কচুবনে দিন রাত ব্যাঙ ডাকছে, ঝিঁঝিদের রাজ্যেও একটানা জলসার আসর বসেছে। আকাশ পাতাল জুড়ে তাদের মিলিত সুর সব কিছুকে করুণ, বিষণ্ণ, উদাস করে তুলেছে। এ ছাড়া যেন পৃথিবীতে আর কোনও শব্দ নেই।
এই জল-বাংলায় এত যে পাখি-জলপিপি, কবুতর, মোহনচূড়া, বখারি, শালিক, সিদ্ধিগুরু, বুনো টিয়া–বর্ষা নামবার পর থেকে তাদের আর দেখা নেই। কোথায়, কোন ঠিকানায় তারা দেশান্তরী হয়েছে, কে জানে।
সমস্ত চরাচর বৃষ্টির অবিরাম দীর্ঘ ধারাগুলির ওধারে ঝাঁপসা হয়ে আছে। কদাচিৎ পুকুরের ওপারে ধানখেতের ভেতরে এক আধটা নৌকো চোখে পড়ে। দেখেও যেন বিশ্বাস হতে চায় না। মনে হয়, অনেকদিন আগের দেখা কোনও আবছা স্মৃতির ভেতরে নৌকোগুলো দোল খাচ্ছে।
বৃষ্টি মাথায় নিয়ে একদিন হেমনাথ আর অবনীমোহনের সঙ্গে সুজনগঞ্জের হাটে গেল বিনু। অনেক দিন পর এবার সুজনগঞ্জে এল সে। স্কুল চলছে, এখন হাটে আসবার সময় কোথায় তার।
এত জল, এত বাদলা, তবু সুজনগঞ্জের হাটে ভিড় একই রকম আছে। শিয়রের দিককার নদীটা নৌকোয় নৌকোয় তেমনই ঢাকা। কয়েক মাইলের ভেতরে এই একটাই তো হাট। বিকিকিনির জন্য, ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য, প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসটুকুর জন্যও হাটের মুখ চেয়ে বসে থাকতে হয়। মানুষ না এসে কী করবে?
জল-বাংলায় বেশ কিছুদিন কেটে গেল বিনুদের। দাদুর সঙ্গে খুব বেশি না হলেও সুজনগঞ্জের হাটে খুব কমও আসেনি সে। আর অবনীমোহন তো প্রতি হাটেই আসছেন। নিয়মিত যাতায়াতের ফলে সুজনগঞ্জের সব ব্যাপারি-পাইকার-আড়তদার-দোকানদারের সঙ্গে তার আলাপ হয়ে গেছে।
হেমনাথের বাড়ি উঁচু মন্ডলরা সন্ধেবেলা এসে যা বলাবলি করে, দেখা গেল তা সত্যি। মাছের বাজারে, আনাজপাতির বাজারে, ডাল-মশলার বাজারে–যেখানেই যাচ্ছে সেখানেই এক কথা।
জিনিসপাতি আগুন হইয়া উঠছে। কী যে করুম—
দর বাড়লে তোমাদের তো ভালই। লাভ বেশি।
লাভ বেশি ঠিকই, কিন্তুক আমাগোও তো চড়া দরে চাউল ডাইল কিনতে হয়। বেশি ভালা কইরা সুফল কী? আগে দশ ট্যাকা বার টাকার মাল বিকাইতে পারলে হপ্তার খরচ উইঠা যাইত, পোলা-মাইয়ারে দুধে-ভাতে রাখতে পারতাম। আইজকাইল বিশ পঞ্চাশ ট্যাকা বেইচাও ব্যাড় (বেড়) পাই না। দিনকাল কী যে পড়ল!
হাটে এলেই হেমনাথ চারদিক টহল দিয়ে বেড়ান। এখানে একটু বসেন, ওখানে দু’দন্ড দাঁড়িয়ে গল্প করেন। হেমনাথের সঙ্গে থেকে থেকে তার এই স্বভাবটি পেয়ে গেছেন অবনীমোহন। হাটের সব মানুষের সঙ্গে দু’একটা কথা বলতে না পারলে তার ভালই লাগে না।
ঘুরতে ঘুরতে বিনুরা একসময় নিত্য দাসের ধানের আড়তে এসে পড়ল। খুব খাতির টাতির করে নিত্য দাস তাদের বসাল।
হেমনাথ বললেন, তারপর খবর কী নিত্য?
নিত্য দাস শুধলো, কুন খবর জানতে চান বড়কত্তা?
কোন খবর আর, ধান চালের–
ধান চাউলের খবর জবর মোন্দ—
কেমন?
চাউলের দর বিশ ট্যাকায় উঠছে।
গেল হাটে না আঠার ছিল?
হ। নিত্য দাস মাথা নাড়ে, অহন রোজ দর চেততে (চড়তে) আছে। বলতে বলতে গলা নামিয়ে ফিসফিস করে, একখান বড় খারাপ সম্বাদ শুনলাম বড়কত্তা–
কপাল কুঁচকে হেমনাথ জিজ্ঞেস করেন, কী সংবাদ?
ধান চাউল নিকি আর পাওয়া যাইব না।
কে বললে?
পরস্পর কানে আইতে আছে।
হেমনাথ চিন্তিত মুখে বললেন, ঠিক শুনেছিস?
নিত্য দাস বলল, হ, বড়কত্তা।
এ দেশ ধান চালের দেশ। এত ধান চাল যাবে কোথায়?
যুজ্যে নিকি লাগব।
একটু নীরবতা। তারপর নিত্য দাসই আবার শুরু করল, বড়কত্তা একখান কথা জিগাই।
কী?
আপনের হগল ধান বেইচা দিছেন?
না।
সব ধান অহন ছাইড়েন না, ‘রাখি’ করেন। পরে কামে দিব।
দেখি।
নিত্য দাসের আড়ত থেকে বেরিয়ে বিনুরা বিষহরি তলায় চলে এল। বর্ষা কালে বিষহরি তলার ওধারে পুকুরপাড়ের ফাঁকা জমিতে রোগী দেখতে বসেন না লারমোর। মন্দিরের একধারে একটা বারান্দায় চেয়ার-টেবিল-ওষুধের বাক্স সাজিয়ে বসেন। আজও বসেছিলেন।
বিনুরা এসে তার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিল। রোগী দেখতে দেখতে কথা বলতে লাগলেন লারমোর।
অবনীমোহন বললেন, জিনিসপত্রের দর ভয়ানক চড়ছে লালমোহন মামা।
অন্যমনস্কের মতো লারমোর বলেন, চড়ছে নাকি?
বা রে, আপনি জানেন না!
জানবার সময় কোথায়? লারমোর বলতে থাকেন, সারাদিন রুগী নিয়েই থাকি। অন্য দিকে তাকাবার ফুরসতই পাই না। অবশ্য–
অবনীমোহন বলেন, কী?
রোগীরা দর চড়ার কথা বলে বটে।
অবনীমোহন এবার চুপ করে রইলেন।
লারমোর আবার বললেন, দর যদি চড়েই, তুমি আমি কী করতে পারি বল? ভেবে কিছু লাভ নেই।
কথাটা ঠিক। ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন অবনীমোহন।
লারমোর বলতে লাগলেন, ঘরে কছু চাল আছে। দর চড়লে জিনিসপত্তর যদি কিনতে না পারি একবেলা ফেনা ভাত করে খাব। দিনে একবার খেতে পেলেই আমার চলে যাবে।
যে মানুষের ঘর-সংসার নেই, ছেলেমেয়ে নেই, বহুজনের হিতে যিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন তার সঙ্গে দর টর নিয়ে আলোচনা করতে যাওয়া বৃথা। তা বুঝে অবনীমোহন অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন। এবারকার বর্ষা, লারমোরের রোগী, ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলল।
কথায় কথায় একসময় বৃষ্টি ধরে এল। পুব দিকের ঘন মেঘে ফাটল ধরিয়ে চিকচিকে একটু আভা ফুটে বেরুল।
হেমনাথ বললেন, বৃষ্টি থেমেছে। এই ফাঁকে কেনাকাটা সেরে নিলে ভাল হত না?
হ্যাঁ হ্যাঁ– ব্যস্তভাবে অবনীমোহন উঠতে যাবেন, সেই সময় দুরের ফাঁকা মাঠটায় একজোড়া ঢাক, বেজে উঠল।
