যুগলের সঙ্গ মোটামুটি ভালই লাগছিল। বিনু এগিয়ে গেল।
অবনীমোহন বললেন, দু’জনের বেশ ভাব হয়ে গেছে দেখছি।
সুরমা হাসলেন, তাই তো মনে হচ্ছে। মাছ ধরার কায়দা দেখিয়ে যুগল বিনুকে একেবারে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
বার-বাড়ির সেই বাগানে এসে পচা পাটের স্তূপের ভেতর বসে পড়ল যুগল। একটু দূরে একটা গাছের মোটা শিকড়ের ওপর বসল বিনু।
হাতের কৌশলে অতি দ্রুত পচা পাট থেকে আঁশ আর শোলা বার করে দু’ধারে রাখতে লাগল যুগল। সেই সঙ্গে চলল গল্প।
জাদুকর যেমন ঋপির ভেতর থেকে একের পর এক অচেনা বিস্ময় তুলে এনে চমকে দেয়, তেমনি কথায় কথায় নিজের তাবৎ গুণ জাহির করতে লাগল যুগল। বিনা পালে শুধু একখানা বৈঠার ভরসায় নৌকো নিয়ে বর্ষার নদী পেরিয়ে যেতে পারে, রাতের পর রাত কৃষ্ণলীলা আর রয়ানির আসরে গান গেয়েও তার গলা ভাঙে না। ইত্যাদি।
যত শুনছিল ততই অবাক হয়ে যাচ্ছিল বিনু। গানের কথায় বিস্ময়টা তার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছল। বলল, তুমি গাইতেও পার!
না পারি কী? হগলই পারি। যুগল বলতে লাগল, আমার গীত শুনলে মাইনষে মোহিত হইয়া যায়।
তাই নাকি?
আশ্বাসের সুরে যুগল বলল, শুনামু ছুটোবাবু, আপনেরে একদিন আমার গীত শুনাইয়া দিমু। তহন বুঝবেন, যুগইলা মিছা কয় নাই।
শরতের বাতাস এলোমেলো বয়ে চলেছে। কখনও ঝড়ের মতো সাঁই সাঁই ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে, কখনও ঝিরঝিরে সুখস্পর্শে ঘুম এসে যায়। স্টিমারে আসতে আসতে মনে হয়েছিল, আকাশময় কে এক অদৃশ্য ধুনুরি পেঁজা তুলো ছড়িয়ে রেখেছে। কখন যে রং বদলে মেঘগুলো কালো হয়ে গেছে, বিনুরা লক্ষ কর নি। ধীরে ধীরে বাতি নিবে এলে যেমন হয় সেইরকম রোদটা কখন যেন দীপ্তি হারিয়ে, উজ্জ্বলতা হারিয়ে মলিন হয়ে গেছে।
গল্প করতে করতে পুকুরের ওপারে তাকাল বিনু। ধানবনে ঢেউ তুলে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। দু’চারটে নৌকোও চোখে পড়ছে। ধানখেত সিঁথির মতো চিরে তারা কোথায় পাড়ি জমিয়েছে, কে জানে।
হঠাৎ বিনু বলল, আচ্ছা, ওই দিকটায় ধানখেত আর জল ছাড়া কি কিছুই নেই?
যুগল বলল, আছে তো।
কী?
যুগল এবার যা বলল, তা এইরকম। ধুধু এই জলরাশি আর ধানের অরণ্যের ভেতর দ্বীপের মতো অনেকগুলো কৃষাণ গ্রাম মাথা তুলে আছে। আরও জানালো, সেই আষাঢ় মাস থেকে কার্তিকের শেষাশেষি পর্যন্ত গ্রামগুলো একখানা সমুদ্রের ওপর যেন ভাসতে থাকে। তারপর মাঠের জল সরে গেলে কয়েকটা মাস নিশ্চিন্ত।
বিনু শুধলো, ওই জল কি নেমে যাবে?
যাইব বৈকি। এইর মদ্যেই টান ধরছে– যুগল বলতে লাগল, আশ্বিনের শ্যাষাশেষি দেখবেন, জল কত কইমা গ্যাছে। অঘ্রাণ মাসে চাইর দিক শুকনা খটখইটা (খটখটে) হইয়া যাইব।
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে যেতে বিনু তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল, চারদিক তো জলে ডুবে আছে। ওখানে লোক যায় কী করে?
নায়ে কইরা। যুগল বলতে লাগল, দুই চাইর দিন থাকেন, বুঝতে পারবেন নাই এইখানকার মাইনষের হাত-পাও। নাও ছাড়া এই জলের দ্যাশে কুনোখানে যাওনের উপায় নাই।
একটু ভেবে বিনু বলল, ওই সব গ্রাম ছাড়া ওধারে আর কী আছে?
বড় বড় গুঞ্জ (গঞ্জ)।
গুঞ্জ কী?
বাজার আর কি, যেইহানে মাল বিকিকিনি হয়। কী একেকখান গুঞ্জ ছুটোবাবু–দিনরাইত মাইনষের চিল্লাচিল্লিতে গমগম করে। দেলভোগ মোহনগুঞ্জ মীরপুর সুজনগুঞ্জ–যেহানেই যান, এক অবোস্তা।
সুজনগঞ্জ নামটা বিনুর চেনা চেনা লাগল। কিন্তু কোথায় কার কাছে শুনেছে, এই মুহূর্তে কিছুতেই মনে করতে পারল না।
যুগল থামে নি, পূজা আসতে আছে ছুটোবাবু। সুজনগুঞ্জে মীরপুরে দেলভভাগে রাইতের পর রাইত যাত্রাগান হইব। অ্যামনেই মাইনষের ভিড়ে পাও ফেলান যায় না, তহন পুরা রাজি একেবারে ভাইঙ্গা পড়ব।
বিনু বলল, জানো, অমি কখনও যাত্রা দেখি নি।
বরদানের ভঙ্গিতে যুগল বলল, তার লেইগা কি, অমি আপনেরে দেখাইয়া আনুম। কয়টা আর দিন, পূজা তো আইসাই পড়ছে।
বিনু বলল, কথা দিলে। নিয়ে যেতে হবে কিন্তু–
যামু—যামু—যামু—
বিনু আর কিছু বলল না। স্বপ্নলোকের রহস্যময় সংকেতের মতো দিগন্তের ওপার থেকে দেলভোগ সুজনগঞ্জ-মীরপুর-ইনামগঞ্জ, এই বিচিত্র নামগুলো আর যাত্রাগানের আসর তাকে বার বার যেন হাতছানি দিতে লাগল।
১.০৪ রান্নাবান্না শেষ হতে দুপুর
রান্নাবান্না শেষ হতে দুপুর পেরিয়ে গেল। তখনও হেমনাথ ফিরলেন না।
সবার চান হয়ে গিয়েছিল। সুরমা-সুধা-সুনীতি-ঝিনুক বাড়িতেই ভোলা জলে চান সেরেছে। অবনীমোহন বিনু আর হিরণ গিয়েছিল পুকুরে। সঙ্গে যুগলও ছিল। আজ থেকেই যুগলের কাছে। সাঁতারের তালিম নিতে শুরু করেছে বিনু।
নতুন জায়গা, নতুন জল বলে বেশিক্ষণ পুকুরে হুটোপাটি করতে দেন নি অবনীমোহন। সে জন্য মুখখানা ভারী হয়ে আছে বিনুর।
যাই হোক, রান্নাঘরে বড় বড় কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি পেতে থালা সাজিয়ে স্নেহলতা খেতে ডাকলেন।
অবনীমোহন বললেন, মামাবাবুর জন্যে আরেকটু অপেক্ষা করি। তারপর না হয়
অপেক্ষা করে লাভ নেই বাবা। হয়তো আজ ফিরবেনই না।
এরকম হয় নাকি?
স্নেহলতা হাসলেন, প্রায়ই হয়। এই যে গেলেন, ফিরতে ফিরতে দু’চারদিনও লেগে যেতে পারে। ওঁর আশায় বসে থাকলে উপোস দিতে হবে।
অগত্যা কী আর করা, খেতে বসতে হল।
ওবেলার মতো এবারও মাছের ভাগ নিয়ে বায়না করল ঝিনুক, এবং কেঁদে কেটে সব কিছু বিনুর সমান আদায় করে ছাড়ল।
