তবে সব চাইতে পরিবর্তন হয়েছে অবনীমোহনের। জমি পেয়ে একেবারে মেতে উঠেছেন তিনি। ধান উঠে যাবার পর পৌষ মাসে রবিশস্যের বীজ ছড়িয়েছিলেন–মুগ তিল মটর খেসারি। চৈত্রের গোড়ায় রবিফসল উঠে গেছে। চৈত্রের শেষাশেষি হাল-লাঙল নিয়ে আবার মাঠে নেমে পড়েছেন। এ জন্য আটটা কামলা রেখেছেন অবনীমোহন, বলদ কিনেছেন ষোলটা। জমি চৌরস করে রাখবেন এখন, তারপর নতুন বর্ষার জল পড়লেই আউশ বুনবেন।
হেমনাথ ঠাট্টা করেন, তুমি দেখি দুদিনেই আমাদের চাইতেও বড় চাষী হয়ে উঠলে অবনী।
অবনীমোহন কিছু বলেন না, শুধু হাসেন।
সুরমা শুধু বলেন, দেখ, ক’দিন উৎসাহ থাকে।
চৈত্রের পর এল নিদারুণ খরার দিন। মাঠ ফেটে এখন চৌচির। আলের ধারের জলসেঁচি শাকগুলো পুড়ে পুড়ে হলুদ হয়ে যেতে লাগল। মেঘশূন্য আকাশ সারাদিন গলা কাসার রং ধরে থাকে। অনেক, অনেক দূরে আকাশ যেখানে ধনুরেখায় দিগন্তে নেমেছে সেইখানে আগুনের হলকা কাঁপতে থাকে। কার সাধ্য সেদিকে তাকায়।
সারাদিন মাঠে মাঠে ঘুরে সন্ধেবেলা ফেরেন অবনীমোহন। ফিরেই দু’দিনের বাসি খবরের কাগজ নিয়ে বসেন।
.
পুজোর পর সেই যে কলকাতায় গিয়েছিলেন অবীমোহন তখনই তার নামে রাজদিয়ায় খবরের কাগজ পাঠাবার ব্যবস্থা করে এসেছিলেন। টাটকা টাটকা খবর আর কেমন করে পাওয়া যাবে? কলকাতায় যে কাগজ আজ বার হয় ট্রেনে স্টিমারে রাজদিয়ায় পৌঁছতে পৌঁছতে তার দুদিন লেগে যায়। কী আর করা যাবে, এই গ্রামদেশে দু’দিনের বাসি খবর নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় অবনীমোহনকে।
আজকাল কাগজভর্তি শুধু যুদ্ধের খবর। ক’মাস আগেও রাজদিয়ার মানুষের যুদ্ধ সম্বন্ধে মাথাব্যথা ছিল না। কোথায় জার্মানি, কোথায় ফ্রান্স, কোথায় গ্রিস, কোথায় ইংল্যান্ড, কোথায় বা বলকান কান্ট্রি ভূগোলের কোন প্রান্তে এই দেশগুলো ছড়িয়ে আছে তার খোঁজ রাখার প্রয়োজন বোধ করত না তারা। কিন্তু ইদানীং রাজদিয়ার গায়ে যুদ্ধের আঁচ লাগতে শুরু করেছে।
সন্ধে হলে নিকারীপাড়ার আইনুদ্দি, সর্দারপাড়ার ইচু মণ্ডল, কুমোরপাড়ার হাচাই পাল, বুধাই পাল, যুগীপাড়ার গোঁসাইদাস–এমনি অনেকে এসে হাজির হয়। এ ছাড়া হেমনাথ-সুধা-সুনীতি-বিনুরা তো আছেই।
সবাই এসে জড়ো হলে অবনীমোহন হেরিকেনের আলো উসকে দিয়ে কাগজ পড়তে শুরু করেন।
পুজোর পর বাড়ির এবং ব্যবসাপত্তরের ব্যবস্থা করতে কলকাতায় গিয়েছিলেন অবনীমোহন। ফিরে আসার পর থেকেই খবরের কাগজ পড়ার আসর বসছে। প্রথম দিকে ইচু মন্ডলরা আসত না, তখন বাড়ির লোকেদের পড়ে পড়ে শোনাতেন অবনীমোহন। পরে খবর পেয়ে ইচু মন্ডলরা আসতে শুরু করেছে। আজকাল তারা নিয়মিত আসে।
অবনীমোহন কোনও দিন পড়েন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের আওতার ভিতর চলিয়া আসিতেছে। তাহাদের প্রেরিত সমবোপকরণ যাহাতে ব্রিটেনে পৌঁছাইতে না পারে সে জন্য জার্মান বিমান ও ইউ বোটগুলি আটলান্টিকে হানা দিয়ে ফিরিতেছে।
দূর প্রাচ্যে ঘোরালো অবস্থা। ব্রিটেন সেখানে ব্যাপক সামরিক ব্যবস্থা অবলম্বন করিতেছে।
সিঙ্গাপুরের খবরে প্রকাশ, হাজার হাজার অস্ট্রেলিয়ান সৈন্য সিঙ্গাপুরে পৌঁছিয়াছে এবং মালয়ের বিভিন্ন স্থানে যাত্রা করিয়াছে।
কোনও দিন পড়েন, বাংলা সরকারের ইস্তাহার, বিমান আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হউন। কলিকাতা শহরে হাজার হাজার আগুনে বোমা পড়িতে পারে, তবে আগুনে বোমা দেখিয়া ভয় পাইবেন না।
সিঙ্গাপুরের খবর : হাইনান ও টঙ্কিনে জাপানিরা দশ ডিভিশন সৈন্য সন্নিবেশ করিতেছে। ইন্দোচিনের দরিয়ায় জাপানের নৌবাহিনী টহল দিতেছে।
কোনও দিন পড়েন, জাপ পররাষ্ট্র সচিব মাৎসুওকা বার্লিন যাইবার পথে মস্কোতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করিয়াছেন।
কোনও দিন পড়েন, জার্মানি কর্তৃক যুগোশ্লাভিয়া ও গ্রিস আক্রমণ। যুগোশ্লাভিয়াকে হাত করিয়া গ্রিসের উপর আক্রমণ চালাইবার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় নাৎসীরা যুগোশ্লাভিয়া আক্রমণ করে। বেলগ্রেডে প্রচণ্ড বোমাবর্ষণ–
জাপ-সোভিয়েট অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত।
জার্মানির দুর্ধর্ষ সামরিক বিমান য়ুঙ্কারের আবির্ভাব।
কোনও দিন অবনীমোহন পড়েন, চিন-জাপান যুদ্ধের নূতন অধ্যায়। মহাচিনে চুংকিঙ সরকারের সহিত কমিউনিস্টদের মিটমাট হইয়াছে। চিয়াং কাইশেক কমিউনিস্ট চতুর্থ বাহিনী ভাঙিয়া দিবার পর উত্তর-পশ্চিম চিনে কমিউনিস্ট অষ্টম বাহিনী চুংকিঙের সহিত সহযোগিতা করিতেছিল না। ফলে তাহারা জাপ আক্রমণ ঠেকাইতে পারিতেছিল না। এই অবস্থায় চুংকিঙ সরকার কমিউনিস্টদের নিকট আবেদন জানান। ইহার পর কমিউনিস্টরা তাহাদের সহিত যোগদানের সিদ্ধান্ত করে। এখন তাহারা মিলিতভাবে আক্রমণ করায় জাপানিরা মুশকিলে পড়িয়াছে।
শেনসি, সানসি ও হোনানে পাল্টা আক্রমণ চলিতেছে।
কোনও দিন পড়েন, জার্মানির বিরুদ্ধে আমেরিকার আচারণ ক্রমেই উগ্রতর হইয়া উঠিতেছে। মার্কিন সরকার আমেরিকায় জার্মান দূতাবাস, তাদের পাঠাগার, টুরিস্ট ব্যুরো, ট্রান্স ওসেন নিউজ এজেন্সি বন্ধ করিয়া দিয়াছেন।
কোনও দিন পড়েন, রুশ-জার্মান যুদ্ধের শুরু।
লেনিনগ্রাদ, সেবাস্টিপুল, ওদিকে হেলিসিঙ্কি, ওয়ারশ, ডানজিগে জার্মান বোমাবর্ষণ।
কৃষ্ণসাগর হইতে শ্বেতসাগর পর্যন্ত যুদ্ধের বিস্তৃতি।
