চারজনেরই স্কুল আর কলেজ কাছাকাছি। খেয়ে দেয়ে দল বেঁধে তারা বেরিয়ে পড়ল।
প্রথমে পড়ে মেয়েদের স্কুল। সেখানে ঝিনুককে রেখে বাকি তিনজন এগিয়ে গেল। ঠিক হল, ফেরার পথে ঝিনুককে তারা নিয়ে যাবে।
ঝিনুকের পর বিনুর স্কুল। সুধা সুনীতি তার স্কুলে আর এল না। বড় রাস্তা ধরে সোজা কলেজের দিকে চলে গেল। বিনু ডান দিকের মাঠের ওপর দিয়ে স্কুলবাড়ির দিকে চলল।
মাঠের মাঝামাঝি আসতেই বিনু শুনতে পেল, পেছন থেকে কেউ ডাকছে। এখানে কে ডাকতে পারে তাকে? সবাই তো অচেনা। ঘুরে দাঁড়াতেই সে দেখতে পেল, হেডমাস্টার মোতাহার হোসেন চৌধুরি সাহেব আসছেন।
কাছে এসে মোতাহার সাহেব সস্নেহে হাসলেন, স্কুল খোলার দিনই চলে এসেছ?
বুক ঢিপ ঢিপ করছিল বিনুর। চোখ নামিয়ে আবছা গলায় বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ—
গুড, ভেরি গুড। বিনুর কাঁধে একখানা হাত রেখে মোতাহার সাহেব বললেন, কখন এলে?
এইমাত্র।
এখনও তা হলে ক্লাসে যাও নি?
আজ্ঞে না।
এস আমার সঙ্গে–বিনুকে সঙ্গে নিয়ে মোতাহার সাহেব তার ঘরে গেলেন।
সেদিন মনে হয়েছিল, এ ঘরখানা হেডমাস্টার সাহেবের জন্য আলাদা করে নির্দিষ্ট। কিন্তু আজ দেখা গেল, অন্যান্য মাস্টার মশাইরাও এখানেই বসেন। মোট কথা, এটাই রাজদিয়া হাই স্কুলের টির্চাস কমন রুম।
এখনও স্কুল বসার সময় হয়নি। সব মাস্টারমশাই এর মধ্যেই এসে গেছেন। তাঁদের সবার সঙ্গে বিনুর আলাপ করিয়ে দিলেন মোতাহার সাহেব। তো যে লম্বা নোগা মতো প্রৌঢ়টি, যার নাম আশু দত্ত–তিনি ইংরেজির টিচার এবং অ্যাসিস্টান্ট হেডমাস্টার। উনি সোমনাথ সাহা, অঙ্কের টিচার। উনি রজনী চট্টরাজ, ভূগোলের টিচার। ইত্যাদি—
মাস্টার মশাইদের পরিচয় টরিচয় দিয়ে মোতাহার সাহেব বললেন, এই ছেলেটির নাম বিনয় বিনয়কুমার বসু। আমাদের হেদাদার ভাগনীর ঘরের নাতি। এ বছর ক্লাস এইটে ভর্তি হয়েছে। আপনারা একটু লক্ষ্য রাখবেন। ছেলেটি বেশ ব্রাইট।
হেমনাথের নাতি এবং হেডমাস্টার সাহেবের প্রশংসা শুনে সবাই বেশ আগ্রহান্বিত হলেন। বিনুরা আগে কোথায় ছিল, হঠাৎ রাজদিয়ায় এসে ভর্তিই বা হল কেন, এমন নানা প্রশ্ন করতে লাগলেন মাস্টারমশাইরা। বিনু উত্তর দিয়ে যেতে লাগল।
কথায় কথায় ক্লাসের সময় হয়ে গেল। দপ্তরী বাইরে ঘন্টা বাজিয়ে দিল।
মোতাহার সাহেব তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ক্লাস এইটের প্রথম ক্লাস কার?
অ্যাসিস্টান্ট হেডমাস্টার রোগা, লম্বামত আশু দত্ত বললেন, আমার—
বিনয়কে আপনার সঙ্গে নিয়ে যান। ছেলেমানুষ, আজ নতুন এসেছে—
বিনুর দিকে তাকিয়ে আশু দত্ত ডাকলেন, এস–
ক্লাসে আসতে দেখা গেল বেঞ্চিগুলো বোঝাই হয়ে গেছে। ছেলেরা আগেভাগে সেগুলো দখল করে বসে আছে।
বিনু লক্ষ করল, বেশির ভাগ ছেলেই তার চাইতে অনেক বড়। পেছন দিকে যারা বসে আছে তাদের মুখ দেখে মনে হল, নিয়মিত দাড়িগোঁফ কামায়। দু’একজন বিনুর সমবয়সী থাকতেও পারে, কিন্তু এত ছেলের ভিড়ে এই মুহূর্তে তাদের খুঁজে বার করা অসম্ভব।
ক্লাসের দিকে তাকিয়ে আশু দত্ত বললেন, তোমাদের নতুন এক বন্ধু এসেছে। আজই এর সঙ্গে সবাই আলাপ টালাপ করে নেবে। বলে বিনুকে দেখিয়ে দিলেন। তারপরেই হঠাৎ কী মনে পড়ে যেতে খুব দ্রুত ফের বলে উঠলেন, তবে হ্যাঁ, দু’জন এর সঙ্গে মিশবে না, কথাও বলবে না। বলেই ডাকলেন, রুস্তম–পতিতপাবন–
সঙ্গে সঙ্গে পেছন দিকের বেঞ্চ থেকে বাইশ তেইশ বছরের দুই গাট্টাগোট্টা জোয়ান উঠে দাঁড়াল। এত বড় বড় ধেড়ে ছেলেরা যে ক্লাস এইটে পড়তে পারে, বিনুর কাছে তা এক অভাবনীয় ব্যাপার। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল সে।
আশু দত্ত বললেন, তোমাদের দুজনকে সাবধান করে দিলাম, বিনয়ের পেছনে লাগবে না। ওর সঙ্গে মিশবে না।
আইচ্ছা স্যার–রুস্তম এবং পতিতপাবন দু’জনেই ঘাড় হেলিয়ে আবার বসে পড়ল।
আশু দত্ত কেন যে রুস্তম আর পতিতপাবনকে তার সঙ্গে মিশতে বারণ করে দিলেন, বিনু ভেবে। পেল না।
বেশিক্ষণ সেই ভাবনাটা নিয়ে থাকা গেল না। সামনের বেঞ্চের ছেলেদের একটু চেপেচুপে বসে বিনুকে জায়গা করে দিতে বললেন আশু দত্ত। বিনু বসলে বললেন, রোজ তুমি ওই জায়গায় বসবে।
আচ্ছা স্যার–বিনু মাথা নাড়ল।
অ্যানুয়াল পরীক্ষার পর নতুন বছরে আজই প্রথম স্কুল বসেছে। এখনও ছেলেদের বইটই কেনা হয়নি। বই কেনা হবে কোত্থেকে? এখনও বুক লিস্টই দেওয়া হয়নি। কাজেই গল্প করে সময় কাটানো ছাড়া কাজ নেই।
অলস মন্থর গতিতে একটার পর একটা ক্লাস গড়িয়ে চলল। তারপর একসময় টিফিনের ঘন্টা বাজল। সঙ্গে সঙ্গে জলোচ্ছাসের দিশেহারা ঢলের মতো স্কুলবাড়ির সবগুলো ঘর থেকে হুড়মুড় করে ছেলেরা বেরিয়ে পড়ল। স্রোতে গা ভাসিয়ে বিনুও বাইরে এল।
ছেলেরা ছোটাছুটি করছে। একদল সামনের মাঠে দাড়িয়াবান্ধা’র কোটে নেমে পড়েছে। আরেক দল খেলেছে গোল্লাছুট। তবে বেশির ভাগই শীতের রোদে পিঠ দিয়ে আড্ডা দিচ্ছে।
কারোর সঙ্গেই এখনও ভাল করে আলাপ হয়নি। চারদিকে আলতোভাবে ভেসে বেড়াতে লাগল বিনু। একবার ‘দাড়িবান্ধা’র কোটে, একবার ‘গোল্লাছুটে’র আসরে ঘুরতে ঘুরতে কখন যে মাঠের প্রান্তে সারি সারি কাঠবাদাম গাছগুলোর কাছে এসে পড়েছিল, খেয়াল নেই।
হঠাৎ চাপা গলায় কারা যেন ডেকে উঠল বিনয়—
চমকে এদিকে তাকাতেই বিনু দেখতে পেল, ডান দিকের কাঠবাদাম গাছটার তলায় রুস্তম, পতিতপাবন এবং তাদের বয়সী আরও দু’তিনটে জোয়ান ছেলে বসে আছে।
