বিনু বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে থাকল।
.
রাত পোহালেই বউ-ভাত।
রাজদিয়ার হেন মানুষ নেই যাকে নেমন্তন্ন করেননি হেমনাথ। যুগীপাড়া-কুমোরপাড়া-তেলিপাড়া বামুনপাড়াকায়েতপাড়া, সমস্ত জায়গায় ঘুরে ঘুরে সবাইকে বলে এসেছেন। হেমনাথ বলেছেন পুরুষদের, স্নেহলতা বলে এসেছেন মেয়েদের। হেমনাথের সঙ্গে বিনুও ঘুরে ঘুরে নেমন্তন্ন করতে গেছে।
শুধু কি রাজদিয়ার বাসিন্দাদের, এই জল-বাংলায় যত চেনাজানা মানুষ আছে সবাইকে নেমন্তন্ন করে এসেছেন হেমনাথ। বহুকাল বাড়িতে কোনও উৎসব হয় নি, যুগলের বিয়েটা উপলক্ষ করে হেমনাথ আর স্নেহলতা প্রাণভরে সাধ মিটিয়ে নিচ্ছেন।
আজ সকাল থেকেই এ বাড়িতে মেলা বসে গেছে। কেতুগঞ্জ থেকে বাড়ির মেয়েদের নিয়ে এসেছে মজিদ মিঞা। সুজনগঞ্জ থেকে এসেছে নিত্য দাস, চন্দ্র ভূঁইমালী। কমলাঘাট থেকে এসেছে রমজান সাহেব, মালখানগর থেকে বৈকুণ্ঠ কুণ্ডু। তা ছাড়া এই রাজদিয়ার লারমোর, রামকেশব, হেডমাস্টার মোতাহার সাহেব–এঁরা তো আছেনই।
সন্ধের পর ডে-লাইট আর হ্যাঁজাকের আলোয় বাড়িটা যেন দিনের মতো হয়ে উঠল। তখন থেকে দলে দলে অন্য নিমন্ত্রিতেরা আসতে লাগল।
পুবের ভিটির বড় ঘরখানা সাজিয়ে গুছিয়ে সিংহাসনের মতো কারুকাজ-করা প্রকাণ্ড একটা চেয়ারে পাখিকে বসানো হয়েছে। সারা বিকেল ধরে সুধা সুনীতি তাকে সাজিয়েছে। স্নেহলতা লোহার সিন্দুক খুলে গয়নার বাক্স বার করে দিয়েছিলেন।
পাখির পরনে লাল টুকটুকে বেনারসী। মাথায় সোনার মুকুট, কপালের কাছে গোল টিকলি, ওপর হাতে আড়াই-পেঁচি অনন্ত, নিচের দিকে গোছ গোছ চুড়ি, গলায় সীতাহার। দু’হাতে কম করে ছ’টা আংটি, কোমরে সোনার বিছে, পায়ে তোড়া।
সব মিলিয়ে পাখিকে রাজেন্দ্রাণীর মতো দেখাচ্ছিল।
পুবের ঘরেই সব চাইতে বেশি ভিড়। বিনু আর ঝিনুকও ওই ঘরেই আছে। স্নেহলতা-সুধা সুনীতি-সুরমা পাখিকে ঘিরে বসে আছেন।
একেকটা দল আসছে, পাখির হাতে উপহার তুলে দিচ্ছে। পাখির হাত ঘুরে সেগুলো যাচ্ছে সুধা সুনীতির কাছে। সুধারা সেগুলো একধারে সাজিয়ে নম্বর দিয়ে খাতায় লিখে রাখছে।
স্নেহলতা উপহারদাতাদের শুধোন, বউ কেমন দেখলে?
উত্তর আসে, সোন্দর। কিবা রং, কিবা চৌখ, কিবা হাত-পায়ের গড়ন–
আমার বাড়িতে মানাবে, কি বল?
নিয্যস–
উৎসবের ঘোর বুঝি ছোট্ট ঝিনুকের মনেও লেগেছে। ফিসফিস গলায় সে ডাকে, বিনুদাদা–
মুখ ফিরিয়ে বিনু বলে, কী?
বিয়ে করতে বেশ লাগে, না?
অন্যমনস্কের মতো বিনু জবাব দেয় হুঁ—
.
উত্তরের ঘর, দক্ষিণের ঘর, পুবের ঘর, পশ্চিমের ঘর–সব জায়গায় নিমন্ত্রিতদের জন্য আসন পড়েছে। রাত একটু বাড়লে খাবার ডাক পড়ল।
নিমন্ত্রিতরা সবে বসতে শুরু করেছে, সেই সময় গোলগাল ঘটের মতো চেহারার একটি লোক এসে উঠোনে দাঁড়াল। ফর্সা টুকটুকে রং তার। পরনে হাঁটু পর্যন্ত খাটো ধুতি আর ফতুয়া। কাঁধে পাট-করা ময়লা চাদর, খালি পা।
উঠোনে পা দিয়েই সে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল, অতিথ আইলাম হ্যামকত্তা–
হেমনাথ আর লারমোর কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। উদ্দেশ্য, নিমন্ত্রিতদের খাওয়াদাওয়া তদারক করা। তাদের পাশে বিনু। হেমনাথ প্রায় ছুটেই লোকটার কাছে চলে গেলেন। বললেন, এস এস চক্কোত্তি, তোমার কথাই আজ সকাল থেকে মনে পড়ছিল। আমার বাড়িতে একটা শুভ কাজ হচ্ছে, অথচ তোমারই পাত্তা নেই।
লোকটা এক গাল হাসল, আপনে নিশ্চিন্ত থাকেন হামকত্তা। কুনো বাড়িতে কিয়াকম্ম হইলে আমি ঠিক ট্যার পইয়া যাই। আমারে ফাঁকি দ্যাওন সহজ না।
লারমোর ওধার থেকে বলে উঠলেন, তা ঠিক। বিশ মাইল দূর থেকে তুমি লুচিভাজার গন্ধ পাও।
লোকটা হাসতেই লাগল, তা যা কইছেন লালমোহন সায়েব।
এদিকে লোকটাকে দেখে নিমন্ত্রিতদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেছে। সবাই উৎসুক, চকচকে চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলাবলি করছে, গদু চক্কোত্তি আসছে, গদু চক্কোত্তি আসছে। আইজ আসর জমব ভালা।
লোকটার নাম জানা গেল–গদু চক্কোত্তি। এমন অদ্ভুত নাম আগে আর কখনও শোনেনি বিনু। তা ছাড়া, নিমন্ত্রিতদের তালিকায় গদু চক্কোত্তি ছিল না। যাদের যাদের নেমন্তন্ন করা হয়েছে তাদের বাড়িতে হেমনাথের সঙ্গে গিয়েছিল বিনু, গদু চক্কোত্তির বাড়ি সে যায় নি।
সে যাই হোক, দেখা যাচ্ছে, সবাই গদু চক্কোত্তিকে চেনে এবং সে আসতে সকলেই ভারি খুশি।
লারমোরের পাশ থেকে বিনু হঠাৎ বলে উঠল, লোকটা কে লালমোহন দাদু?
লারমোর বললেন, গদু চক্কোত্তি—
নামটা তুমি বলবার আগেই শুনেছি। কিন্তু—
বিনুর মনের কথাটা চট করে বুঝে নিলেন লারমোর। তারপর বললেন, নাম শুনলেই চলবে না, কেমন? কোথায় থাকে, কী তার পরিচয়, এ সবও জানতে হবে, তাই না? ওর বাড়ি হচ্ছে কাজির পাগলা বলে একটা গ্রামে। এখান থেকে মাইল দশেক পুবে। আর পরিচয়? সেটা একটু পরেই টের পাবি দাদাভাই। আমি আর মুখে কতটুকু বলতে পারব।
বিনুর খুঁতখুঁতুনি তবু গেল না। সে বলল, কিন্তু—
আবার কী?
আমার যদূর মনে আছে একে নেমন্তন্ন করা হয়নি।
ওকে নেমন্তন্ন করতে হয় না।
বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে থাকল বিনু। বিনা নেমন্তন্নে কেউ এভাবে চলে আসতে পারে, তার কাছে এটা নিতান্তই অভাবনীয়।
লারমোর এবার যা বুঝিয়ে বললেন, সংক্ষেপে এইরকম। এই জল-বাংলায় যত গ্রাম-গঞ্জ আছে। সব জায়গায় গদু চক্কোত্তির অবাধ গতিবিধি। এ দেশের সবাই তাকে চেনে। বিয়ে-অন্নপ্রাশন-পৈতা–যেখানে উৎসবের ব্যাপার থাকে, খাওয়াদাওয়ার ব্যাপার থাকে, গন্ধ শুকে শুকে গদু চক্কোত্তি ঠিক হাজির হবেই। এই জলের দেশে খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে সে অশ্বমেধের ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে। ভালমন্দ খাওয়া ছাড়া তার আর কোনও কাজ নেই। তার কাছে বেঁচে থাকার একটিই মাত্র উদ্দেশ্য, তা হল খাওয়া। এক ভোজবাড়ি থেকে আরেক ভোজবাড়ি সারা জীবন এইভাবে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। গদু চক্কোত্তি। এই প্রাচুর্যের দেশে সে রবাহূত হয়ে এলেও কেউ অসন্তুষ্ট হয় না, বরং যথেষ্ট সমাদর করেই তাকে গ্রহণ করা হয়।
