জার্মানদের বর্তমানে চারটি প্রধান লক্ষ্য–মুরমানস্ক, লেনিনগ্রাদ, মস্কো ও কিয়েফ।
কোনও দিন পড়েন, চিন-জাপান যুদ্ধ চার বছর পার হইয়া পাঁচ বছরে পড়িল।
রুশ-জার্মান যুদ্ধ শুরু হইবার পর আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি বিস্তারের দিকে মনোযোগ।
খবরের কাগজের পাতা জুড়ে শুধু যুদ্ধ আর যুদ্ধ, উত্তেজনা আর আতঙ্ক। শ্বাস টানলে বাতাসে বারুদের গন্ধ পাওয়া যায়। দেশ-দেশান্তর জুড়ে সেই আগুনের চাকা যেন আরও, আরও বড় হয়ে ঘুরতে শুরু করেছে।
রোজই খবরের কাগজ পড়া হয়ে গেলে যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা আরম্ভ হয়।
ইচু মন্ডল বলে, জারমান-জুরমান, মাৎসুকা, লেনিনগারদ–নামগুলান জবর খটমইটা।
অবনীমোহন হাসেন, হ্যাঁ।
জাগাগুলি (জায়গাগুলো) কুনখানে জামাই?
ওর ভেতর শুধু জায়গার নামই নেই, মানুষের নামও আছে। জায়গাগুলো এখান থেকে অনেক, অনেক দূরে।
ইচু মন্ডল মাথা নাড়ে, হেয়া বুঝছি। আমাগো দ্যাশে অ্যামন খটর মটর নাম নাই।
বুড়ো রসিক শীল বলে, আইচ্ছা জামাই–
ইতিমধ্যে রাজদিয়া এবং চারদিকের গ্রাম-গঞ্জ-জনপদে জামাই’ নামে পরিচিত হয়েছেন অবনীমোহন। হেমনাথের ভাগনী-জামাই, সেই সুবাদে এ অঞ্চলের জামাই হয়ে গেছেন। ওই নামেই সবাই তাকে ডাকে।
অবনমোহন বলেন, কী বলছেন?
খবরের কাগজ শুইনা তো মনে লাগে, চাইর দিকে বেড়া আগুন লাগছে। আপনের কী মনে লয় (হয়)?
কী ব্যাপারে?
যুজ্যু (যুদ্ধ) কি আমাগো এই রাইজদাতেও আইসা পড়ব?
কেমন করে বলি!
ওধার থকে হাচাই পাল বলে ওঠে, এইখানে যুজ্য লাগব কিনা ক্যাঠা কইব। তয়—
অবনীমোহন শুধোন, তবে কী?
বাজারে আগুন লাইগা গ্যাছে।
বুধাই পাল বলে হে যা কইছ ঠাউরভাই, আগুনই লাগছে। আমাগো লাখান গরিব মাইনষে আর বাচব না। বাইগনের (বেগুনের) স্যার (সের) আছিল এক পহা দ্যাড় পহা, হেই বাইগন অহন তিন পহা চাইর পহায় বিকাইতে আছে।
ইসমাইল চৌকিদার বলে, মলন্দি মাছ আর বজুরি মাছের ভাগা আছিল দুই পহা কইরা। তার দাম উঠছে ছয় পহা। এক গ্যালাস মাঠা চাইর পহা। পটল যে পটল, মূলা যে মূলা, ঝিঙ্গা যে ঝিঙ্গা, বাঙ্গী যে বাঙ্গী-কুন জিনিসখানে হাতে দিতে পারবা! হগল আগুন।
ইচু মন্ডল বলে, মাছ-বাগুন-মূলা-পটল এক কিনারে থুইয়া দাও। যেই দব্য না হইলে পরাণ বাঁচে না তার খবর রাখ?
সমস্বরে অন্য সবাই শুধোয়, কোন দব্য?
ইচু মন্ডল বলে, চাউল রে ভাই, চাউল। চাউলেই ঘাউল করছে। গ্যাল হাটে চাউলের দর কত উঠছে জানো?
কত? কত?
আঠার ট্যাকা মণ।
অনেকগুলো ভীতিবিহ্বল কণ্ঠস্বর শোনা যায়, কও কী মন্ডলের পুত!
ইচু মন্ডল মাথা নাড়ে, ঠিকই কই রে দাদারা, ঠিকই কই।
বুধাই পাল বলে, গ্যাল হাটে চাউল কিনি নাই। তার আগের হাটে কিনছিলাম। তহন দর আছিল বার ট্যাকা মণ। সাত দিনের ভিতরে ছয় ট্যাকা চইড়া গেল!
ইচু মন্ডল বলে, দরের অহনই দেখছ কী! ব্যাপারিরা কইতে আছিল, পরের হাটে আরও চড়ব।
সাচা (সত্যি?
সাচা—
তাইলে উপায়! আরও দর চেতলে (বাড়লে) খামু কী? পোলা-মাইয়ারে খাওয়ামু কী?
খাইতে আর হইব না, শুকাইয়া মরতে হইব।
কী যুজ্যু যে লাগল!
.
এ ক’মাসে খবরের কাগজের পাতা জুড়ে যুদ্ধের খবরই বেশি। তার ফাঁকে ফাঁকে অন্য খবরও চোখে পড়েছে অবনীমোহনের। সেগুলোও পড়ে পড়ে শুনিয়েছেন তিনি।
সত্যাগ্রহ করিয়া মৌলানা আজাদের আঠার মাস সশ্রম কারাদন্ড লাভ।
সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধান। কিছুদিন যাবৎ সুভাষচন্দ্র মৌনাবলম্ব করেন এবং নিজের ঘরে গীতা, চন্ডী ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থ পাঠ করিতে থাকেন। হঠাৎ দেখা যায় তিনি অন্তর্ধান করিয়াছেন। যেদিন তাহার গৃহত্যাগের সংবাদ প্রকাশ পায় সেদিন ভারতরক্ষা আইনের বলে তাহার বিচারের দিন ছিল। সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধানের ফলে সারা ভারতবর্ষে নিদারুণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হইয়াছে।
নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যের অগ্নিমূল্য। দাম বাড়িয়া যাওয়ায় অসন্তোষে নানা স্থানে ধর্মঘট।
এসব ছাড়া মুসলিম লিগের খবর, কংগ্রেসের খবর, নেহরু-জিন্না-গান্ধিজি এবং হক সাহেবের খবর তো ছিলই। আর ছিল জিন্নাসাহেবের দেশ ভাগাভাগি করে নেবার পরিকল্পনা এবং দাবি।
সুভাষচন্দ্র-পাকিস্তান-গান্ধি-জিন্না, এসব নিয়েও হেমনাথের ঘরের দাওয়ায় হেরিকেনের অনুজ্জ্বল আলোয় বসে শ্রোতাদের কম আলোচনা হয়নি, দেশের রাজনৈতিক আর রাষ্ট্রীয় সমস্যা নিয়ে তারা কম মাথা ঘামায় নি।
ইচু মন্ডল বলেছে, আইচ্ছা জামাই—
বলুন– জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়েছেন অবনীমোহন।
সুভাষবাবু গেল কই?
কী করে বলি।
সুভাষবাবু খুব বড় মনিষ্য (মানুষ)।
নিশ্চয়ই।
এংরাজগো চৌখেরে ফাঁকি দিয়া যাওন সোজা না।
তা তো ঠিকই।
ওধার থেকে উদ্বেগের গলায় ইসমাইল চৌকিদার শুধিয়েছে, সুভাষবাবুরে এংরাজরা আর ধরতে পারব?
অবনীমোহন বলেছেন, কিছুই বলতে পারছি না।
ইচু মণ্ডল বকের পাখার মতো সাদা ধবধবে দাড়ি নেড়ে বলেছে, সুভাষবাবুরে আমি দেখছি।
ইসমাইল চৌকিদার, রজবালি সিকদার, বুধাই পালেরা সাগ্রহে জিজ্ঞেস করেছে, কই দেখলা চাচা, কই দেখলা?
বরিশালে, তেনি উইখানে আইছিল। কী সোন্দর দেখতে, য্যান রাজপুত্তুর।
কথায় কথায় দেশভাগের কথাও এসে পড়েছে। পাকিস্তানের কথা এসেছে।
এ প্রসঙ্গে বুধাই পাল বলেছে, অ গো হ্যামকত্তা, অ গো জামাইকত্তা—
হেমনাথ অবনীমোহন দু’জনেই তার দিকে তাকিয়েছেন।
