খরার দিনে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে জমি চৌরস করিয়েছেন অবনীমোহন। বর্ষায় নতুন জল এলে বীজ বুনিয়েছেন। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আউশ ধান আর পাট কাটিয়েছেন। এখন যে পচা পাট থেকে আঁশ ছাড়ানো হচ্ছে, তাও সারাদিন সামনে বসে থাকেন। চাষবাসের জীবন তাকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন। করে রেখেছে।
ধান-পাট ছাড়া আর কিছুই আজকাল ভাবতে পারেন না অবনীমোহন। অন্য কোনও দিকে মনেযোগ দেবার মতো যথেষ্ট সময়ও তার নেই।
হেমনাথ কিন্তু তার নিজস্ব নিয়মেই চলছেন। বাড়ি থেকে একবার বেরুতে না পারলে তার ঘুমই হয় না। এই রাজদিয়া কিংবা আশেপাশের গ্রামগঞ্জগুলোর খোঁজ নেওয়া চাই-ই। জষ্টির পর থেকে এত যে বর্ষা, এত যে জল, তবু তাকে কেউ বাড়িতে আটকে রাখতে পারেনি, ছাতাটি মাথায় দিয়ে ঠিক বেরিয়ে পড়েছেন।
আশ্বিন মাস পড়বার পর একদিন দুপুরবেলা কোত্থেকে বাড়ি ফিরে হেমনাথ বললেন, পুজোর ছুটি পড়ে গেছে। আজকের স্টিমারে কলকাতা থেকে রাজেন গুহর ছেলে-বৌ এল।
স্নেহলতা বললেন, কে, অশোক?
হ্যাঁ।
গুহবাড়ির ছেলে তো এল। অন্য বাড়ির কেউ আসেনি?
এখনও আসেনি। দু’একদিনের ভেতর এসে পড়বে।
পুজোর ছুটি পড়তেই গৃহকোণলোভী প্রবাসী সন্তানেরা ফিরে আসতে শুরু করেছে। দেখতে দেখতে রাজদিয়া ভরে যাবে। এখানকার মৃদু, স্তিমিত, বেগবর্ণহীন জীবন সরগরম হয়ে উঠবে।
একেক দিন একেক জনের খবর নিয়ে আসেন হেমনাথ। কোনওদিন এসে বলেন, আজ মল্লিকবাড়ির সবরাজরা এল। কোনওদিন বলেন, আজ নাহাবাড়ির প্রাণকান্তরা এল। কোনওদিন বলেন, আজ রুদ্রবাড়ির মহিমরা এল।
হেমনাথ যখন খবর নিয়ে আসেন, সুধা-সুনীতি-বিরা অসীম আগ্রহে কাছে এসে দাঁড়ায়।
একেক দিন একেক জনের কথা বলেন হেমনাথ, কিন্তু ঝুমাদের সম্বন্ধে কিছুই বলেন না।
এই নিয়ে সুধা সুনীতি চাপা গলায় নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে। সুধা বলে, কিরে দিদি—
সুনীতি বলে, কী?
দাদু শিশির মামাদের কথা একবারও তো বলছেন না।
ওঁরা আসেননি, তাই বলছেন না।
ওঁরা এলে—
এলে কী?
আনন্দদাও আসবে।
তার কি কিছু ঠিক আছে?
চোখ ঘুরিয়ে সুধা বলে, আসবে রে, আসবে। তুই এখানে পড়ে আছিস, চিঠিতে কত আর মনের কথা লেখা যায়! বিধুমুখ দেখতে না পেলে
তার পিঠে দুম করে এক কিল বসিয়ে সুনীতি বলে, খুব ফাজলামি শিখেছিস! পিঠ বাঁকিয়ে খানিকক্ষণ উ-উ-উ” করে সুধা। তারপর ঘন গলায় বলে, আনন্দদা এলে বেশ হয়, না?
সুনীতি বলে, জানি না, যা–
পুজোর সপ্তাখানেক আগে একদিন বিকেলবেলা বাড়ি ফিরে হেমনাথ চেঁচামেচি জুড়ে দিলেন, কই গো, কোথায় গেলে সব
সবাই ছুটে এল। স্নেহলতা বললেন, কী হয়েছে, অত চিৎকার করছ কেন?
হেমনাথ বললেন, খুব খারাপ খবর।
উদ্বিগ্ন মুখে স্নেহলতা শুধোলেন, কী?
আজ রামকেশবের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ও কী বললেন জানো?
কী?
শিশিররা এবার পুজোর দেশে আসছে না।
কেন?
শিশিরের বড় মেয়ে রুমার খুব অসুখ। ডাক্তার নড়াচড়া করতে বারণ করেছে। তাই—
স্নেহলতা বললেন, কী অসুখ?
হেমনাথ বললেন, টাইফয়েডের মতো–
সত্যিই খুব খারাপ খবর। হিরণটা পরীক্ষার জন্য আসতে পারবে না, শিশিররা আসবে না। এবারকার পুজোয় তেমন আনন্দ হবে না।
একধারে সুধা সুনীতি দাঁড়িয়ে ছিল। সুধা চাপা গলায় বলল, এই দিদি, তোর মুখটা অমন কালো হয়ে গেল কেন রে?
শিশিররা আসবে না শুনে সুনীতির মুখখানা সত্যিই ভারি করুণ হয়ে গিয়েছিল। সুধার কথায় হাসবার চেষ্টা করল সে, কোথায় কালো হয়েছে?
সুধা বলল, আমাকে তুই ফাঁকি দিতে চাস দিদি?
সুনীতি উত্তর দিল না।
একটু চুপ করে থেকে ভারী গলায় সুধা বলল, একজন ঢাকা থেকে রাজদিয়া আসতে পারবে না, আরেক জন কলকাতায় পড়ে থাকবে। না আসুক গে–
সেদিনই রাত্রিবেলা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঝুমার কথা ভাবছিল বিনু। আগের বছর পুজোর সময় তার সঙ্গে নৌকোয় করে ভাসতে ভাসতে মাঠের মাঝখানে চলে গিয়েছিল। সেখানে কাউ ফল পাড়তে গিয়ে পড়েছিল অথৈ জলে। ডুবেই যেত, ঝুমাই সেদিন তাকে নৌকোয় টেনে তুলেছিল।
শুধু কি তাই, ঝুমার পাশে বসে থিয়েটার দেখেছে। ঝাঁপসা রহস্যময় জ্যোৎস্নায় যুগলের নৌকোয় উঠে সুজনগঞ্জে যাত্রা শুনতে গেছে। নিশিন্দার চরে গেছে চড়ুইভাতি করতে। দুঃসাহসী মেয়েটার অসংখ্য স্মৃতি নানা দিক থেকে বিনুর চারপাশে ভিড় করে আসতে লাগল।
হঠাৎ ঝিনুক ডাকল, বিনুদা—
বিনু চমকে উঠল, কী বলছ?
ঝুমারা এবার আসবে না।
হুঁ।
এবার থিয়েটারের সময় তোমার জন্যে আমি জায়গা রাখব।
অন্যমনস্কের মতো বিনু বলল, হুঁ–
ঝিনুক আবার বলল, সুজনগঞ্জের হাটে রাত্রিবেলা নৌকোয় করে যাত্রা শুনতে যাব।
হুঁ—
.
হিরণ আসেনি, শিশিররা আসেন নি। তবু পুজোর সমারোহ কম হল না। অন্যবারের মতো এবারও ধুনুচি-নাচের, ঢাকের বাজনার প্রতিযোগিতা হল, নাটক হল, যাত্রা হল, ভাসান গান হল, জারি সারিকাঁচ নাচের আসর বসল, একদিন ধুমধাম করে বাইচ খেলাও হয়ে গেল।
নিয়মমতো সবই হল, কিন্তু মানুষের মন এবার বড় অস্থির, বড় চঞ্চল। পুজোমন্ডপে, জারি সারি-ভাসান গান কি যাত্রার আসরে–সর্বত্রই এক কথা, এক আলোচনা।
যুজ্যু লাগছে, কী যে হইব!
এইবার আর রক্ষা নাই।
জিনিসপত্তরের দাম যা চড়তে আছে হেইতে আর বাচতে হইব না।
জিনিসপত্তর আর পাইবা নিকি, বাজার থিকা চাউল ডাইল হগল উধাও হইয়া যাইতে আছে। ট্যাকা যার আছে হেও না খাইয়া মরব, যার নাই হে তো মরবই।
