খাওয়া দাওয়ার পর হেমনাথরা বাড়ি ফিরবেন, হঠাৎ বিনু বলে উঠল, আমি যাব না।
অবনীমোহন বললেন, যাবি না তো থাকবি কোথায়?
যুগল বোধ হয় তাকে তাকে ছিল। বাসর ঘর থেকে চট করে বেরিয়ে এসে বলল, আমার কাছে থাকব। কাইল আমি লইয়া যামু–
অবনীমোহন আপত্তি করতে যাচ্ছিলেন। যুগলের মুখচোখ দেখে হেমনাথের মায়া হয়ে থাকবে। তিনি বললেন, আচ্ছা থাক, একটা দিন আমোদ-আহ্লাদ করুক। বলে যুগলের দিকে ফিরে একটু ঠাট্টাও করলেন, তুই আবার অপ্সরীদের মধ্যে গিয়ে মুণ্ডু ঘুরিয়ে বসে থাকিস না, আমার দাদাভাইটাকে একটু দেখিস।
.
রাত্রিবেলা বাসর ঘরে মজা বেশ ভালই জমল। দু’টি যুবতী মেয়ে সরু চিকন গলায় গাইল :
এক দিন শ্যাম নীল জলে,
রাধা বদন হেরব বলে
ধীরে ধীরে চলে শ্যাম রায়।
গিয়ে যুমনার কদম্বমূলে,
দাঁড়াইল কুতূহলে
কুটিলা তাই দেখিবারে পায়।
কুটিলা কয় শোন লো বউ
জল আনিতে যাইস না লো কেউ
ব্রজের যত আছে ব্রজাঙ্গনা।
কাল কুন্তীর এল যমুনাতে,
দেখে এলাম স্বচক্ষেতে
তাই তো তোদের যেতে করি মানা।
একটা মাজা-ভাঙা সধবা বুড়ি, সম্পর্কে যুগলের দিদিশাশুড়ি, পাকা চুলে তার সিঁদুর, কপালে সিঁদুর, কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে রগড় করে করে নাচতে লাগল। ঘরভর্তি যত যুবতী, যত কিশোরী, যত প্রৌঢ়া হেসে একেবারে কুটিপাটি। এ ওর গায়ে ঢলে পড়তে পড়তে বলতে লাগল, ঠাউরমা য্যান কী! একখান সং–
নাচগানের পর হঠাৎ ঘরভর্তি মেয়ের দল যুগলকে ছেড়ে বিনুকে নিয়ে পড়ল। একটি রঙ্গিণী স্বভাবের যুবতী চোখে চোখ রেখে বলল, অ বাবুগো পোলা, আপনের বিয়া হইচে?
চোখ নামিয়ে বিনু আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল। গালে একটা করে হাত রেখে অন্য মেয়ের দল কলকল করে উঠল, আ লো, মা লো মা, অহন তরি বিয়াই করেন নাই! তয় করছেন কী?
বিনু চুপ। তার মুখ লাল হয়ে উঠতে লাগল।
সেই যুবতীটি আবার বলল, বিয়া তো করেন নাই, এই দিকে জামাইর লগে বাসরে আইসা ঢুকছেন। বাসরের রীত কানুন জানেন?
এবারও মাথা নেড়ে বিনু বুঝিয়ে দিল, জানে না।
যুবতী বলল, দুইখান ধান্দা (ধাঁধা) জিগাই, জবাব দ্যান—
এতক্ষণে বিনুর গলায় স্বর ফুটল, আমি ধাঁধা-টাদা জানি না। বলতে পারব না।
না কইলে হইব না। আইচ্ছা শোনেন:
রক্তে ডুবু ডুবু, কাজলের ফোঁটা
এক কথায় যে কইতে পারে
হ্যায় মজুমদারের ব্যাটা।
এইবার ক’ন বস্তুখান কী?
বিনু অনেকক্ষণ ভাবল। কিন্তু হাজার ভেবেও কিছুই বার করতে পারল না। বলল, জানি না। যুবতী বলল, আইচ্ছা আরেকখান জিগাই
ওপার থনে আইল টিয়া
সোনার টুপর মাথায় দিয়া
যদি টিয়ায় মন করে
মাঠের মাটি চুর করে।
বিনু এবারও পারল না।
হঠাৎ ভিড়ের ভেতর থেকে এক থুথুরে বুড়ি উঠে এসে বিনুর চিবুক ধরে নাড়তে নাড়তে বলল, একখান ধান্দারও জবাব দিতে পারলা না। তোমার শাস্তি হইব গোরাচান।
অন্য মেয়েরা চেঁচামেচি জুড়ে দিল, কী শাস্তি, কী শাস্তি?
বুড়ি বলল, আমারে বিয়া করতে হইব।
সঙ্গে সঙ্গে ঘরময় হাসির রোল উঠল। আর বিনুর চোখ-মুখ-নাক-কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল।
হাসি টাসি থামলে মেয়েরা আবার যুগল এবং পাখিকে নিয়ে মাতল। গোপাল দাসের বউ অর্থাৎ যুগলের শাশুড়িকে তারা ঠেলতে ঠেলতে বাসর ঘরের বাইরে বার করে দিল, তুমি হাউড়ি মানুষ, তুমি এইখানে ক্যান? আমরা জামাই লইয়া কত কী করুম অহন, কত নীলাখেলা! যাও, যাও–
গোপাল দাসের বউ হাসতে হাসতে চলে গেল, যা ইচ্ছা তরা কর–
করুমই তো।
মেয়েরা এবার পাখিকে জোর করে যুগলের কোলে বসিয়ে সমস্বরে গান ধরে:
শ্যামের কোলে রাইকিশোরী
এ রূপ দেখে মরি মরি—
রাতের সঙ্গে সঙ্গে রঙ্গিণীদের মাতামাতি, কৌতুক এবং হাসিও পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল।
পরের দিন বাসি বিয়ে হল, আংটি খেলা হল, কাদা খেলা হল। কাদায় কাদায় যুগল আর পাখিকে, এমনকি বিনুকেও ভূত বানিয়ে ছাড়ল মেয়েরা।
বিকেলবেলা বাড়ির সবাইকে কাঁদিয়ে যুগলের সঙ্গে পাখি শ্বশুরবাড়ি রওনা হল।
২.১৬-২০ কাল হেমনাথ বলে গিয়েছিলেন
২.১৬
কাল হেমনাথ বলে গিয়েছিলেন, বেলা থাকতে থাকতে যেন যুগলরা বাড়ি চলে যায়। কিন্তু পৌঁছতে পৌঁছতে রাত হয়ে গেল।
শাঁখ বাজিয়ে, উলু দিয়ে বর কনেকে ঘরে নিয়ে তুললেন স্নেহলতা। সেই ঘরখানায়, যেটা যুগলের জন্য নতুন ভোলা হয়েছিল।
ঘরের ভেতর ঢুকে বিনু অবাক হয়ে গেল। কাল বিকেল থেকে আজকের রাত, একটা দিনের কিছু বেশি সময় সে বাড়িতে ছিল না। এর ভেতর যুগলের ঘরখানা কি চমৎকার করেই না সাজিয়ে দিয়েছেন স্নেহলতা!
আজ কালরাত্রি। জামাই-মেয়ে এক ঘরে রাত কাটাবে না। বরণ টরণ এবং অন্য সব রীতি পালনের পর পাখিকে নিয়ে ভেতর-বাড়িতে চলে গেলেন স্নেহলতা। রাত্তিরটা সেখানেই কাটাবে পাখি, আর যুগল একা এ ঘরে থাকবে।
আত্মীয় কুটুম্ব, নাইওরি-ঝিওরি, সবাই নতুন বউর সঙ্গে ভেতর-বাড়ি চলে গেছে। নতুন ঘরে এখন শুধু যুগল আর বিনু।
যুগল ডাকল, ছুটোবাবু–
কী?
ঠাউরমা’র বিচারটা দেখলেন?
কিসের বিচার?
আপনেই ক’ন, বিয়ার পর বউ বিহনে রাইত কাটান যায়?
বিনু ফস করে বলে ফেলল, একটা তো মোটে রাত। কাল থেকেই তো।
ক্ষোভ এবং অভিমানের গলায় যুগল বলল, একটা রাইতও অহন একা একা ভালা লাগে না। একা না বোকা। আপনে অবিয়াত পোলা, আপনে এইর মম্ম বুঝবেন না।
