এখন ঘরের ভেতর ওরা তিনজন। সুধা হিরণ আর বিনু। বিনু জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। আকাশ জুড়ে শুধু মেঘ, চরাচর আচ্ছন্ন করে ধূসর রেখায় বৃষ্টি ঝরেই যাচ্ছে। ধানখেতের দিক থেকে হঠাৎ হঠাৎ দমকা বাতাস ছুটে আসে, বাগানের সুপুরি গাছগুলো নুয়ে নুয়ে পড়ে। জামরুল আর কালোজাম গাছ দুটো পরস্পরের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস গলায় কী পরামর্শ করতে থাকে।
অনেকক্ষণ নীরবতার পর হিরণই প্রথম কথা বলল, কেমন আছ সুধা?
সুধা উত্তর দিল না।
হিরণ আবার বলল, খুব রাগ করে রয়েছ, না?
এবার সুধা ভারী গলায় উত্তর দিল, না। খুশিতে–
খুশিতে কী?
ডগমগ হয়ে আছি।
সত্যি খুব অন্যায় হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে এক-আধবার রাজদিয়াতে আসা উচিত ছিল। কিন্তু এমন অভ্যেস আমার–
খুব খারাপ অভ্যেস’ এতক্ষণ সুধার গলা ভারী ছিল, এবার কাঁপতে লাগল, মরে গেছি কি বেঁচে আছি, খোঁজ নেওয়ার দরকার মনে করেন না? ওদিকে জানেন–
কী?
আনন্দদা সপ্তায় দুটো করে চিঠি লেখে দিদিকে—
আনন্দবাবু লেখে দু’টো করে। ঢাকায় গিয়ে এবার থেকে আমি চারটে করে লিখব–
ইয়ার্কি হচ্ছে?
না না– হিরণ কিন্তু ব্যস্ত হয়ে পড়ল, তুমি দেখে নিও–
সুধা ভয় পেয়ে গেল যেন, দোহাই আপনার, অত চিঠি লিখবেন না। দিদি তা হলে আমাকে খেপিয়ে মারবে। মাঝে মাঝে এক-আধটা লিখলেই আমি খুশি–
কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল হিরণ, হঠাৎ কিছু ভেবে গলা নামিয়ে বলল, এই সুধা–
কী বলছেন?
আমরা তো খুব প্রাণের কথা চালিয়ে যাচ্ছি। ওদিকে—
ওদিকে কী?
ঘরের ভেতর বিনু রয়েছে না?
এক পলক বিনুকে দেখে নিয়ে সুধা বলল, ওটা একটা হাবা গঙ্গারাম। জানালার ফাঁক দিয়ে বৃষ্টিই দেখছে, আমাদের কথা কানেও যাচ্ছে না। ভারি অন্যমনস্ক ছেলে
হাবা গঙ্গারামটির চোখ অবশ্যই জানালার বাইরে ছিল, কিন্তু ধ্যানজ্ঞান ছিল ঘরের ভেতরে। কান খাড়া করে হিরণদের প্রতিটি কথা শুনে যাচ্ছিল বিনু।
সুধা বলা সত্ত্বেও সন্দেহ গেল না হিরণের। সংশয়ের গলায় বলল, যদি শুনে থাকে
সুধা বলল, কিচ্ছু শোনেনি, আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন। কিরকম অন্যমনস্ক দেখবেন? বলেই ডাকল, অ্যাই বিনু–
বিনু প্রথমটা সাড়া দিল না। বৃষ্টির লম্বা লম্বা ধূসর রেখাগুলি এবং তাদের একটানা ঝমঝম শব্দ ছাড়া জগতের আর কোনও দিকে তার বিন্দুমাত্র মনোযোগ আছে বলে মনে হল না।
সুধা আবার ডাকল। বারকয়েক ডাকাডাকির পর চমকে ওঠার ভঙ্গি করে বিনু ঘুরে দাঁড়াল, কী বলছিস?
কী করছিস, জিজ্ঞেস করছিলাম—
বৃষ্টি দেখছি।
আমি তোকে ক’বার ডেকেছি বল তো?
এই তো একবার।
আমরা কী বলছিলাম, শুনেছিস?
না তো—
ঠিক আছে, তুই বৃষ্টি দ্যাখ—
বিনু আবার জানালার বাইরে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকাল।
আর সুধা হিরণকে বলল, দেখলেন তো?
হাতেনাতে এত বড় প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বেও বিনু সম্পর্কে সতর্ক হয়ে রইল হিরণ। যতখানি সম্ভব গলাটা অতলে নামিয়ে সে ফিসফিস করতে লাগল। সঙ্গগুণেই কিনা কে জানে, সুধাও গলা নামাল।
আর জল-বাংলার ক্লান্তিহীন বর্ষণ দেখতে দেখতে উৎকর্ণ বিনু ঘরের ভেতর দুটি অন্তরঙ্গ গাঢ় গলার ফিসফিসানি শুনতে লাগল।
.
২.২২
দেখতে দেখতে পুজো এসে গেল।
এই সেদিনও আকাশ জুড়ে কালোলা মেঘ অনড় হয়ে ছিল। এখনও মেঘ আছে, তবে রং গেছে বদলে।
সারা বর্ষার জলে ধুয়ে আকাশখানি এখন আশ্চর্য নীল। এত চকচকে, এত ঝকমকে যে মনে হয় এক দিগন্ত থেকে আরেক দিগন্ত পর্যন্ত একখানা নীল আয়না কেউ টাঙিয়ে রেখেছে। তার গায়ে থোকা থোকা সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে।
আশ্বিন মাস পড়তেই খাল-বিল আর নদীপাড়ের কাশবন সাদা হয়ে গেছে। হিজল গাছগুলোর পাতা দেখা যায় না, শুধু ফুল আর ফুল।
বর্ষার সময়টা এই জল-বাংলা থেকে সব পাখি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। দিন-রাত একটানা বৃষ্টির ভেতর তারা বেরোয় কী করে? আশ্বিনের শুরুতে যেই বৃষ্টি থামল, মেঘ কেটে ঝলমলে সোনালি রোদ দেখা দিল, অমনি নিরুদ্দেশ পাখির ঝাঁক রাজদিয়ার আকাশে ফিরে আসতে লাগল। দিবানিশি তাদের কিচিরমিচিরে চারদিক এখন মুখর। আর এসেছে পতঙ্গেরা-ফড়িং, প্রজাপতি, নানরকম পোকা।
পুকুর, ধানখেত, দূরের মাঠ, মাঠের মাঝখানে ছোট ছোট কৃষাণ গ্রাম–বর্ষায় সব ভেসে গিয়েছিল। মাঠের জল, ধানখেতের জল, খালবিলের জল, সব জায়গায় জল এখন স্থির। কৃষাণ গ্রামগুলোকে আজকাল দ্বীপের মতো দেখায়। দূরে দূরে মাঠের মাঝখানে ভেসাল জাল পাতা। ভেসালের বাঁশে শঙ্খচিল কি কানি বক ধ্যানস্থ হয়ে বসে থাকে। নিস্তরঙ্গ জলে ধানগাছের ছায়া, মুত্রার ছায়া, নলঘাস এবং ধঞ্চের ছায়া সারাদিন স্থির হয়ে থাকে। শুধু উড়ন্ত পাখিদের ছায়া দুলতে দুলতে ধু ধু দিগন্তের দিকে চলে যায়।
ক’টা মাস একটানা বর্ষায় স্যাঁতসেঁতে, সিক্ত থাকার পর রোদে-বাতাসে-আলোয় এবং উত্তাপে জল-বাংলা আবার যেন সজীব, প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
হেমনাথ আর অবনীমোহন এবার জমিতে আউশ ধান দিয়েছিলেন, পাটও রুয়েছিলেন। শ্রাবণের শেষাশেষি আউশ উঠে গেছে। বর্ষায় পাট জাগ দিয়ে রাখা হয়েছিল। কামলারা এখন বার-বাড়ির বাগানে বসে পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছে।
জমিজমা নিয়ে একেবারে মেতে উঠেছেন অবনীমোহন। দিনরাত ধান-পাট, কামলাকৃষাণ, এসব নিয়েই আছেন। কে বলবে, মাত্র ক’মাস আগে জমি কিনেছেন! দেখেশুনে তো মনে হয়, চাষবাসই তাঁর জীবনের সারাৎসার, নিরবধি কাল ধরে এই কাজই করে যাচ্ছেন।
