গোপাল দাসরা হাতজোড় করে বলল, আসেন আসেন উত্তরের ঘরের ঢালা ফরাসে বিনুদের নিয়ে এল তারা।
যুগলকে মাঝখানে বসিয়ে হেমনাথরা চারধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরাম করে বসলেন।
তৎক্ষণাৎ সিগারেট এল, পান-তামাক এল।
হেমনাথের কোনও নেশা নেই। অন্য বরযাত্রী যারা এসেছে সবাই তাকে মানে, শ্রদ্ধা করে। তার সামনে বসে সিগারেট বা তামাক খাওয়ার কথা ভাবাই যায় না। নেশার সরঞ্জামগুলি বৃথাই ফরাসের ওপর পড়ে রইল।
যুগলের গা ঘেঁষে বসেছিল বিনু। তার কানের কাছে মুখ এনে চাপা নিচু গলায় যুগল ফিসফিস করল, বড়কত্তায় না থাকলে একখানা সিগ্রেট খাইতাম। কতক্ষণ বিড়ি বুড়ি খাই না, গলা খুচুর খুচুর করতে আছে।
বিনু বলল, আড়ালে গিয়ে খেয়ে এস না—
যুগল বলল, কী যে কন ছুটোবাবু—
বিনু অবাক, কী বলেছি!
আমি না এই বাড়ির জামাই হমু? আমার নি সক্রেট লইয়া আবডালে গিয়া খাওন মানায়। আমার এট্টা সোম্মান নাই?
আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল বিনু। এ দিকটা সে ভেবে দেখেনি। বলল, তাই তো।
ওদিকে ঝাঁক ঝাঁক উলুধ্বনি আর আর ঢাকের আওয়াজ চলছেই। ঢাকীগুলো উঠোনময় নেচেকুঁদে লাফিয়ে বিপুল উৎসাহে বাজিয়ে যাচ্ছে।
কানে হাত চাপা দিয়ে হাসতে হাসতে হেমনাথ বললেন, হয়েছে হয়েছে। এবার ওদের একটু থামতে বল। কান ঝালাপালা হয়ে গেল।
শশব্যস্ত হয়ে গোপাল দাস ঢাকীদের বলল, হ্যামকত্তায় কইছে, বাদ্যি থামা ব্যাটারা, বাদ্যি থামা। কানের পোক (পোকা) না বাইর করলে আর হয় না!
তক্ষুনি বাজনা থামল।
এধারে আরও একটা ব্যাপার ঘটেছে। বরযাত্রীদের দলে সুধা সুনীতিকে দেখে বিয়ে বাড়িতে খুবই চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সাড়া পড়ে গেছে চারদিকে।
এদেশে বরযাত্রী হিসেবে মেয়েদের যাওয়ার রেওয়াজ নেই বললেই হয়। ফলে রীতিমতো ভিড় উত্তরের ঘরের দাওয়ার সামনে অনড় হয়ে আছে। দূর থেকে নানা বয়সের বউরা লম্বা লম্বা ঘোমটা অল্প একটু তুলে চকিতে সুধা সুনীতিকে দেখে নিচ্ছে এবং একজন আরেকজনকে ঠেলা দিয়ে চাপা গলায় ফিসফিস করছে, আউ আউ, মাইয়ামাইষে নি বরযাত্তর আসে!
আরেকজন বলল, আসে, আসে—
কই, আমরা তো যাই না।
মুখ বাঁকিয়ে দ্বিতীয় জন বলল, কিসের লগে কিসের তুলুনা! চান্দের লগে প্যান্দের। আমরা হইলাম বগার ঘরের বগী, বেঙ্গার ঘরের বেঙ্গী। আর উনারা বাবুগো ঘরের মাইয়া।
হে কথাখান ঠিকই।
শুদা (শুধু কি বাবুগো মাইয়া, কইলকাত্তার মাইয়া। তেনাগো চালই ভিন্ন।
ঠিকই।
কইলকাতার মাইয়ারা ক্যামন ধলা, ফকফইকা—
মেমসাহেবগো লাখান—
মেমসাহেব বাপের জম্মে দেখছস?
দেখি নাই, তাগো পরস্তাব তো শুনছি–
এই সময় গোপাল দাস, ধনঞ্জয় এবং কর্তাস্থানীয় জনকয়েক এসে বরযাত্রীদের কাছে জোড়হাত করে দাঁড়াল। বিশেষ করে হেমনাথের উদ্দেশে বলল, এইবার হুকুম করেন হ্যামকত্তা, বিয়ার যোগাড় হইয়া গ্যাছে। জামাই লইয়া যাই-
হেমনাথ বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।
যুগলকে নিয়ে গোপাল দাসরা ভেতর-বাড়ির দিকে চলল। বিনুরাও তাদের পেছন পেছন গেল।
আলপনা এঁকে এঁকে ভেতর-বাড়ির উঠোনটাকে চমৎকার সাজানো হয়েছে। মাঝখানে চিত্রকরা বড় বড় দু’টো পিঁড়ে, সে দু’টো বর-কনের আসন। এ ছাড়া আছে দু’পক্ষের পুরুত, কন্যাকা, বরকর্তা এবং যে সম্প্রদান করবে তাদের সবার জন্য আসন।
যুগলকে নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে শাঁখ বেজে উঠল, ঝক ঝক উলুধ্বনি শুরু হয়ে গেল। হেমনাথরা যাতে বসে বিয়ে দেখতে পারেন সেজন্য ক’খানা জলচৌকিও এসে গেল।
ঢাকীগুলো পুবের ঘরের দাওয়ায় বসে জিরোচ্ছিল। কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, ব্যাটারা কি ঘুমাইয়া পড়লি নিকি? বাজা-বাজা–
বলার শুধু অপেক্ষা। ঢাকীরা সঙ্গে সঙ্গে উঠোনে নেমে পড়ল। শাঁখ উলু এবং ঢাক, তিনে মিলে মুহূর্তে মাঘ মাসের রাত্তির সরগরম হয়ে উঠল।
এদিকে যুগল যে জামা কাপড় পরে এসেছিল সেগুলো বদলে মেয়ের বাড়ির নতুন পোশাক পরে নিল। তারপরেই ওদিকের কোনও একটা ঘর থেকে হাত ধরে মেয়েরা পাখিকে নিয়ে এল।
পাখিকে এর আগে মোটে একবারই দেখেছে বিনু, সেই আশ্বিন মাসে। স্বপ্নলোকের জলপরীর মতো সাঁতার কেটে কেটে যুগলের নৌকোয় এসেছিল সে।
আর আজ?
আজ চেনাই যাচ্ছে না পাখিকে। পরনে তার রাঙা পাটের শাড়ি আর লাল জামা, হাতে গোছা গোছা চুড়ি, গলায় মুড়কি হার, কানে ঝুমকো, আঙুলে চৌকো আংটি, নাকের পাটায় আগুনের ফুলকির মতো নাকছাবি। লজ্জায় মুখ তুলতে পারছে না পাখি। নতমুখিনী মেয়েটা যেন মর্তভূমির কেউ নয়, স্বর্গলোকের অপ্সরী।
ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে পলকহীন তাকিয়ে থাকল বিনু।
ঘন ঘন উলুধ্বনি, পুরুতের মন্ত্রপাঠ এবং শাঁখের আওয়াজের মধ্যে পাখিযুগলের মালাবদল হয়ে গেল। তারপর শুভদৃষ্টি। দুজনের মাথার উপর পাতলা একটা চাদরের ঘেরাটোপ দিয়ে কে যেন বলল, তাকা যুগইলা, নয়ন মেইলা পরাণেশ্বরীরে দ্যাখ–
যুগল বড় বড় ড্যাবডেবে চোখ মেলে তাকাল, কিন্তু পাখি আর মুখ তোলে না।
সবাই কত সাধ্যসাধনা করল কিন্তু পাখির চোখের পাতা যেন সীসের পাতের মতো ভারী হয়ে গেছে। কিছুতেই তা মেলতে পারছে না মেয়েটা।
কেউ যখন পারল না তখন টুনিকে এগিয়ে আসতে হল। যুগলের পিসতুতো বোন টুনি। টুনিকেও আজ চেনা যাচ্ছে না। আশ্বিন মাসে তার গা থেকে খই উড়তে দেখেছিল বিনু। লাউয়ের মতো লম্বা স্তন ধরে কোলের বাচ্চাগুলোকে ঝুলতে দেখেছিল। আজ সে লাল-পাড় নতুন শাড়ি পরেছে, নীল জামা পরেছে, গয়নাগাটি পরেছে, এমনকি পাতা কেটে পরিপাটি একখানি খোঁপাও বেঁধেছে। গোসাপের মতো খসখসে কর্কশ চামড়া আজ মসৃণ, তেলতেলে। কপালে নতুন পয়সার মতো মস্ত সিঁদুর টিপ, সিঁথিতে চওড়া করে সিঁদুরের টান। সম্পর্কে টুনি হল পাখির ননাস। (স্বামীর বড় বোনকে বলে ননাস)। সে বলল, আ লো, ছেমরি তো গেলি! মুখ তোল মাইয়া–
