বুধাই পাল একবার বলেছে, মাইনষের মুখে শুনি, খবরের কাগজেও লেখছে, দ্যাশখান নিকি ভাগাভাগির কথা হইতে আছে। একখান ভাগ হিন্দুর, একখান মুসলমানের।
হেমনাথ আস্তে আস্তে করে মাথা নাড়েন।
দ্যাশ আবার ক্যামনে ভাগ হয়?
কী জানি—
এই সময় ইচু মন্ডল হঠাৎ বলে উঠেছে, দ্যাশভাগের কথায় একখান কথা মনে পড়ল। সম্বাদখান তোমাগো শুনাই।
কও, কও–সবাই উৎসাহিত হয়ে উঠেছে।
বুঝলা নি ভাইস্তারা (ভাইপোরা), হেই–হেইবার–গলার স্বরে দীর্ঘ টান দিয়ে একটু থেমেছে ইচু মন্ডল। হয়তো মনে মনে বক্তব্যটাকে গুছিয়ে নিচ্ছিল সে।
শ্রোতাদের তর আর সইছিল না। ভাববার মতো সময়টুকু দিতেও রাজি নয়। সকলে সমস্বরে তাড়া দিয়ে উঠেছে, কুন বার চাচা, কুন বার?
ইচু মন্ডল পাকা ভুরুদু’টো কুঁচকে বলেছে, হেই যেইবার জোড়া বান ডাকল। কী তুফান বড় নদীতে! এই রাইজদা জলের তলে পরায় (প্রায়) সাত দিন ডুইবা আছিল। ঝড়ে আমার বাড়ির মধুটুকরি আমের গাছটা মাটিতে শুইয়া পড়ল, দুইখান ঘরের চাল উইড়া গিয়া পড়ল নয় মাইল তফাতে। হেইবারের দুই বছর আগে কি পরে, মনে নাই–
সময় সম্পর্কে এখানকার মানুষের ধারণা অদ্ভুত। সাল-তারিখের হিসেব নিয়ে তাদের দুর্ভাবনা নেই, তার ধারও তারা পারে না। ভয়াবহ কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা ওইরকম কোনও ঘটনার স্মৃতি দিয়ে তারা সময়ের হিসেব করে।
ইচু মন্ডল থামেনি, হেইবার, বুঝলা ভাইস্তারা, এংরাজরা ঠিক করছিল বাংলা দ্যাশখানেরে দুই টুকরা করব–
পারছিল?
হে কি পারে! বড় বড় বাবুরা আর বড় বড় মোছাবরা দ্যাশখান উথালপাথাল কইরা ছাড়ল। শ্যাষম্যাষ এংরাজরা ডরাইয়া গেল, দ্যশ আর টুকরা টাকরি করতে সাহস পাইল না।
রোজই এই খবরের কাগজ পড়ার সময় কিছুক্ষণ অবনীমোহনদের কাছ এসে বসে বিনু। কী একটা বইতে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের কথা পড়েছিল সে। বিনু বুঝতে পেরেছে, সেই কথাই বলছে ইচু মন্ডল।
বুধাই পাল, হাচাই পাল এবং ইসমাইল চৌকিদারও বয়সে বেশ প্রবীণ। অবশ্য ইচু মন্ডলের চাইতে ঢের ছোট। ইচুর কথায় তাদেরও যেন মনে পড়ে গেছে। ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে তারা বলেছে, আমাগো ছুটোকালে এইরকম একখান কথা শুনছিলাম য্যান।
ইচু মন্ডল আবার কী বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ তার নজর এসে পড়েছে হেমনাথের ওপর। হেমনাথ চুপচাপ ওদের কথা শুনছিলেন। ইচু মন্ডল তাঁকেই সাক্ষী মেনে এবার বলেছে, এই যে হ্যামকত্তা, আপনেই তো এই রাইজদা তুলফাড় কইরা ফালাইছিলেন। মনে পড়ে, বাড়ি বাড়ি ঘুইরা বুঝাইছিলেন, হিন্দুই হউক আর মুসলমানই হউক, হগল বাঙ্গালীই এক।
হেমনাথ উত্তর দেন নি, অল্প হেসে ঘাড় হেলিয়ে দিয়েছেন।
ইচু মন্ডল আবার বলেছে, এংরাজ পারে নাই, ওনারা পারব! যত তামশার কথা!
বয়স যাদের কম তারা শুধিয়েছে, এই হগল কত কাল আগের কথা চাচা?
ইচু মন্ডল বলেছে, তা বিশ পঞ্চাশ বচ্ছর আগের হইব। বলতে বলতে হেমনাথের দিকে ফিরেছে, না হ্যামকত্তা?
হেমনাথ কৌতুক বোধ করেছেন। বলেছেন, তুমি তো সবই জানো।
কমবয়সীরা জিজ্ঞেস করেছে, তখন তোমার কত ব’স (বয়স) চাচা?
ইচু মন্ডল বলেছে, হে হইব দ্যাড় কুড়ি। ছ্যামরারা, তহন আমার জুয়ান ব’স (বয়স), ঘরে তিন বিবি–
শুনতে শুনতে সবাই হেসে উঠেছে।
.
২.১৯
এই জল-বাংলায় ঋতু বলতে চারটি-শীত গ্রীষ্ম বর্ষা এবং শরৎ। বাকি ঋতুগুলি কখন যায় কখন আসে, বিশেষ টেরও পাওয়া যায় না। তারা আসে চুপিচুপি, যায় আরও নিঃশব্দে।
চার ঋতু বাদ দিয়ে থাকে হেমন্ত আর বসন্ত। মাঠভর্তি জলে যখন টান ধরে, উত্তরে বাতাসে যখন চামড়া ফাটতে থাকে, সকালের দিকে ঠান্ডায় গায়ে কাঁটা দেয়, কুয়াশায় হিমে সন্ধেটা যখন ঝাঁপসা, সেই সময়টা হেমন্ত। ভাল করে হেমন্তকে বুঝবার আগেই শীত নেমে যায়। শীতের পর মান্দার আর শিমুল গাছে থোকা থোকা রক্তবর্ণ ফুলের নিশান উড়িয়ে বসন্ত আসে, কিন্তু তার আয়ু আর কতটুকু! দেখতে দেখতে মাঠ ঘাট শুকিয়ে চৌচির হয়ে যেতে থাকে। ফাটলের ভেতর থেকে বিষাক্ত নিঃশ্বাসের মতো পৃথিবীর অন্তঃপুরের যত উত্তাপ বেরিয়ে আসে। আকাশ যেখানে ধনুরেখায় দিগন্তে বিলীন, সেখানে যখন আগুনের হলকার মতো রোদ কাঁপতে থাকে তখন টের পাওয়া যায় খরা এসে গেল।
হেমন্ত আর বসন্ত ছাড়া বাকি চার ঋতুর চেহারা এখানে স্পষ্ট। এসেই তাদের পালাই পালাই নেই। একবার এলে যেতেই চায় না, রীতিমতো আসর জাঁকিয়ে বসে, আকাশে বাতাসে আপন স্বভাবটি মুদ্রিত করে তবে যাবার নাম করে।
এখন আষাঢ়। জষ্ঠির মাঝামাঝি খালবিল ছাপিয়ে নতুন বর্ষার জল আসতে শুরু করেছিল। পশ্চিমা বাতাসের টানে আকাশ জুড়ে তখন থেকেই কালো কালো ভবঘুরে মেঘেদের আনাগোনা। জষ্ঠি মাসে যে মেঘগুলো ছিল অস্থির, উড়-উড়, নিয়ত চঞ্চল, তারাই একাকার হয়ে জমাট বেঁধে আকাশময় বিরাট এক চাদোয়ার মতো মাথার ওপর অনড় হয়ে আছে।
সারাদিন বৃষ্টি পড়ছেই। কখনও ঝিপ ঝিপ, কখনও ঝর ঝর। ভরা বর্ষার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বিনুর মনে হয়, যুগযুগান্ত ধরে কাল কালান্তর পার হয়ে এ বৃষ্টি পড়ছেই, পড়েই যাচ্ছে।
হেমনাথের পুকুরটা বর্ষার প্রথম দিকেই ভেসে গিয়েছিল। মাঠ-ঘাট-খেত সব এখন জলের তলায়। নতুন বর্ষার জল পড়তেই বীজ বোনা হয়েছিল। ধানগাছ এখন জলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফনফনিয়ে বেড়ে উঠছে।
