সুধাটা চিরকালই বিভীষণ। সে বলল, কোথায় পড়া, এই তো একটু আগে ঢুলছিল।
কটমট করে সুধাকে একবার দেখে নিয়ে মিনমিনে গলায় বিনু বলল, ঢুলছিলাম না স্যার।
আশু দত্ত বললেন, মন দিয়ে পড়। ইংরেজি র্যাপিড রিডার আর গ্রামার কিন্তু তোমার ঠিকমতো তৈরি হয়নি। ওগুলো দেখে রাখবে।
রাখব স্যার।
মুখে বললে হবে না, কাজে দেখাতে হবে। পড়ায় ফাঁকি দিচ্ছ কিনা, সেটা দেখতে আমি আবার আসব।
কবে আসবেন?
তা কি বলে আসব? যে কোনও দিন আসতে পারি।
আশু দত্ত ঘরের বাইরে যেতে হেমনাথ বললেন, বোস, চা খাবি?
আশু দত্ত অবাক, আপনার বাড়িতে চা ঢুকেছে নাকি!
হেমনাথ হাসলেন, জামাইয়ের চায়ের অভ্যাস। চা না ঢুকিয়ে কী করি বল।
তা হলে খেয়েই যাই।
একটু পরে চা এল। খেয়েই উঠে পড়লেন আশু দত্ত।
হেমনাথ বললেন, এক্ষুনি যাবি? আরেকটু বোস না। খবরের কাগজ এসেছে, গরম গরম অনেক যুদ্ধের খবর আছে, শুনে যা।
আমার বসবার সময় নেই হেমদাদা।
কেন, তোমার কী এমন রাজকাজ?
আর বলবেন না। লাহিড়ীবাড়ি যেতে হবে, মুন্সিবাড়ি যেতে হবে, রুদ্রদের বাড়ি যেতে হবে।
কেন?
ওদের বাড়ির ছেলেরা পড়ায় বড্ড ফাঁকি দেয়। এখন থেকে যদি পেছনে না লেগে থাকি ম্যাট্রিকে স্কুলের রেজাল্ট ভাল হবে কী করে? আমি চাই রাজদিয়ার প্রত্যেকটি ছেলে লেখাপড়ায় ভাল হোক, মানুষ হোক। একটু থেমে আশু দত্ত আবার বললেন, যুদ্ধের খবর শুনবার জন্যে বসতে বলছেন? শুনে কী করব? যুদ্ধ তো আর আমি ঠেকাতে পারব না। যা হবার তাই হবে।
হেমনাথ মাথা নাড়লেন, হ্যাঁ। ছেলেদের চিন্তায় আশুটা পাগল। কে পড়ছে না, কার কী অসুবিধা হচ্ছে–এসব দেখে না বেড়ালে ওর ঘুমই হয় না।
অসীম শ্রদ্ধায় অবনীমোহন উচ্চারণ করলেন, সত্যি, এরকম শিক্ষক আগে আর কখনও দেখিনি।
.
২.২৪
অ্যানুয়াল পরীক্ষার সময় ক’দিন খুব হইচই। জাপানিরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। পার্ল হারবারে, সিঙ্গাপুরে, ম্যানিলায় বোমা ফেলেছে। প্রিন্স অফ ওয়েলস’ আর রিপালস’ নামে দুটো বড় বড় জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে।
ভয়, উত্তেজনা, উদ্বেগ এবং রকমারি গুজবের মধ্যে বিনুদের পরীক্ষা হয়েও গেল।
পরীক্ষার কিছুদিন পর খবরের কাগজ আরও মারাত্মক সংবাদ বয়ে আনল। জাপানিরা ঘরের কাছে বর্মায় নাকি এবার বোমা ফেলেছে। শুধু তাই না, বর্মা থেকে দলে দলে তোক পায়ে হেঁটে দুর্গম পাহাড় পর্বত বনজঙ্গল পেরিয়ে ভারতবর্ষের দিকে চলে আসছে।
একদিন হেমনাথ বললেন, ত্রৈলোক্য সেনের নাম শুনেছ তো?
স্নেহলতা বললেন, যে রেঙ্গুনে থাকত?
হ্যাঁ। সে আজ রাজদিয়ায় ফিরে এসেছে।
স্নেহলতা বললেন, ত্রৈলোক্য সেন এসেছে!
হেমনাথ বললেন, একা আসবে কি, ছেলেপুলে নাতি-নাতিকুড় সবাইকে নিয়ে এসেছে। তাদের কোথায় রেখে আসবে?
হঠাৎ চলে এল?
বা রে, তুমি কি কিছুই খোঁজ রাখো না!
হেমনাথ বলতে লাগলেন, বর্মায় জাপানিরা বোমা ফেলেছে। অনেক লোক মরেছে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, সব ধ্বংসস্তূপ। বোমা পড়তেই রেঙ্গুন শহর থেকে লোক পালাতে শুরু করেছিল। রেঙ্গুন এখন একেবারে ফাঁকা।
কোথায় বর্মা, কোথায় জাপান, কোথায় শ্বেতসাগর, কোথায় ডানজিগ-সেবাস্টিপুল-মস্কো, কোথায় বলকান-যুগোশ্লাভিয়া-পোল্যান্ড-ভূগোলের কোন প্রান্তে এই জায়গাগুলো পড়ে আছে, দুই গোলার্ধের কোথায় কোথায় বোমা পড়ছে, কত লোক মরছে, মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করবার জন্য কারা উন্মত্ত হয়ে উঠেছে, এ সব কোনও খবরই রাখেন না স্নেহলতা। এই রাজদিয়া, হাচাই পালের মেয়ের মাঘমন্ডলের ব্রত, নাটাইচন্ডীর ব্রত, নীলপুজো, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো, বাস্তুপুজো, কারোর বিয়ে হলে জল সইতে যাওয়া, বাসর জাগা–এ সবের মধ্যেই তার ভূমন্ডল, তাঁর জগৎ। এতকাল এর বাইরে কোনও কিছু সম্বন্ধেই তাঁর দুর্ভাবনা ছিল না।
এস্ত সুরে স্নেহলতা বললেন, তাই নাকি, এত কান্ড হয়েছে!
হ্যাঁ। ওইরকম অবস্থায় মানুষ কখনও বর্মায় পড়ে থাকতে পারে?
তা তো ঠিকই।
হেমনাথ বললেন, ত্রৈলোক্যদের যা দুর্গতি হয়েছে কী বলব! জাহাজ নেই, নৌকো নেই–
তবে এল কী করে? হেঁটে। বর্মা তো শুনেছি অনেক দূর।
হ্যাঁ। ছেলেপুলে নাতি-নাতনীর হাত ধরে পাহাড়-পর্বত-বন-জঙ্গল পেরিয়ে প্রথমে আসামে এসেছিল। সেখান থেকে রাজদিয়া।
একটু ভেবে স্নেহলতা বললেন, হেঁটে তো এসেছে। জিনিসপত্র কিছু আনতে পেরেছে কি?
হেমনাথ জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, কিছু না, কিচ্ছু না। নিজেদের হাত-পা আর পরনের। জামাকাপড় ছাড়া কুটোটুকুও আনতে পারে নি।
আহা রে, কী কষ্ট!
একটু চুপ।
তারপর স্নেহলতা আবার বললেন, অনেক কাল পরে ত্রৈলোক্য সেনরা রাজদিয়া এল, তাই না?
হেমনাথ বললেন, হ্যাঁ। তা বছর তিরিশেক হবে।
বর্মায় ওরা তো বেশ ভালই ছিল।
ভাল বলে ভাল। বিরাট অবস্থা করে ফেলেছিল ত্রৈলোক্য। এক রেঙ্গুনেই তিনখানা বাড়ি, প্রোমে ছিল একখানা। তা ছাড়া জমিজমা, নারকেল বাগান। নগদ টাকাপয়সাও প্রচুর।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্নেহলতা বললেন, কিছুই আনতে পারল না। সর্বস্ব বিদেশেই পড়ে রইল।
হেমনাথ বললেন, বাড়িঘর যাক। নিজের নিজের প্রাণটুকু নিয়ে যে আসতে পেরেছে, এই ঢের।
হঠাৎ কী মনে পড়তে স্নেহলতা তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ভাল কথা–
কী?
অনেক কাল ওরা ছিল না। রাজদিয়ায় ওদের বাড়ি তো জঙ্গলে ঢেকে গেছে। তা উঠল কোথায়? আমাদের বাড়ি নিয়ে এলেই পারতে। যদ্দিন না কিছু একটা ব্যবস্থা হয় এখানেই থাকত।
