বাড়ি ফিরে বিনু দেখতে পেল, সমস্ত বাড়িটা যেন শোকাচ্ছন্ন, নিস্তব্ধ। পুবের ঘরের ঢাকা বারান্দায় অবনীমোহন আর হেমনাথ বসে ছিলেন। খুব চাপা গলায় ফিসফিস করে কী বলাবলি করছিলেন।
কাছে যেতে হেমনাথের গলা বিনুর কানে এল, পৃথিবী জোড়া অন্ধকারে ওই একটুখানি আলো ছিল, তাও নিবে গেল।
বিনু বুঝতে পারল, রবীন্দ্রনাথের কথাই হচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ কত বড়, কত বিশাল, কত মহৎ–বিনুর জানা নেই। তবু পাষাণভারের মতো কী যেন তার বুকের ভেতর নিশ্চল হয়ে রইল। শ্বাসটা আটকে আসতে লাগল যেন।
২.২১-২৫ গত বছর পুজোর ছুটির পর
২.২১
গত বছর পুজোর ছুটির পর সেই যে হিরণ ঢাকায় গিয়েছিল, সেই থেকে তার আর খোঁজখবর ছিল না।
হিরণ যাবার পর তাকে নিয়ে এ বাড়িতে আলোচনা কম হয়নি।
একদিন হেমনাথ বলেছিলেন, বাঁদরটা ওইরকম। কাছে থাকলে দিনরাত মাখামাখি, যেই চোখের আড়াল হল অমনি সব ভুলে গেল।
সেদিনই সন্ধেবেলায় সুধা-সুনীতি-বিনু, তিন-ভাই-বোন পড়তে বসেছিল। চারদিক দেখে নিয়ে নিচু গলায় সুনীতি সুধাকে বলেছিল, দাদু হিরণচন্দর সম্বন্ধে তখন কী বলছিল শুনেছিস তো? এমন মানুষকে মন দিলি ভাই, একবার খোঁজও নেয় না।
সুধা ঠোঁট উলটে দিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলেছিল, খোঁজ নেয় না বলে তো আমি একেবারে মরে গেছি।
গেছিসই তো—
তোকে বলেছি?
না বললে কি। তোর মুখ দেখে বুঝতে পারি না, ভেবেছিস?
ও বাবা– সুধা গালে হাত রেখে বলেছিল, কবে থেকে অন্তর্যামী হলি রে দিদি!
সুনীতি বলেছিল, যেদিন হিরণচন্দরের সঙ্গে তোর আলাপ হয়েছে সেদিন থেকে একটু চুপ। তারপর সুনীতিই আবার শুরু করেছিল, ওই ভদ্রলোকটি কিন্তু বেশ। কলকাতা থেকে ঠিক চিঠিপত্তর দিয়ে যাচ্ছে।
সুধা মুখ টিপে হেসেছিল, তোর কথাই আলাদা। মনের মতো মনের মানুষ পেয়েছিস।
তোরটা বুঝি মনের মতো নয়?
বিচ্ছিরি।
আয় তা হলে বদলা বদলি করে নিই।
বদলা বদলির দরকার নেই। দুটোকেই তুই নিয়ে নে—
মুখ লাল হয়ে উঠেছিল সুনীতির। ঝঙ্কার দিয়ে বলেছিল, তুই ভারি অসভ্য হয়ে উঠেছিস সুধা।
সুধা উত্তর দেয়নি, হেসে সে গড়িয়ে পড়েছিল।
.
বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ দুপুরবেলা বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঢাকা থেকে আজ হিরণ এসে হাজির। পুবের ঘরে সুধা-সুনীতি-বিনু আর হেমনাথ বসে ছিলেন। হিরণকে দেখে হেমনাথ প্রায় লাফিয়ে উঠলেন, আরে কালাচাঁদ যে, আয় আয়
হিরণ ছাতা নিয়ে এসেছিল। ছাতাটা মুড়ে বাইরে রেখে ভেতরে এসে বসল।
হেমনাথ আবার বললেন, কী ব্যাপার, এতদিন খবর নেই বার্তা নেই, একবার আসিসও নি। ঢাকায় বসে কী করছিলি?
হিরণ খুব গম্ভীর গলায় বলল, সরস্বতীর আরাধনা।
হেমনাথ ভ্রকুটি হানলেন, তার মানে?
তার মানে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। মাসে মাসে আমার পেছনে কতগুলো করে টাকা ঢালছ, খেয়াল আছে?
হেমনাথ কিছু না বলে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকলেন।
হিরণ বলল, অন্তত একটা ফার্স্ট ক্লাস যদি না পাই, তুমি আমাকে আস্ত রাখবে?
হেমনাথ হেসে ফেললেন, তা রাখব না। শুধু কি তাই, এখানকার কলেজে চাকরিও দেব না।
তা হলেই বুঝে দেখ, ঢাকা থেকে হুট হুট ছুটে আসা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
না-ই বা এলি, মাঝে মাঝে চিঠি লিখলেও পারিস তো।
চিঠি লেখা আমার কোষ্ঠীতে নেই, তা তো তুমি জানোই।
তোর কোষ্ঠীতে নেই। এদিকে আরেক জনের দিকে যে তাকানো যায় না। মুখে সব সময় মেঘ জমে আছে।
কার?
আঙুল বাড়িয়ে সুধাকে দেখিয়ে দিলেন হেমনাথ। হিরণ-সুধা বা সুনীতি-আনন্দর মধ্যে যে হৃদয়রাগের খেলা চলছে এ বাড়িতে তা বিশেষ গোপন নেই। এ ব্যাপারে হেমনাথদের কিছু প্রশ্রয়ও আছে। তাদের স্নেহের ছায়ায় চারটি উন্মুখ তরুণ মনে উৎসব শুরু হয়ে গেছে যেন।
হাত-পা নেড়ে একেবারে চেঁচামেচি জুড়ে দিল সুধা, আহা-হা, আহা-হা—
এই সময়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন হেমনাথ। রসালো সুর টেনে টেনে বললেন, আহা আহা করিস লো সই। বলেই হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গান ধরলেন:
নয়ন-নীরে কি নেভে মনের অনল,
সাগরে প্রবেশি যদি না হয় শীতল।
তৃষার চাতকী মরে, অন্য বারি নাহি হেরে,
ধারাজল বিনে তার সকলই বিফল।
যবে তারে হেরে সখি, হরিষে বরিষে আঁখি,
সেই নীরে নিভে সখি অনল প্রবল।
সুধা লাফ দিয়ে উঠে পড়ল। আরক্ত মুখে বলল, এরকম করলে আমি কিন্তু চলে যাব দাদু–
হাত ধরে সুধাকে তক্তপোষে বসিয়ে দিতে দিতে হেমনাথ বললেন, আচ্ছা আচ্ছা, এই গান থামিয়ে দিলাম। তোরা গল্পটল্প কর। আমাকে বেরুতে হবে। হিরণ, তুই এখানে খেয়ে যাবি। হোম ডিপার্টমেন্টে বলে যাচ্ছি।
হিরণ ঘাড় হেলিয়ে জানালো, খেয়েই যাবে।
বেরিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ কী মনে পড়ায় দাঁড়িয়ে পড়লেন হেমনাথ। হিরণের চোখে চোখ রেখে বললেন, হ্যাঁ রে–
কী বলছ?
পুজো তো এসে গেল।
হ্যাঁ।
গেল বারের মতো এবারও নাটক টাটক করবি তো?
হিরণ বলল, এবার পুজোর ছুটিতে আমি আসছি। ঢাকাতেই থাকব।
একটু অবাক হলেন হেমনাথ, কেন রে?
ছুটির পর কতটুকু আর সময় পাওয়া যাবে। তারপরই পরীক্ষা–
তাই তো, আমার খেয়াল ছিল না। না না, ছুটিতে তোর আসার দরকার নেই। পরীক্ষা আগে, জীবনে ফুর্তি করার ঢের সময় পাওয়া যাবে। আচ্ছা এখন যাই।
হেমনাথ বেরিয়ে যাবার পর মুখ নিচু করে নিঃশব্দে নখ দিয়ে তক্তপোষে আঁকিবুকি কাটতে লাগল সুধা। হিরণের সঙ্গে কথা টথা যা বলবার, সুনীতিই বলল। তার এতদিন ডুব দিয়ে থাকা নিয়ে ঠাট্টা করল, প্রাণ খুলে হাসির ফোয়ারা ছোটাল। তারপর একসময় কাজের ছল করে উঠে গেল।