কিছুক্ষণ বাজনার পর কাগা বগাকে থামিয়ে হরিন্দ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, হাটৈরা ভাইরা, এইবার এছ.ডি.ও ছাব আপনেগো কিছু কইবেন– বলে একধারে সরে গেল।
এস.ডি.ও সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
কোথাও এতটুকু আওয়াজ নেই। বাতাস বুঝি থেমে গেছে। গাছের একটা পাতা খসলেও এখন তার শব্দ শোনা যাবে।
গলায় খাকারি দিয়ে এস.ডি.ও সাহেব হঠাৎ শুরু করলেন, বন্ধুগণ, আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন যুদ্ধ লেগেছে—
কেউ উত্তর দিল না। গলা লম্বা করে জনতা উদ্গ্রীব দাঁড়িয়ে আছে, তাদের চোখের পলক পড়ছে না।
এস.ডি.ও সাহেব চারদিকের সারি সারি মানুষগুলের মুখের ওপর দিয়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে গেলেন। তারপর বলতে লাগলেন, যুদ্ধ আমাদের এই পূর্ব বাংলাতেও চলে আসতে পারে। তাই বলছিলাম, ঘর-সংসার এবং দেশ রক্ষা করবার জন্যে আপনারা দলে দলে সেনাদলে নাম লেখান।
জনতার ভেতর গুঞ্জন উঠল, যুজ্যে যাইতে কয়। হায় আল্লা, উই কারবারে আমি নাই।
আরেকজন কে বলল, যুজ্যে গিয়া মরি আর কি।
অন্য একটি গলা শোনা গেল, লও যাই, মানে মানে অহন সইরা পড়ি।
একটু থেমে এস.ডি.ও সাহেব খুব সম্ভব জনতার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছিলেন। আবার তিনি শুরু করলেন, দেশের জন্যে, মাতৃভূমির জন্যে, নিজের ভাইবোন সন্তানদের জন্যে আপনাদের এগিয়ে আসতে হবে, শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। নইলে সব কিছু ছারখার হয়ে যাবে। একটু ভেবে, আজই আপনাদের যুদ্ধে নাম লেখাতে হবে না, বাড়ি গিয়ে সবাই ভাবুন। আসছে হাটে আবার আমরা আসব। তার পরের হাটেও আসব। এখন থেকে প্রতি হাটেই আমরা আসব। আপনারা এর ভেতর ভেবেচিন্তে নিন। মনে রাখবেন, সেনাদলে এমনি এমনি নাম লেখাতে বলছি না। ভালই মাইনে পাবেন, পোশাক পাবেন, ভাল খেতে পাবেন। আমার কথা শেষ হল, এবার ম্যজিস্ট্রেট সাহেব আপনাদের কিছু বলবেন। বলে বসে পড়লেন তিনি।
ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট এবার উঠে দাঁড়ালেন। বাংলাটা তিনি ভালই বোঝেন, কিন্তু তেমন বলতে পারেন না। ভাঙা ভাঙা যা বললেন তা এইরকম।
বন্ধুগণ, আপনারা যুদ্ধে আসিলে টাকা পাইবে, অনেক সুখ হইবে। গভর্নমেন্টের খুব আনন্দ হইবে। ইত্যাদি ইত্যাদি–
খাস ইংরেজের আড়ষ্ট জিভে জায়গা পেয়ে গর্বে বাংলা ভাষার বুক যেন দশ হাত ফুলে উঠল। একটু পর ম্যজিস্ট্রেট সাহেবরা চলে গেলেন।
হাটুরে মানুষগুলো সেনাদলে নাম লেখাবার ব্যাপার নিয়ে সন্ত্রস্ত আলোচনা করতে করতে তামাক হাটা, মরিচ-হাটা, গো-হাটার দিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
বিনুরা তখনও দাঁড়িয়ে ছিল।
উদ্বেগের গলায় হেমনাথ বললেন, যুদ্ধে রিক্রুটমেন্টের জন্যে ম্যাজিস্ট্রেট, এস.ডি.ও পর্যন্ত ছুটে এসেছে। অবস্থা খুব ভাল না অবনীমোহন।
.
২.২০
জষ্ঠির শেষাশেষি সেই যে বৃষ্টি নেমেছিল, এখনও তার থামবার নাম নেই। মনে হয়, দু’এক দিন নয়, দু’চার মাসও নয়, অনাদি অনন্তকাল ধরে ঝরছেই। ঘন কালো মেঘে আকাশ আচ্ছন্ন হয়ে
আছে। বৃষ্টির লক্ষ কোটি ধূসর ধারায় চরাচর ঝাঁপসা, বর্ণহীন, বিস্বাদ।
ঘরের জানালায় বসে আকাশ দেখতে দেখতে বিনুর মনে হয়, কোনওদিন আর বেরুতে পারবে না, আর কখনও রৌদ্রোজ্জ্বল ঝকমকে দিনের মুখ দেখতে পাবে না। এই ঘরটুকুর মধ্যেই চিরকাল বন্দি হয়ে থাকতে হবে। অথচ ঘরে থেকে থেকে তার প্রাণ অস্থির হয়ে উঠেছে।
জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিনুর মনে হয়, জলের গন্ধ, ভেজা মাটির গন্ধ, গাছপালার গন্ধ চুঁইয়ে চুঁইয়ে তার বুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে এবং সেখানে বিচিত্র এক বিষাদ গাঢ় করে তুলছে। খুব খারাপ লাগে বিনুর, খুব খারাপ লাগে।
তাকে একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে ঝিনুক কখনও কখনও কাছে এসে দাঁড়ায়। অন্যমনস্কের মতো বিনু বলে, বৃষ্টি বোধহয় আর থামবে না।
ঝিনুক বলে, থামবে না, তোমায় বলেছে।
আবার রোদ উঠবে?
উঠবে।
কবে?
বর্ষা গেলেই।
যেদিন সকালের দিকে জোর বৃষ্টি নামে সেদিন আর স্কুলে যেতে পারে না বিনু। অল্প বৃষ্টি থাকলে অবশ্য ছাতা মাথায় দিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
এই বর্ষার সময়টা প্রায়ই স্কুল কামাই হচ্ছে। সারাদিন বাড়িতে আটকে থেকে পরিচিত মানুষগুলোকে বার বার, হাজার বার দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়ে বিনু। সন্ধের সময় ইচু মন্ডলরা জলে ভিজে ভিজে যখন যুদ্ধের খবর শুনতে আসে, সেই সময়টা মোটামুটি উন্মাদনার মধ্যে কেটে যায়।
রোজই খবরকাগজ নতুন নতুন উত্তেজনা নিয়ে আসে। যুদ্ধের তান্ডব ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এক দিগন্ত থেকে আরেক দিগন্ত পর্যন্ত তার অশুভ ভয়াবহ ছায়া পড়ছে। বর্ষার অনড় মেঘের মতো দুই গোলার্ধকে কী এক অভিশাপ যেন ঢেকে ফেলেছে।
যুদ্ধের খবরের মধ্যে একদিন অবনীমোহন পড়ে শোনালেন, রবীন্দ্রনাথ খুব অসুস্থ। তারপর আরেক দিন পড়লেন তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
দিনের পর দিন যেতে লাগল।
.
সেদিন অল্প অল্প বৃষ্টির ভেতর স্কুলে গেল বিনু। দু’টো ক্লাস হবার পর হঠাৎ থার্ড পিরিয়ডে হেড মাস্টার মোতাহর সাহেব এলেন। অবোধ বালকের মতো তিনি কাঁদছেন। চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা গলায় বললেন রবীন্দ্রনাথ আর নেই। আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি কী ছিলেন, কত বিরাট, কত বিপুল, আজ বুঝতে পারবে না। বড় হয়ে তাকে বুঝতে চেষ্ট করো। যাও, আস্তে আস্তে বাড়ি চলে যাও।
