চমকে বিনু সেদিকে চোখ ফেরাতেই দেখতে পেল সেই ঢেঁড়াদার লোকটা নাম–যার হরিন্দ– একটা উঁচু প্যাকিং বাক্সের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে মা কালীর অসুরের মতো কুচকুচে কালো দুই ঢাকী, কাগা আর বগা, মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে প্রচন্ডভাবে ঢাক পিটিয়ে চলেছে।
বিনুর মনে পড়ে গেল, যুগলের সঙ্গে প্রথম যেদিন সে সুজনগঞ্জের হাটে আসে সেদিনও কাগা বগা আর হরিন্দকে ঢেড়া দিতে দেখেছিল। অনেক-অনেকদিন পর হরিন্দ এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গকে আবার সুজনগঞ্জে দেখা গেল।
ঢাকের আওয়াজ পেয়ে তামাক-হাটা, আনাজ-হাটা, নৌকো-হাটা ভেঙে দিগ্বিদিক থেকে মানুষ ছুটে আসতে লাগল। মুহূর্তে হরিন্দদের গোল করে ঘিরে ভিড় জমে গেল।
হেমনাথ বললেন, হরিরা এসেছে দেখছি। অবনীমোহন বললেন, হ্যাঁ। কিসের কেঁড়া দিতে এল, কে জানে।
অবনীমোহন কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলেন। উৎসুক সুরে বললেন,চলুন মামাবাবু, একটু দেখে আসি।
তার মনের কথাটা বুঝিবা পড়তে পারলেন হেমনাথ। বললেন, চল।
কাছাকাছি আসতে বিন্দুরা দেখতে পেল, মাথাটা একদিকে হেলিয়ে লোক জন দেখছে হরিন্দ। যখন বুঝতে পারল, সারা হাট তার চারধারে ভেঙে পড়েছে সেই সময় হাতের ইঙ্গিতে কাগা বগাকে থামিয়ে দিল।
ভিড়ের ভেতর থেকে হাটুরে মানুষগুলো প্রশ্ন ছুঁড়তে লাগল, এতকাল পর কী মনে কইরা গো ঢ্যাড়াওলা?
হরিন্দর বলল, সম্বাদ আছে।
হরিন্দর আসা মানেই রসের বান ডেকে যাওয়া। পাখি যেমন নানা দেশ থেকে ঠোঁটে ঠোঁট শস্যকণা কুড়িয়ে আনে, হরিন্দও তেমনি মজার মজার চমকদার খবর নিয়ে আসে। এই জলা-বাংলার জীবন যেখানে মৃদু, নিঃশব্দ, তিরতিরে স্রোতের মতো বেগবর্ণহীন, হরিন্দ সেখানে আনন্দের দূত। ঝুলি বোঝাই করে সে আনন্দ নিয়ে আসে। হরিন্দ এলেই তাই হাটে সাড়া পড়ে যায়।
হাটুরে লোকেরা উৎসাহিত হয়ে উঠল, কী সম্বাদ, কী সম্বাদ?
হরিন্দ বলল, শুনলেই বুঝবা, ধৈয্য ধর।
লোকগুলোর ধৈর্য মানে না। অধীর গলায় তারা বলতে লাগল, রসের সম্বাদ তো, অ ঢ্যাড়াওলা?
উত্তর না দিয়ে হরিন্দ এবার ঢাকী দু’টোর দিকে তাকাল, বাজা ব্যাটারা, ঘুইরা ফিরা বাজা–
একধারে বসে কাগা বগা বিড়ি টানছিল তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ঢাকে কাঠি দিয়ে চারদিক সরগরম করে তুলল।
এটা হরিন্দর পুরনো কৌশল। এর সঙ্গে বিনুর আগেই পরিচয় হয়েছে। লোকের কৌতূহল উসকে দেবার জন্য মাঝে মাঝে কথা বন্ধ করে কাগা বগাকে দিয়ে ঢাক বাজাতে থাকে।
কিছুক্ষণ বাজাবার পর হরিন্দ কাগা বগাকে থামাল। তারপর গলা উঁচুতে তুলে বলল, হাটেরা (হাটুরে) ভাইরা, তোমরা অহন যাইও না। দুইজন মাইন্যগণ্য মনিষ্য আইজ এইখানে আইব।
সমস্ত ভিড়টা চেঁচিয়ে উঠল, তোরা কারা?
এছ.ডি.ও সাব আর জিলা ম্যাজিস্টর সাব। মটর লঞ্চে কইরা তেনারা আইব।
ভিড়ের ভেতর এবার গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল, এছ.ডি.ও সাব, ম্যাজিস্টর সাব এইখানে ক্যান? অ ঢ্যাড়াওলা ভাই, তুমি কিছু বিত্তান্ত জানো?
হরিন্দ বল, জানি। তয়–
তয় কী?
কমু না।
ক্যান কইবা না? ক্যান?
নিষেধ আছে। যা কওনের তেনারা আইসা কইব। ইট্টু সবুর কর।
ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট এবং এস.ডি.ও’র মতো মানুষ যে সুজনগঞ্জের হাটে আসতে পারেন, এ এক অভাবনীয় ঘটনা। কেন তারা আসছেন, উদ্দেশ্যটা কী, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কাজেই হাটুরে মানুষগুলোর ভেতর গবেষণা শুরু হয়ে গেল।
মাছ ব্যাপারি গয়জদ্দি বলল, আমার মনে লয়, ধান চাউলের দর-দাম বাড়তে আছে, ম্যাজিস্টর সাবরা এইর এট্টা পিতিকার করব। হেই লেইগা আইতে আছে।
বেগুন ব্যাপারি নোয়জ মিঞা বলল, আমার কিন্তুক অন্য কথা মনে লয়।
মরিচ ব্যাপারি বিনোদ পাল শুধলো, কী মনে লয় নোয়াজ ভাই?
আমাগো হাটেরা মানুষগো পিছামোড়া বাইন্ধা লইয়া যাইব।
শুদাশুদি বাইন্ধা নিব ক্যান? আমাগো অপরাধখান কী?
গরিব মাইনষের অপরাধ লাগে না, বাইন্ধা নিলেই হইল।
ওধার থেকে গো-হাটার কাদের মিঞা হালকা গলায় রঙ্গ করে, আমার কী মনে লয় জানস? ম্যাজিস্টর সাবের পোলার লগে এছ.ডি.ও সাবের মাইয়ার শাদি হইব। হেই লেইগা আমাগো দাওয়াত করতে আইতে আছে।
সবাই হেসে উঠল।
হালকা এবং গম্ভীর, যত আলোচনাই চলুক, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবদের আসার উদ্দেশ্যটা বোঝা যাচ্ছে না। তাই হাটুরে মানুষগুলো ভীত, চিন্তিত, সন্ত্রস্ত হয়ে রইল। সন্দেহে সংশয়ে দুলতে লাগল।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, সত্যি সত্যি একটু পর ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবরা এসে পড়লেন। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব খাস ইংরেজ, লাল টকটকে চেহারা। ছ’ফুটের বেশি লম্বা, প্রকান্ড বুকের পাটা, মাথায় হ্যাঁট। এস.ডি.ও সাহেব কিন্তু বিশুদ্ধ বঙ্গসন্তান। কিন্তু গায়ের রংটি বাদ দিলে কে বলবে তিনি বাঙালি! হ্যাঁট-কোট-প্যান্ট এবং চালচলন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের চাইতে তিন কাঠি ওপরে।
ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবদের আগমনটি সত্যিই দর্শনীয়। সামনে এক অক্ষৌহিণী বন্দুকধারী পুলিশ, পেছনে আরেক অক্ষৌহিণী। দু’টো লম্বা লোক ম্যজিস্ট্রেট এবং এস.ডি.ও সাহেবের মাথায় ছাতা ধরে আছে।
তারা এসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোত্থেকে দুটো বড় বড় কারুকাজ-করা ভারি চেয়ার এসে পড়ল। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবরা বসলেন। চারদিকের জনতা দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
চেয়ারে বসেই এস.ডি.ও সাহেব ইশারায় হরিন্দকে কাছে ডাকলেন, তার কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু গলায় কী ফিসফিস করলেন। তারপরেই হরিন্দ লাফ দিয়ে ঢাকী দু’টোর কাছে গিয়ে হাওয়ায় হাত ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, বাজা ব্যাটারা, বাজা–
