যুগল মাথা নাড়ল, আইচ্ছা—
বেশিদিন কিন্তু শ্বশুরবাড়ি থাকতে নেই, বুঝলি?
ঘাড় কাত করে যুগল জানাল, বুঝেছে।
স্নেহলতা আবার বললেন, বেশিদিন থাকলে নিন্দে হয়।
.
সেই যে যুগল দ্বিরাগমনে গিয়েছিল তারপর আর কোনও খবর নেই। সাত দিনের ভেতর ফিরে আসার কথা। সাত দিনের জায়গায় পনের দিন গেল, পনের দিনের পর মাসও যায় যায়। না ফিরল যুগল, না এল পাখি।
সবাই অস্থির, চিন্তিত। হেমনাথ ঠিক করলেন, ভাটির দেশে গোপাল দাসের বাড়িতে লোক পাঠাবেন। তোক আর পাঠাতে হল না, তার আগেই যুগলের চিঠি এল। নিজে তো আর লেখাপড়া জানে না, অন্য কাউকে দিয়ে লিখে পাঠিয়েছে।
শ্রীচরণকমলেষু,
প্রণাম অন্তে জানিবেন, আমরা মঙ্গলমতো পৌঁছিয়াছি। পত্র দিতে দেরি হইল বলিয়া মনে কিছু করিবেন না।
যাহা হউক, বর্তমান জানিবেন আমাদিগের আর রাজদিয়া ফিরত যাওয়া হইবে না। শ্বশুরমহাশয়ের পুত্ৰাদি নাই। তাহার ইচ্ছা আমি এইখানেই বসবাস করি।
এইখানে আমার থাকিবার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু কী করিব? শ্বশুরমহাশয়ের অনেকগুলি পুকুর। ইদানীং কয়েকটি বিলও তিনি ইজারা লইয়াছেন। বিল এবং পুকুরে প্রচুর মাছ। কই, বোয়াল, চিতল, মাগুর, কাজলি, বাতাসী, কালিবাউস, রুই, কাতল, ফলি, পাবদা ইত্যাদি। এত মাছ ফেলিয়া আমার রাজদিয়া ফিরিয়া যাইতে মন চায় না।
ঠাকুমা আপনি এবং বাটিস্থ সকলে আবার প্রণাম নিবেন। ছোটবাবুকে বলিবেন আমার জন্য যেন মন খারাপ না করে।
আগতে আপনাদের কুশল দানে সুখী করিবেন। ইতি–
আপনার সেবক-যুগল।
চিঠি পড়ে কিছুক্ষণ বিষণ্ণ মুখে বসে রইলেন হেমনাথ। স্নেহলতা কাঁদলেন। সত্যিই ছেলেটার ওপর বড় মায়া পড়ে গিয়েছিল তাদের।
যুগল না ফেরাতে সব চাইতে যার বেশি মন খারাপ হয়েছে সে বিনু। বুকের ভেতরটা সবসময় তার ভারী হয়ে থাকে।
যুগল তাকে হাতে ধরে জলে নামিয়েছে, সাঁতার শিখিয়েছে। নৌকো বাওয়ার, মাছমারার কৌশল আয়ত্ত করিয়েছে। হেমন্তের স্থির নিস্তরঙ্গ জলে অলস কচ্ছপ এবং শীতের শূন্য মাঠে সুন্দি কাউঠ্যা’র আস্তানা চিনিয়েছে। এই জলের দেশের প্রতিটি বৃক্ষলতা, প্রতিটি পশুপাখি, প্রতিটি তৃণের নাম সে মুখস্ত করিয়েছে। এখানকার বিশাল নদী, বিরাট আকাশ আর সীমাহীন মাঠের মাঝখানে এক অপার অথৈ বিস্ময়ের ভেতর বার বার তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে বিনুর চোখে নতুন রং ধরিয়ে দিয়েছে। একা একা মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়াতে, জলের ভেতর মাছের খেলা দেখতে কিংবা গাছের ডালে মোহনচূড়া পাখিটার নাচানাচি লক্ষ করতে করতে যে আজকাল ভাল লাগে, সে ওই যুগলের জন্য। এই অসীম বিশ্বের বাধাবন্ধহীন ফসলের খেতে, আঁকাবাঁকা আলপথে, স্কুপের মতো সাজানো আকাশের মেঘগুলিতে কিংবা স্থির জলে নলঘাসের প্রতিবিম্বের মধ্যে যে এত আনন্দ ছড়ানো ছিল, এ খবর যুগলের আগে আর কেউ তাকে দেয়নি।
আপন অভিজ্ঞতার সবটুকু সার বিনুর হাতে তুলে দিয়ে চলে গেছে যুগল। তার জন্য ভোলা সেই নতুন ঘরখানা তালা দিয়ে রেখেছেন স্নেহলতা। প্রায় রোজই তার কথা হয়। অনেক দিনের অনেক স্মৃতির কথা বলতে বলতে চোখ ঝাঁপসা হয়ে যায় স্নেহলতার। শুনতে শুনতে বিনুর মনে বিষাদ ঘন হতে থাকে।
.
২.১৮
যুগল নেই। আজকাল বিনুর ছোটাছুটি ঘোরাঘুরি অনেক কমে গেছে। কাজ বলতে এখন শুধু পড়াশুনো, স্কুলে যাওয়া, ঝিনুকের সঙ্গে ঝগড়া, আর দু’চারদিন পর পর পোস্ট অফিসে গিয়ে সুনীতির চিঠির খোঁজ করা। আনন্দর চিঠি এলে বইয়ের ভেতর লুকিয়ে বাড়ি এসে সুনীতিকে দেয় বিনু, তার জন্য দু’আনা করে পয়সা পায়।
নিবারণ পিওন বলে, দাদুভাই, তুমি আইসা চিঠি নিয়া যাও। আমি গ্যালে একবেলা দুই মুঠা ভালোমন্দ খাইতে পাইতাম।
বিনু বলে, চিঠির সঙ্গে কী, আপনি এমনি গিয়ে খেয়ে আসবেন। আর এই চিঠির কথা কাউকে বলবেন না।
হেসে হেসে, নিবারণ বলে, হেয়া আমি জানি, ব্যাপারখান বড় গুপন (গোপন)।
বিনু হাসে, কিছু বলে না। সুনীতির চিঠির ব্যাপারটা নিয়ে নিবারণের সঙ্গে অলিখিত একটা চুক্তি হয়ে গেছে তার।
মাঘের শেষাশেষি যুগল দ্বিরাগমনে গিয়েছিল। তারপর একে একে ফায়ূন এল, চৈত্র এল। হেমনাথের বাগানে মান্দার গাছগুলো ফুলে ফুলে ছেয়ে গেল, শিমুলগাছের মাথায় থোকা থোকা। আগুন জ্বলতে লাগল। জামরুল আর কালোজাম, রোয়াইল আর কাউগাছগুলো ফলের ভারে নুয়ে। পড়ল। আমের গাছগুলোতে বোল এসেছিল মাঘের গোড়ায়, এখন গুটি ধরেছে। লক্ষ লক্ষ ফড়িং ফিনফিনে পাতলা ডানায় বাগানময় উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। আর উড়ছে পাখি–শালিক, চড়ুই, বুনন টিয়া, বুলবুলি। দক্ষিণ দিক থেকে আজকাল ঝিরঝিরে স্নিগ্ধ হাওয়া বইতে থাকে।
এই ফুল-ফল-হাওয়া, এই পাখি পতঙ্গ, যুগল ছাড়া সব অর্থহীন, সবই বৃথা। অন্তত বিনুর তাই মনে হয়।
যুগল চলে যাবার পর কিছুদিন সময় যেন থমকে ছিল। তারপর আবার চিরাচরিত পুরনো নিয়মে চলতে শুরু করেছে। নবু গাজির ছেলের সঙ্গে মজিদ মিঞার মেয়ের বিয়েও হয়ে গেছে এর মধ্যে। বিনুরা কেতুগঞ্জে গিয়ে সারাদিন থেকে নেমন্তন্ন খেয়ে এসেছে। স্নেহলতা-শিবানী সুরমা-হেমনাথ, প্রত্যেকেই যে যার নিজের কাজের চাকায় বাঁধা। এরই ভেতর একদিন সময় করে বুধাই পালের। মেয়ের মাঘমন্ডলের ব্রত সাঙ্গ করিয়ে এসেছেন স্নেহলতা। হেমনাথের মতো তারও দায়দায়িত্ব কি এক-আধটা? পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক দায়িত্ব, সবই পালন করতে হয়। সুধা সুনীতি নিয়মিত কলেজ করে যাচ্ছে।
