যত শুনছিল ততই অবাক হয়ে যাচ্ছিল বিনু।
এদিকে হেমনাথ গদু চক্কোত্তিকে বলছিলেন, কি চক্কোত্তি, এখনই খেতে বসবে, না নতুন বউ দেখে, পরে–
তাঁর কথা শেষ হবার আগেই গদু চক্কেত্তি বলে উঠল, পাত যহন পইড়াই গ্যাছে তহন বইসাই পড়ি। পরে বউ দেখুম।
এখানেই হাত-পা ধোয়ার জল আনিয়ে দিলেন হেমনাথ। হাত-মুখ ধুয়ে একটা আসনে বসতে বসতে নিমন্ত্রিতদের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল গদু চক্কোত্তি। তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, একজনেরও খাওইয়ার লাখান চেহারা না। এগো তো সব বগের আধার (এরা বকের মতো সামান্য খায়) এগো লগে খাইতে বইসা সুখ নাই, নিজেরই লজ্জা। পাল্লাদার না হইলে আসর জমে না। বলতে বলতে কী মনে পড়তে চোখমুখ আলো হয়ে উঠল তার, ভালা কথা, আপনেগো এইহানে বুধাই পালের ভাই হাচাই পাল তো মন্দ খাওইয়া না। হেরে (তাকে) খবর দ্যান হ্যামকত্তা
হাচাই পালের নেমন্তন্ন হয়েছিল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সে এখনও আসেনি। তক্ষুনি লোক পাঠিয়ে কুমোরপাড়া থেকে তাকে ধরে আনা হল। সব শুনে হাতজোড় করে হাচাই পাল বলল, আমি কি চক্কোত্তি ঠাউরের লগে পাল্লা দিতে পারুম?
গদু চক্কোত্তি হাচাই পালের এই বিনয়ে খুবই সস্তুষ্ট। মুরুব্বিয়ানার সুরে বলল, তুমি ক্যান, এই ঢাকার জিলায় কুনো সুমুন্দি নাই আমার লগে পাল্লা দ্যায়। তয় কিনা, একজন ভাল খাওইয়া কাছে বইলে খাইতে আইট হয়।
অগত্যা হাচাই পালকে তার মুখোমুখি বসতে হল।
হেমনাথ চেঁচিয়ে উঠলেন, ও রে লুচি দে, লুচি দে–
গদু চক্কোত্তি খায় আর গল্প করে। কোথায় কোন রাজবাড়িতে দশ সের দই খেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল, কোথায় শুধু তিন কড়াই মুগের ডাল খেয়েছিল, কোথায় বড় বড় খাইয়েরা পাল্লা দিতে এসে তার কাছে হেরে ভূত হয়ে গেছে, ইত্যাদি ইত্যাদি অসংখ্য দিগ্বিজয়ের কাহিনী বলে যেতে লাগল।
গদু চক্কোত্তির খাওয়া সত্যিই দর্শনীয়। নিমন্ত্রিতরা খাবে কি, হাঁ করে তাকিয়ে আছে। শুধু কি তাই, বাড়ির ভেতর থেকে মেয়েরা পর্যন্ত বেরিয়ে এসে তার খাওয়া দেখছে। এর মধ্যেই বিনু টের পেয়ে গেছে, খাইয়ে হিসেবে এ অঞ্চলে গদু চক্কোত্তির বিপুল খ্যাতি, অসীম প্রতিষ্ঠা।
হাচাই পাল মোটামুটি ভালই পাল্লা দিয়ে যাচ্ছে। গদু চক্কোত্তি শুধু বেগুনভাজা দিয়ে কুড়িখানা লুচি খেল, হাচাই পালও তাই খেল। ফুলকপির তরকারি দিয়ে গদু চক্কোত্তি খেল চল্লিশখানা লুচি, হাচাই পালও চল্লিশখানাই খেল। তবে লক্ষ করা গেল, তার চোখমুখ যেন কেমন কেমন। পেটটা সামনের দিকে অনেকখানি এগিয়ে গেছে, পিঠটা পেছনে হেলে যাচ্ছে।
কপির পর এল মাছ। পঞ্চাশ টুকরো মাছ আর বত্রিশখানা লুচি অদৃশ্য করে দেবার পর হাচাই পালের চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। পেছন দিকে আরও হেলে পড়েছে সে। হঠাৎ দুই হাতজোড় করে সে লম্বা হয়ে পড়ল। বিড়বিড় করে বলল, আমারে ক্ষমা করেন চক্কোত্তি কত্তা, আপনের লগে পাল্লা দ্যাওন আমার কাম না। হুকুম করেন, আমি যাই। বলে দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে বাড়ি চলে গেল।
হাচাই পাল চলে গেলে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল গদু চক্কোত্তি। তারপর বিমর্ষ মুখে বলল, এই হগল মানুষ ক্যান যে আসরে আইসা বসে! খাওনটাই মাটি। বলে আবার খেতে শুরু করল।
একটা ব্যাপার লক্ষ করেছিল বিনু। গদু চক্কোত্তির কোমরের কষিটা বুকের কাছে বাঁধা। খাচ্ছিল আর খানিকটা পর পরই হ্যাঁচকা টানে সেটা নিচের দিকে নামাচ্ছিল সে।
অবাক বিস্ময়ে বিনু লরামমিরকে জিজ্ঞেস করল, ওইটুকু ওইটুকু করে কাপড়টা নামাচ্ছে কেন লালমোহনদাদু?
লারমোর হাসতে হাসতে সকৌতুকে বললেন, পেটের যেটুকু যেটুকু ফিল-আপ হচ্ছে, কাপড়টা সেইটুকু সেইটুকু নামাচ্ছে। তারপর নাইকুণ্ডল থেকে যখন এক ইঞ্চি ওই কষি নামাবে তখন খাওয়া শেষ।
নাভির তলায় কাপড় নামাতে পরিবেশনকারীদের যে কতবার ছোটাছুটি করতে হল তার আর হিসেব নেই।
খাওয়া দাওয়ার পর ব্ল্যাক থেকে একটা দোয়ানি বার করে পাখিকে আশীর্বাদ করল গদু চক্কোত্তি। তারপর হেমনাথকে বলল, অহন যাই হ্যামকত্তা।
হেমনাথ বললেন, এত রাতে কোথায় যাবে?
নবীগুঞ্জের গয়নার নাও ধরুম।
কাল সকালে গেলে হয় না?
উঁহু। কাইল সকালে উইখানে এক বাড়িতে পৈতা আছে। আইজই আমারে রওনা দিতে হইব।
তা হলে তো তোমাকে ছেড়ে দিতেই হয়।
গদু চক্কোত্তি চলে গেল। যাবার আগে বিনুর মনে বিচিত্র বিস্ময়ের রেশ রেখে গেল।
.
২.১৭
বৌভাতের দিন পাখিদের বাড়ির সবাই এসেছিল। তাদের নিয়ে এসেছিল গোপাল দাস আর ধনঞ্জয়। গোপাল দাস সেদিন কিছুতেই খায়নি। যতদিন না মেয়ের ছেলেপুলে হচ্ছে ততদিন তার শ্বশুরবাড়ির জলটুকুও ছোঁবে না।
বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষ হলে গোপাল দাসরা চলে গিয়েছিল। যাবার আগে মেয়ে-জামাইকে দ্বিরাগমনে নেমন্তন্ন করে গেছে।
পাখিরা টুনিদের বাড়ি দ্বিরাগমনে যাবে না, যাবে ভাটির দেশে গোপল দাসের বাড়ি।
গোপাল দাসদের নিয়ম অনুযায়ী বৌভাতের আড়াই দিন পর দ্বিরাগমনে যাবার কথা। যুগলদের রওনা হতে হতে পাঁচদিন কেটে গেল। এখন শুকনোর সময়। বাড়ি থেকে লারমোরের ফিটনে নদীর ঘাটে এসে কেরায়া নৌকোয় উঠল পাখিরা। তাদের বিদায় দেবার জন্য বাড়ির সবাই সঙ্গে এসেছিল।
নৌকো ছাড়ার মুখে স্নেহলতা বললেন, সাত দিনের মধ্যে ফিরে আসবি যুগল।
