.
২.১৫
যুগলের বিয়ে নিয়ে বিরাট কাণ্ড করে বসলেন হেমনাথ। রাজদিয়ার হেন বাড়ি নেই, হেন মানুষ নেই, যাদের নেমতন্ন করা হল না। দেখেশুনে কে বলবে, যুগল হেমনাথদের বাড়ির কামলা।
কেউ কেউ বলল, কামলার বিয়ায় অত ঘটা ক্যান?
হেমনাথ বললেন, যুগলকে তো আমি কামলা ভাবি নি, ও আমার বাড়ির ছেলে। তা ছাড়া, আমাদের বাড়িতে বহুকাল শুভ কাজ হয় না। বিয়েটা উপলক্ষ করে ঘটা না হয় করলামই।
বিয়ের আগের দিন থেকেই নিমন্ত্রিতদের আনাগোনা শুরু হল। বরণকুলো সাজিয়ে জনা কুড়ি এয়ো জুটিয়ে অধিবাসের গান শুরু করে দিলেন স্নেহলতা :
আইজ রামের অধিবাস কাইল রামের
বিয়া গো কমলা,
আমরা জল ভরিতে যাই,
সই আমরা জলে যাই।
তোমার রামের অধিবাসের
রানী সময় গেল।
গা তোল কৌশল্যা রানী
নিশি পরভাত হইল।
তোমরা সখি আন গো হলুদ, আন গো
হলুদ সকলে।
আমার রামেরে সিনান করাও
অতি সকালে।
একটু থেমে আবার শুরু হয়?
বরণকুলা আনো সখি, বরণকুলা আনো
আমরা শ্যামের ঘাটে যাই।
আমরা জল সইতে যাই।
ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালাও সখি,
ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালাও।
ধান দিয়া, দূর্বা দিয়া, রামের ওই
বরণডালা সাজাও।
আমরা জল সইতে যাই।
আমরা ফুল তুলতে যাই।
এয়োদের মধ্যে যারা স্নেহলতার সমবয়সিনী তারা বলে, পরের পুতের লেইগা এই! নিজে তো বিয়াইলেন না দিদি, বিয়াইলে না জানি কী করতেন!
স্নেহলতার ছেলেমেয়ে নেই। নিমেষে তার মুখে বিষাদের ছায়া পড়ে। পরক্ষণেই স্নিগ্ধ হাসিতে ঝলমলিয়ে ওঠেন, না বিয়োলে বুঝি ছেলে হয় না? রাজদিয়া জুড়ে এত ছেলেমেয়ে তবে কার?
হেয়া ঠিক, হেয়া ঠিক—
.
পরের দিন বিকেলবেলা বরযাত্রী আর বরকে নিয়ে রওনা হলেন হেমনাথ। বরযাত্রীদের ভেতর সুধা সুনীতি, বিনু ঝিনুকও রয়েছে।
বিয়ে উপলক্ষে যুগলের বাপ-মা-বোন এসেছে তাদের বাড়ি থেকে। বাপ ভাইরা বরযাত্রীদের সঙ্গে ধনঞ্জয়ের বাড়ি চলেছে। মা আর বোন থেকে গেছে হেমনাথের বাড়ি।
বর্ষাকাল হলে ডুবন্ত মাঠের ওপর দিয়ে নৌকোয় যাওয়া যেত। কিন্তু এই শীতে জল সরে গিয়ে ডাঙা জেগেছে, ডাঙার ওপর দিয়ে তো নৌকো চলে না, তাই হেঁটেই চলেছেন হেমনাথরা।
রাজদিয়া থেকে ধনঞ্জয়ের বাড়ি মাইল দুয়েকের রাস্তা। কোনাকুনি মাঠ পাড়ি দিলে কতক্ষণ আর লাগবে!
যেতে যেতে কৃষাণ গ্রাম চোখে পড়ে। কৌতূহলী কেউ কেউ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে শুধোয়, কিয়ের মিছিল?
বরযাত্রীদের ভেতর থেকে কে যেন উত্তর দেয়, বিয়ার—
কার বিয়া?
হ্যামকত্তার বাড়ির যুগইলার।
আমরা যামু?
আসো।
নানা গ্রাম থেকে দু’জন চারজন করে জুটে বিরাট এক জনতা তৈরি হল। তারা বরযাত্রীদের পিছু পিছু চলতে লাগল।
সন্ধের কিছু পরে বিনুরা ধনঞ্জয়ের বাড়ি পৌঁছে গেল।
.
এ বাড়ি বিনুর অচেনা নয়। আশ্বিন মাসে সুজনগঞ্জের হাটে যাবার পথে যুগলের সঙ্গে এখানে এসেছিল সে।
তখন চারদিকে জল থইথই করছে। আশ্বিনের মাঠঘাট, ধানের খেত, শাপলাবন, মুত্রাবন–সব কিছু ভেসে গিয়ে একখানা সমুদ্র হয়ে গিয়েছিল যেন। ধনঞ্জয়ের বাড়িটা তার ওপর দ্বীপের মতো মাথা তুলে ছিল।
এত জল যে ঘরর উঠোন পর্যন্ত চলে এসেছিল। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাবার জন্য উঠোনের ওপর দিয়ে সাঁকো দেখেছে বিনু। তার ওপর বসে ধনঞ্জয়ের কালো কালো আধ-ন্যাংটো ছেলেদের ভাতের টোপ দিয়ে পুঁটি এবং বাঁশপাতা মাছ ধরতে দেখেছে।
এখন, এই মাঘের শেষে জল নেই কিন্তু উঠোনের সাঁকোগুলো আছে। সারা বছরই বোধ হয় ওগুলো থাকে। থাকবারই কথা। এদেশে শুকনোর মাস আর ক’টা? পৌষ মাঘ থেকে বৈশাখ পর্যন্ত। জষ্ঠির মাঝামাঝি মাঠঘাট ভাসিয়ে নতুন বর্ষার জল এসে পড়ে। তারপর থেকে অঘ্রাণ পর্যন্ত চারদিকে শুধু জল আর জল–অথৈ, অপার জলরাশি। কাজেই সাঁকো তুলে ফেলে কী লাভ? ক’মাস পরেই তো আবার বসাতে হবে। ধনঞ্জয় অতখানি পরিশ্রম করতে বুঝি রাজি নয়।
আজ বাড়িটার চেহারাই গেছে বদলে। হাজার হোক বিয়ে বাড়ি। বউ-ঝি, আত্মীয়-কুটুম, নাইওরি ঝিওরিতে বোঝাই।
উঠোনের চার কোণে চারটে এবং মাঝখানে একটা, মোট পাঁচটা হ্যাঁজাক জ্বলছে। উত্তরের ঘরের ঢালা বারান্দায় ধবধবে ফরাস পাতা। মনে হল, ওটাই বর এবং বরযাত্রীদের বসবার জায়গা।
বিনুরা পৌঁছুবার সঙ্গে সঙ্গে সাড়া পড়ে গেল।
আসছে রে, আসছে। বরযাত্তররা আইসা পড়ছে।
বইতে দে, বইতে দে–
সিগ্রেট কই, পান তামুক বাইর কর—
হঠাৎ কে চেঁচিয়ে উঠল, বর আসছে, জোকার (উলু) দে ছেমরিরা—
তক্ষুনি ভেতর বাড়ি থেকে ঝক ঝক উলর সুমিষ্ট গ্যাল চিকন শব্দ ভেসে আসতে লাগল। আরেকজন কে যেন ব্যস্তভাবে বলল, ঢাকীগুলা গ্যাল কই? বাদ্যি বাজা–
বলার শুধু অপেক্ষা। তারপরেই পাঁচ ছ’টা ঢাকী উঠোনে লাফ দিয়ে পড়ল। জল-বাংলার এই সুদূর গ্রামের ভেতর ইংরেজি-বাজনা কোথায় পাওয়া যাবে? তাই হয়তো ঢাকীদের ডাকা হয়েছে।
নিমেষে ঢাকের শব্দে বিয়েবাড়ি সরগরম হয়ে উঠল, এবং বিনুদের কানে তালা লেগে যেতে লাগল।
এরই ভেতর গোপাল দাস, ধনঞ্জয় এবং ক’টি বৃদ্ধ এগিয়ে এল।
গোপাল দাস আর ধনঞ্জয়কে আজ চেনাই যাচ্ছে না। মুখ পরিষ্কার করে কামানো। দু’জনেই মাথায় প্রচুর তেল ঢেলেছে, ফলে চুলগুলো চপচপে। জুলপি ঘাড় এবং কপাল বেয়ে সেই তেল গড়িয়ে আসছে। পরনে ক্ষারে-কাঁচা ধুতি আর হাফ শাট, তার ওপর শস্তা পশমি চাদর। কন্যাপক্ষের কর্তা ওরাই, সাজগোজের একটু বাহার তো থাকবেই।
