কলকাতা-প্রবাসী কেউ কাছাকাছি থাকলে আলোচনাটা আরও জমে ওঠে। কালকাতার মানুষ অনেক বেশি জানে-শোনে, অনেক বেশি খবর রাখে। তারা যুদ্ধ সম্বন্ধে এমন এমন সব কথা বলে যাতে ভয়ে, আতঙ্কে রাজদিয়াবাসীদের বুকের ভেতর শ্বাস আটকে যায়।
মোট কথা, সবাই আশঙ্কা করে আছে, কিছু একটা ঘটবে। নিদারুণ, বিপজ্জনক, অনিবার্য কিছু। সারা দেশ, সমস্ত বিশ্বব্রহ্মান্ড জুড়ে তারই আয়োজন চলছে। রাজদিয়াবাসীরা ভাবে, যুদ্ধ যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তাতে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, এই রাজদিয়ারও নিস্তার নেই।
দুর্গাপুজোর পর লক্ষ্মীপুজো। তারপর রাজদিয়া আবার ফাঁকা হয়ে গেল। একে একে কলকাতার চাকুরেরা ফিরে যেতে লাগল। ক্ষণিকের জন্য রাজদিয়া উৎসবে, উচ্ছাসে মুখর হয়ে উঠেছিল, তার পর আবার স্তিমিত, নিরুচ্ছ্বাস, বর্ণহীন দিন নেমে আসতে লাগল।
লক্ষ্মীপুজোর পর কালীপুজো।
কালীপুজোর রাত্তিরে একটা মজার ঘটনা ঘটল। মজার এবং বিস্ময়েরও।
রাত্তিরে খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে বিনু আর ঝিনুক হেমনাথের ঘরে শুতে আসছিল। স্নেহলতা ঝিনুককে ডাকলেন।
ঝিনুক দাঁড়িয়ে পড়ল, কী বলছ?
স্নেহলতা তার কথার উত্তর না দিয়ে বিনুকে বললেন, তুই শুতে চলে যা দাদাভাই—
বিনু বলল, ঝিনুক যাবে না?
না।
ঝিনুক এইসময় চেঁচিয়ে উঠল, বা রে, আমার বুঝি ঘুম পায় না!
স্নেহলতা বললেন, ঘুম পেয়েছে তো আমার বিছানায় শুয়ে থাক গে—
ঝিনুক অবাক, তোমার বিছানায় শোব কেন?
আজ থেকে আমার কাছেই শুবি।
না না, দাদুর কাছে যোব, বিনুদাদার কাছে শোব–ঝিনুক হাত-পা ছুঁড়তে লাগল।
বড় বড় চোখ পাকিয়ে স্নেহলতা বললেন, যা বলছি তাই কর। যাও আমার বিছানায়।
স্নেহলতার এ চেহারা আগে আর কখনও দেখে নি ঝিনুক, এমন কণ্ঠস্বর শোনেনি। নিমেষে তার হাত-পা ছোঁড়া বন্ধ হল, কিন্তু জেদটা একেবারে গেল না। ঘাড় বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল সে, আর সমানে বলতে লাগল, কেন ওদের কাছে পোব না, কেন?
খুব শান্ত গলায় স্নেহলতা এবার বললেন, তুমি এখন বড় হয়ে গেছ, তাই—
ঝিনুক বিহুলের মতো প্রতিধ্বনি করল, বড় হয়ে গেছি! বলে নিজের দিকে তাকাল, তাকিয়েই রইল।
স্নেহলতা বললেন, হ্যাঁ।
ঝিনুক কী বুঝল, কে জানে। আর কিছুই বলল না।
আর বিমূঢ় বিনু অবাক চোখে ঝিনুককে দেখতে লাগল। গেল বার পুজোর সময় তারা রাজদিয়া এসেছে। এবার আরেক পুজো গেল। এক বছরের ভেতর কখন, কোন ফাঁকে মেয়েটা বড় হয়ে। গেছে, সে ভেবেই পেল না।
খানিক তাকিয়ে থেকে একসময় একাই হেমনাথের ঘরে চলে গেল বিনু।
.
২.২৩
পুজোর ছুটির পর স্কুল খুলল। মাঝখানে মোটে দেড়টি মাস, তারপরেই অ্যানুয়াল পরীক্ষা।
সারা রাজদিয়া জুড়ে এখন পড়ার মরশুম চলছে। আজকাল যে বাড়িতেই যাওয়া যাক, সকাল সন্ধে কচি কচি গলায় একটানা বিচিত্র সুর কানে আসে, থ্রি সাইডস অফ এ ট্রাঙ্গেল’ অথবা জলস্পর্শ করবো না আর চিতোর রানার পণ, বঁদির কেল্লা মাটির পরে থাকবে যতক্ষণ। ইত্যাদি ইত্যাদি। জিরান্ড, ভার্বেল নাউন, বহুব্রীহি সমাস, জ্যামিতির কঠিন কঠিন উপপাদ্য, অ্যালজেব্রার ফরমুলাগুলো রাজদিয়া জুড়ে রাজত্ব করে চলেছে।
একদিন সন্ধেবেলা দক্ষিণের ঘরে বিনুরা পড়তে বসেছে। বাইরের বারান্দায় অবনীমোহন, হেমনাথ খবরের কাগজ নিয়ে আসর জমিয়েছেন। ইচু মন্ডল, ইসমাইল চৌকিদার, কুমোরপাড়ার হাচাই পাল, বুধাই পাল–এমনি অনেকে ঘন হয়ে বসে নিঃশ্বাস বন্ধ করে যুদ্ধের খবর শুনছে।
হঠাৎ বাগানের দিক থেকে রাজদিয়া স্কুলের অ্যাসিস্টান্ট হেডমাস্টার আশু দত্তর গলা ভেসে এল, হেমদাদা আছেন?
পড়তে বসেই দুলুনি শুরু হয়ে গিয়েছিল বিনুর, চোখ বুজে আসছিল। বার বার বইয়ের ওপর ঝুঁকে পড়ছিল সে।
আশু দত্তর গলা কানে আসতেই ঝিমুনি ছুটে গেল। খাড়া হয়ে বসে শেষ পর্দায় গলা চড়িয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বিনু পড়তে লাগল, আফ্রিকার কঙ্গো নদীর অববাহিকায় পিগমি নামক জাতি বাস করে। ইহারা পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ক্ষুদ্র মানব, মাত্র চার ফুট দীর্ঘ। এই অঞ্চলের তীব্র সূর্যতাপের জন্য–
চোখ বইয়ের পাতায় আছে ঠিকই, কিন্তু কান রয়েছে বাইরে। ওদিকে হেমনাথ বারান্দা থেকে সাড়া দিয়েছেন, আছি। কে, আশু?
হ্যাঁ।
আয়, আয়–
আশু দত্ত এলে একটা জলচৌকিতে তাকে বসানো হল। হেমনাথ বললেন, কী ব্যাপার আশু, হঠাৎ রাত্রিবেলা কী মনে করে?
আশু দত্ত বললেন, একটু খোঁজখবর নিতে এলাম।
কিসের?
আপনার না, আমার ছাত্রের।
মানে বিনুর?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
জিজ্ঞাসু সুরে হেমনাথ বললেন, বিনু তো ভালই আছে। ওই যে পড়ছে। কিন্তু–
আশু দত্ত হেসে বললেন, ভাবনার কিছু নেই। আমি পড়াশোনারই খোঁজ নিতে এসেছি। বুঝতেই তো পারছেন, অ্যানুয়াল পরীক্ষার আর বেশি দেরি নেই। ছেলেগুলো পড়ছে কি ঘুমাচ্ছে, দেখতে হবে না?
হেমনাথ হেসে ফেললেন, তা তো ঠিকই। বিনুকে ডাকব?
ডাকতে হবে না, আমিই ঘরে যাচ্ছি।
যা—
আশু দত্ত ঘরের ভেতর এলেন। গলার স্বর আরেক পর্দা চড়িয়ে দিল বিনু।
আশু দত্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ পড়া শুনলেন। তারপর ডাকলেন, বিনয়—
স্কুলে বিনয় নামটাই চালু। বিনু বই থেকে মুখ তুলে বলল, আজ্ঞে—
পড়াশোনা কেমন হচ্ছে?
রাজদিয়া ঘোট জায়গা। এখানে সবাই সবাইকে চেনে। সুধা সুনীতির সঙ্গে আগেই আশু দত্তর পরিচয় হয়েছিল।
