আগের দিনই দু’জন পুরুত এবং দু’জন ঢাকীকে খবর দিয়ে রাখা হয়েছিল। সংক্রান্তির দিন সকালবেলা তারা এসে হাজির।
বাস্তুপুজোর প্রথাটি বেশ। প্রথম পুজোটি হয় বাড়ির মধ্যেই। পুরুত ঠাকুর চরু বেঁধে বাস্তুদেবকে উৎসর্গ করে। তারপর যেখানে যেখানে জমিজমা আছে, সব জায়গায় ঘুরে ঘুরে পুজো হয়।
এবার দুই পুরুত, দুই ঢাকী এসেছে। কেননা, হেমনাথ আর অবনীমোহনের আলাদা আলাদা পুজো হবে।
বাড়ির পুজো সেরে দুই পুরুত দু’দিকে বেরিয়ে পড়ল। বাড়ির মানুষরা দু’ভাগ হয়ে দুই পুরুতের পিছু পিছু চলল। আর দুই ঢাকী বাজাতে বাজাতে আগে আগে চলেছে।
শুধু বিনুদেরই না, এখানে ঘরে ঘরে বাস্তুপুজো। চারদিকের মাঠ জুড়ে কত ঢাক বাজছে, কত পুরুতের মন্ত্রোচ্চারণ যে শোনা যাচ্ছে! একদল আধ-ন্যাংটো কালো কালো ছেলেমেয়ের দল একটু প্রসাদের আশায় এ খেত থেকে ও খেতে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে।
ঢাকের বাজনা শুনতে শুনতে, বাতাসে চরুর মধুর সুঘ্রাণ নিতে নিতে এবং জমিতে জমিতে ঘুরে পুজো দেখতে দেখতে পৌষের বেলা হেলে গেল। সারাদিনের ক্লান্তি গায়ে মেখে বিনুরা যখন বাড়ি ফিরল, শীতের সন্ধে নেমে গেছে।
.
মাঘ মাসের প্রথম দিকেই সব ধান ডোলে তুলে খড় দিয়ে সারি সারি পালা সাজিয়ে চরের মুসলমান কৃষ্ণাণরা চলে গেল।
তারপর একটানা অলস, মন্থর দিনযাপন। যুগল করিমকে এখন আর মাঠে যেতে হয় না। হেমনাথের অবশ্য কাজের শেষ নেই। বাড়ির কাজ তার যত, তার হাজার গুণ বাইরের কাজ। ইদানীং স্কুলবাড়ির জন্য গঞ্জে গঞ্জে ঘুরে টাকা তুলে বেড়াচ্ছেন। নাওয়াখাওয়ার ফুরসতটুকু পর্যন্ত তার নেই।
নতুন ধান উঠবার পর এ বাড়িতে পিঠে পায়েস বানাবার ধুম পড়ে গেছে। চালও অঢেল, দুধেরও অভাব নেই। কাজেই পিঠেটিঠে না বানিয়ে কি থাকতে পারেন স্নেহলতা?
পিঠেও কি এক আধ রকমের? ভাপা পিঠে, পাটি সাপটা, চিতই, রাঙা আলুর পুলি, সিদ্ধ পুলি, দুধ পুলি, মুগ পুলি, ভাজা পুলি–রকমের আর লেখাজোখা নেই। তা ছাড়া পায়েস আছে, চসি আছে।
নতুন ধান উঠবার পর আরেকটা পরিবর্তন ঘটেছে। আগে আগে সকালবেলা চিড়ে-মুড়ি-ক্ষীর দুধ খেতে দিতেন স্নেহলতা। আজকাল ভোর ভোর উঠেই মাটির হাঁড়িতে ফেনাভাত বসিয়ে দেন। চিড়ে মুড়ির বদলে নতুন চালের সুঘ্রাণময় ফেনাভাত, সর-বাটা ঘি আর আলুভাতে বা কাঁঠাল বিচি সিদ্ধ দিয়ে খেতে কী ভাল যে লাগে!
এরই মধ্যে এক রবিবার, স্কুলে যাবার তাড়া ছিল না বিনুর, দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়ার পর রোদ পোয়াচ্ছিল। কোথায় যেন খেজুর গুড় জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। বাতাসে তার সুগন্ধ ভেসে আসছে। হঠাৎ যুগল এসে সামনে দাঁড়াল, কী করতে আছেন ছুটোবাবু?
বিনু বলল, এই তো বসে আছি।
শুদাশুদি বইসা থাইকা কী করবেন? চলেন চকে যাই। এই সময় চকে সুন্দি কাউঠা বাইর হয়। খাইতে যা লাগে ছুটোবাবু, কী কমু! য্যামন সোয়াদ, ত্যামন ত্যাল–
বিনু লাফিয়ে উঠল, চল–
কবেই ধান কাটা হয়ে গেছে। শীতের দুপুরে এখন মাঠ জুড়ে শূন্যতা। ফসল নেই, ধানগাছের গোড়াগুলো শুকিয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। যেদিকেই চোখ ফেরানো যায়, সব কিছু বর্ণহীন। ঠিক বর্ণহীন নয়, ধূসর। শীতের আদিগন্ত মাঠের ওপর অসীম বিষাদ ঘন হয়ে আছে।
মাথার ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে চড়াই আর বুলবুলি উড়ছিল। মাঝে মাঝে তারা নিচে নেমে মাটিতে ঠোকর দেয়, কিন্তু বৃথাই। কেউ তাদের জন্য একদানা শস্যও ফেলে রেখে যায় নি।
একটা বুড়ো গোসাপ আলের ওপর দিয়ে পেট টেনে ধীর মন্থর গতিতে যাচ্ছিল। ধানকাটার সময় সাপটাকে এই মাঠে আরও অনেক বার দেখেছে বিনু। আজ কী হয়ে গেল, চট করে একটা মাটির ঢিল কুড়িয়ে নিল। ছুঁড়তে যাবে, যুগল হাতটা চেপে ধরল, করেন কী ছুটোবাবু, করেন কী? ও হইল এই চকের দ্যাবতা, অরে মারলে সব্বনাশ হইয়া যাইব।
ঢিলটা আস্তে আস্তে ফেলে দিয়ে বিনু শুধলো, কী সর্বনাশ হবে?
জমিনে আর ফসল ফলব না। এইহানকার মাইনষেরে জিগাইয়া দেইখেন।
মানুষের বিশ্বাসের ওপর কথা নেই। বিনু আর কিছু বলল না। গোসাপটাকে ডান দিকে রেখে তারা এগিয়ে চলল।
আরও কিছুদূর যাবার পর সেই লোকটাকে দেখতে পেল বিনু, নাম যার তালেব। সেদিন ল্যান্ড রেজিস্ট্রি অফিসে একে প্রথম দেখেছিল সে।
এখন, শীতশেষের এই ফাঁকা মাঠে খুব মনোযোগ দিয়ে ইঁদুরের গর্তে কাঠি ঢুকিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তালেব ধান বার করছে। সেদিন হেমনাথ বলেছিলেন, এইভাবেই নাকি লোকটা মাস তিনেকের মতো পেটের দানা, যোগাড় করে।
দূরে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ তালেবকে দেখল বিনুরা। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করল। তালেব তাদের দেখতে পায় নি।
তারপর সারা দুপুর খোজাখুঁজি করে মোটে তিনটে ছোট ছোট সুন্দি কচ্ছপ পাওয়া গেল। তাদের পা বেঁধে ঝুলিয়ে বাড়ির দিকে ফিরতে ফিরতে যুগল বলল, একখান কথা ছুটোবাবু’
কী কথা? বিনু জানতে চাইল।
আনন্দ-লজ্জা-সঙ্কোচ সব মিলিয়ে যুগলের মুখের ওপর দিয়ে পর পর অনেকগুলো ঢেউ খেলে গেল। তারপর খুব আস্তে করে সে বলল, কাইল গোপাল দাস আসব।
কে বললে?
পরশু লোক পাঠাইছিল।
আমি তো দেখি নি।
আপনে তহন ইস্কুলে
সত্যি সত্যি পরের দিন, ভাটির দেশ থেকে পাখির বাপ গোপাল দাস আর যুগলের সেই বোনাই ধনঞ্জয় এসে হাজির। প্রথমে তারা পণের আট কুড়ি টাকা গুনে গুনে নিল, তারপর বিয়ের দিন। ঠিক করল। মাঘ মাসের চব্বিশ তারিখে বিয়ে। এও স্থির হল, বিয়ে করতে অতদূরে ভাটির দেশে যেতে হবে না। মেয়ে নিয়ে একেবারে ধনঞ্জয়ের বাড়িতে চলে আসবে গোপাল দাস, সেখানেই শুভ কাজ সারা হবে।
