প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হয় নি, ত্রৈলোক্য সেন বর্মা গিয়েছিলেন। সেখান থেকে হেমনাথকে একখানা মোটে চিঠি লিখেছেন। তারপর এতকাল রাজদিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের জাপানি বোমার ভয়ে দেশে ফিরে আসতে হল তাঁকে।
ভাগ্যের সন্ধানে বর্মায় গিয়েছিলেন ত্রৈলোক্য সেন। ভাগ্য তাকে ছলনা করে নি, দশ হাতে ঢেলে দিয়েছিল। কাঠের ব্যবসা করে অজস্র পয়সা করেছিলেন, বাড়িঘর করেছিলেন। কিন্তু জীবন এমন ব্যঙ্গরসিক যে সব ফেলে চলে আসতে হয়েছে।
.
পরদিন বিকেলবেলা বিনুরা রামকেশবের বাড়ি গেল।
ত্রৈলোক্য সেনরা যে জাপানি বোমার ভয়ে চলে এসেছে, সে খবর জানতে কারো বুঝি বাকি নেই। সারা রাজদিয়া যেন রামকেশবের বাড়িতে ভেঙে পড়েছে। রাজদিয়া কেন, আশেপাশের গ্রাম গঞ্জ থেকেও অনেকে এসেছে। সবার চোখে মুখে আগ্রহ, বিস্ময়, ভয় এবং আতঙ্ক।
বিনুরা যেতেই সাড়া পড়ে গেল। চারপাশের ভিড়টা বলাবলি করতে লাগল, হ্যামকত্তার বাড়ি থিকা আইছে।
