মাস্টারমশাই তার সঙ্গে রুস্তমদের মিশতে বারণ করে দিয়েছেন। নিষেধটা একতরফা নয়। রুস্তমরা যেমন তার সঙ্গে মিশবে না, তাকেও তেমনি ওদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। বিনুর কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল। রুস্তমদের কাছে যাবে কি যাবে না, ঠিক করে উঠতে পারল না।
তার মনোভাবটা রুস্তমরা যেন বুঝতে পারল। বলল, ডর নাই, এইহানে মাস্টারমশই আসব না। আসো—আসো–
অনিচ্ছাসত্ত্বেও কখন যে রুস্তমদের কাছে এসে বসেছে, বিনু টের পায়নি।
রুস্তম বলল, কইলকাতার থিকা আইছ?
হ্যাঁ–বিনু মাথা নাড়ল।
একটা ব্যাপার বিনু লক্ষ করেছে, রাজদিয়া আসার পর যার সঙ্গেই আলাপ হয়েছে, প্রথমেই তারা কলকাতার কথা জানতে চেয়েছে। কলকাতা সম্বন্ধে তাদের মনে অপার, অসীম বিস্ময়।
রুস্তমরাও কলকাতা সম্বন্ধে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক প্রশ্ন করল। অবাক হয়ে বিনুর মুখে অজানা রহস্যময় শহরটির নানা চমকপ্রদ কাহিনী শুনল। শুনতে শুনতে পকেট থেকে বিড়ির বাণ্ডিল বার করে একটা করে ধরিয়ে নিল। বিনুর দিকেও একটা বাড়িয়ে দিল।
বিনু চমকে উঠল। প্রথমত, স্কুলের ছেলেরা বিড়ি খায়, এমন দৃশ্য আগে আর কখনও দেখে নি। তার পক্ষে এ এক নিদারুণ অভিজ্ঞতা। তার ওপর তাকেও বিড়ি সাধছে। বিনুর বুকের ভেতরটা কাঁপতে লাগল। বলল, নানা–
বিড়ি বুঝি খাও না?
না। তয় কী খাও? সিগ্রেট?
না-না—
বিস্ময়ে চোখ গোল হয়ে গেল রুস্তমের, বিড়ি খাও না, সিগ্রেট খাও না, ক্যামন কইলকাত্তার পোলা।
বুক থরথর করছিলই, এখন মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। বিনু বলল, আমি এখন যাই–
খপ করে তার একটা হাত ধরে ফেলে রুস্তম বলল, আরে যাইবা কই? বসো-বসোআলাপ পরিচয়ই হইল না। বিড়িতে একখান টান দিয়াই দ্যাখো না, অ্যামন সুখ আর কিছুতে নাই–
না না, আমাকে ছেড়ে দিন—
আরে, কী আশ্চয্যি, আমাগো আপনে আইজ্ঞা কইরা কও ক্যান? এক লগে পড়ি, তুমি কইরা কইবা। তুইও কইতে পার।
বিনু স্তম্ভিত। পড়লই বা এক ক্লাসে, দামড়া মোষের মতো তাগড়া তাগড়া ওই জোয়ান দুটোকে কখনও তুমি কি তুই বলা যায়। বিনু উঠবার জন্য ছটফট করতে লাগল।
রুস্তম বলল, অ্যামন কর ক্যান? আমরা বাঘ না ভাল্লুক?
বিনু ফস করে বলে ফেলল, মাস্টারমশাই আমার পেছনে আপনাদের না লাগতে বারণ করে দিয়েছেন?
তাচ্ছিল্যের গলায় রুস্তম বলল, মাস্টারমশইরা অ্যামন কত কথাই কয়। হেই হগল ধইরা বইসা থাকলে চলে নিকি? আমাগো লগে মিশো, মজা পাইবা।
কিসের মজা?
রুস্তম উত্তর দিল না। পতিতপাবনের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। বলল, তুই-ই কইয়া দে–
পতিতপাবন কিছুক্ষণ চোখ কুঁচকে থাকল। তারপর খুব চাপা গলায় ফিসফিসিয়ে বলল, রুইমার তিন বিবি, আমারও বউ আছে। মেলা রসের কথা আমাগো জানা, তোমারে শিখাইয়া পড়াইয়া চালাক কইরা দিমু
কথাগুলো ঠিক যে বুঝল বিনু তা নয়। তবে টের পেল, এর ভেতর নোংরা অশ্লীল গন্ধ আছে। তার নাক-কান ঝা ঝা করতে লাগল।
রুস্তুমরা আবার কী বলতে যাচ্ছিল, সেই সময় ঘন্টা বেজে উঠল। অর্থাৎ টিফিন শেষ।
টিফিনের ঠিক পরের ক্লাসটাই আবার আশু দত্তের। ক্লাসে ঢুকেই তিনি হুঙ্কার দিলেন, রুস্তম, পতিতপাবন–
শেষ বেঞ্চ থেকে দু’জন উঠে দাঁড়াল।
আগের স্বরই আশু দত্ত আবার বললেন, কী বলেছিলাম তোদের?
এস্ত চোখে একবার মাস্টারমশাইকে দেখেই ঘাড় নিচু করল রুস্তমরা। আবছা স্বরে বলল, আইজ্ঞা–
তোদের না বলেছিলাম, বিনয়ের পেছনে লাগবি না। নিজেরা তো জাহান্নামে গেছিসই, বছর বছর ফেল করে একেকটা ধর্মের ষাঁড় হয়ে উঠেছিস। নিজেরা যা খুশি কর, ছোট ছোট ছেলেগুলোর সর্বনাশ করা কেন?
আমরা তো কিছু করি নাই।
করিস নি! আবার মিথ্যে বলা হচ্ছে! রাগে চিৎকার করে উঠলেন আশু দত্ত, ভেবেছিস, আমার চোখে কিছুই পড়েনি! টিফিনের সময় বাদাম গাছের তলায় বিনয়কে ডেকেছিলি কেন? বল হারামজাদা বদের ধাড়িরা–
রুস্তম পতিতপাবন, দুজনই এবার চুপ। মুখ তুলে মাস্টারমশাইয়ের দিকে তাকাবার সাহসটুকুও তাদের আর অবশিষ্ট নেই।
রুস্তম আর পতিতপাবনের চেহারা অসুরের মতো। অথচ রোগা দুর্বল আশু দত্তর সামনে ভয়ে তারা সিটিয়ে গেছে। দৃশ্যটা খুবই মজাদার, বিনুর খুব ভাল লাগল।
আশু দত্ত থামেন নি, তোরা হলি দাগী আম। একসঙ্গে থাকলে বাকিগুলোরও বারটা বাজাবি। স্কুল থেকে তোদের তাড়াতে হবে, দেখছি। যা, এখন ক্লাসের বাইরে গিয়ে হাফ নীল ডাউন হয়ে থাক–
রুস্তম এবং পতিতপাবন সুড়সুড় করে বাইরের টানা বারান্দায় চলে গেল। তারপর ত্রিভঙ্গ মূর্তিতে হাফ নীল ডাউন হয়ে রইল।
বিনুর খুব হাসি পাচ্ছিল। বাড়ি ফিরে প্রথম দিনের অভিজ্ঞতাটা রঙচঙ ফলিয়ে বলবার জন্য তার আর তর সইছিল না।
.
২.১৪
পৌষ মাস থাকতে থাকতেই মাঠগুলো ফাঁকা করে দিয়ে ধান উঠে গেল। বাড়ির উঠোনে এখন সোনার পাহাড় সাজানো।
যে পঁচিশ জন কৃষাণকে হেমনাথ কাজে লাগিয়েছেন তারা আজকাল আর চকে যায় না। খড়সমেত যে ধান কেটে এনেছে, সারাদিন ঝেড়ে ঝেড়ে তা থেকে শস্যের দানাগুলোকে আলাদা করে। তারপর রোদে শুকিয়ে ডোল বোঝাই করতে থাকে। আর খড়গুলো দিয়ে পালা সাজায়।
এদিকে অবনীমোহন মজিদ মিঞার যে জমি কিনেছেন তার ধানও উঠে গেছে। ফসল কেটে নিয়ে যাবার পর মজিদ মিঞা অবনীমোহনকে জমির দখল দিয়ে দিয়েছেন।
দেখতে দেখতে পৌষ সংক্রান্তি এসে গেল। সংক্রান্তির দিন বিনুদের স্কুল আর সুধা সুনীতির কলেজ ছুটি। এই দিনটিতে এ দেশে অনেকেই বাস্তুপুজো করে থাকে। হেমনাথরাও করেন। অবনীমোহন নতুন জমি কিনেছেন, ঠিক হয়েছে তিনিও বাস্তুপুজো করবেন।
