পাখি তবু অবনতমুখী।
টুনি এবার ঠোঁটে ঠোঁট টিপে চোখ পাকিয়ে বলল, ও মাইয়া, অহন তোমার এত শরম! ধরুম একবার কিষ্ণবুলি (কৃষ্ণবুলি), ধরুম? ধরি? ভাদাই আশ্বিন মাসে আমার খালাসের সময় যহন এইখানে আছিলি তহন রোজ আইত যুগলা। তহন কী করতি দুই জনে? কই সভার মইদ্যে হেই। কথাখান কই–
টুনির কথা শেষ হবার আগেই টুক করে একবার যুগলের চোখের দিকে তাকিয়ে মুখ নামাল পাখি।
বিয়ের পর বর কনেকে নিয়ে যাওয়া হল বাসর ঘরে। সেখানে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বেলে এক গলা ঘোমটার তলা থেকে প্রথমে পাখির মা মেয়ে-জামাইর মুখ দেখল। মুখটুখ দেখা হলে বরণকুলো। ঠেকিয়ে ধানদূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করল। পাখির মায়ের পর একে একে অন্য এয়োরাও বরকনেকে আশীর্বাদ করল।
তারপর শুরু হল চালখেলা। পেতলের সরাভর্তি চাল এনে এয়োরা পাখিকে বলল, ছড়াইয়া দে–
পাখি প্রথমটা কিছুতেই ছড়াবে না। অনেক পীড়াপীড়ির পর সরা থেকে চালগুলো ঢেলে অল্প একটু ছড়িয়ে দিল।
এয়োদের ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল, ও মা, বিয়া হইতে না-হইতেই সোয়ামীর উপুর অ্যাত টান! ভালা কইরা আউলাইয়া (ছড়িয়ে) দে–বলে নিজেই পাখির একখানা হাত ধরে চালগুলো যতদূর পারল ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিল। পরে যুগলকে বলল, এইবার চাউলগুলা গুছাইয়া একখানে কর।
বাধ্য ছেলের মতো চালগুলো এক জায়গায় জড়ো করে যুগল। আবার সেগুলো ছড়িয়ে দিল পাখি, আবার এক জায়গায় করল যুগল। এইভাবে বারকয়েক খেলা চলল।
কৌতুকমুখী এয়ার দল বলল, মনে রাইখো জামাই, আমাগো মাইয়া এই রকম আউল ঝাউল করব আর তুমি মানাইয়া গুছাইয়া নিবা। বুঝলা?
উত্তর না দিয়ে যুগল হাসল।
চালখেলার পর জলখেলা।
মস্ত একখানা পাথরের থালা জলে ভর্তি করে আনা হল। একজন এয়ো আঙুল দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে জল ঘোরাতে লাগল। জল যখন ঘূর্ণির মতো ঘুরছে সেই সময় বর আর কনের টোপর থেকে দু’টো শোলার টুকরো ছিঁড়ে তাতে ফেলে দেওয়া হল। কখনও দেখা গেল পাখির শোলাটা আগে যাচ্ছে, যুগলেরটা তার পিছু নিয়েছে। অমনি এয়োদের মধ্যে সাড়া পড়ে যাচ্ছে।
জামাই আমাগো বউ-অন্ত পরান। দ্যাখ ক্যামন মাইয়ার পিছন পিছন লৌড়াইতে আছে। মাইয়া আমাগো সুখে থাকব।
আবার যখন ঘূর্ণিতে পড়ে যুগলের শোলাটা আগে আগে যায়, পাখিরটা তাকে অনুসরণ করে তখন এয়োরা বলাবালি কের, দেখিস, মাইয়া জামাই ছাড়া আর কিছু চিনব না। জামাইর পিছে ঘুরতে ঘুরতে পিঙ্খীমির হগল ভুলব।
একজন বর্ষীয়সী ওধার থেকে বলে ওঠে, ভুলুক, তভু সুখে থাউক অরা।
ঘুরতে ঘুরতে ঘূর্ণির ভেতর শোলার টুকরো দুটো যখন এক হয়ে যায় তখন খেলা শেষ।
চালখেলার মতো বারকয়েক জলখেলাও চলল।
বিনুরা বাসরে চলে এসেছিল। নানা খেলার ফাঁকে হঠাৎ তাকে দেখতে পেল যুগল। বলল, ছুটোবাবু কতক্ষণ?
বিনু বলল অনেকক্ষণ এসেছি।
খাওন দাওন হইছে?
না।
একটু ভেবে যুগল এবার বলল, একখান কথা রাখবেন ছুটোবাবু?
কী? বিনু জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
আইজের রাইতখান এইখানে থাইকা যান। কাইল বিকালে আমার লগে বাড়ি যাইয়েন।
এখানে থেকে কী হবে?
বাসর ঘরে কুনোদিন রাইত কাটাইছেন?
না।
তয় তো আপনেরে আটকাইতেই হইব। বলতে বলতে মুখটা বিনুর কানের কাছে আরও ঘন করে আনল যুগল। গলার স্বর অতলে নামাল, বাসর ঘরে জবর মজা ছুটোবাবু, জবর মজা। দেইখেন রসের মেলা বইব।
বিনু উত্তর দিল না।
একটু ভেবে যুগল আবার বলল, আমার লাখান আপনেরেও একদিন বাসর ঘরে যাইতে হইব। হগল দেইখা-শুইনা-বুইঝা লন। পরে কামে দিব।
কিন্তু–
আবার কী হইল?
দাদু আর বাবা কি আমাকে থাকতে দেবে?
কইয়া দ্যাখেন না একবার। আপনে থাকলে আমার বড় ভালা লাগব।
আচ্ছা বলব।
একসময় খাবার ডাক পড়ল।
উত্তরের ভিটির প্রকাণ্ড ঘরখানায় বরযাত্রীদের আসন পড়েছে। বিনুরা গিয়ে সারি সারি বসে পড়ল।
গোপাল দাস মেয়ের জন্য আট কুড়ি টাকা পণ যেমন নিয়েছে, খরচও করেছে তেমনি দু’হাতে। খাওয়ার ব্যবস্থা প্রায় রাজসিক।
এই জলবাংলায় লুচি-টুচির তেমন চল নেই। ভাতের রেওয়াজ। কলার পাতায় জুই ফুলের মতো ধবধবে পানকাইজ চালের গরম ভাত, এখনও ধোঁয়া উড়ছে। সর-বাটা গাওয়া ঘি, আলু ভাজা, বেগুন ভাজা, কপির বড়া, মুগের ডাল, রুই-চিতল-ইলিশ-ঢাইন-চার রকমের মাছ, চাটনি, পায়েস এবং রসগোল্লা।
যতক্ষণ খাওয়া চলল, এক ধারে গলবস্ত্র হয়ে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকল গোপাল দাস। আর ধানঞ্জয় হাঁক ডাক করে পরিবেশন করাতে লাগল। এই পাতে চিতল মাছের কোল দাও, উই পাতে মিষ্টান্ন দাও, হেই পাতে রসগুল্লা দাও–
খেতে খেতে হেমনাথ বললেন, খুব খাইয়েছ গোপাল–
ঘাড়খানা একধারে হেলিয়ে বিনীত সুরে গোপল দাস বলল, খুব খাওয়ামু, আমার সাইদ্য কী?
না না, চমৎকার আয়োজন হয়েছে।
আপনেগো লাখান মানুষ আমার বাড়ির কিয়া কম্মে পাত পাতছেন, এইতেই ভাগ্যি। কী আনন্দ যে পাইছি হ্যামকত্তা, মুখে কইয়া বুঝাইতে পারুম না। দিন যদিন ত্যামন থাকত, পরান ভইরা খাওয়াইতাম–
খাওয়াবার কথায় দেশ কালের কথা এসে পড়ল। কী দিন ছিল আর কী দিন এল! এখন জিনিসপত্র আক্রা, হাত ছোঁয়ানো যায় না, এমন আগুন দর। আগের দিন থাকলে গোপাল দাস তিন দিন আগে বরযাত্রীদের নিয়ে আসত, খাওয়ানো কাকে বলে দেখিয়ে দিত, সবই অদৃষ্ট, ইত্যাদি ইত্যাদি।
বরযাত্রীদের ভেতর থেকে একজন বর্ষীয়ান লোক জানাল, আগেকার দিনে বরযাত্রীদের বিয়ের চার পাঁচ দিন আগে মেয়ের বাড়ি যাবার রেওয়াজ ছিল। বরিশাল-খরিদপুর কুমিল্লা, এই জলের দেশের নানা জায়গায় সে এভাবে নেমন্তন্ন খেয়ে বেড়িয়েছে। তা সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও না।
