বেলা অনেকখানি চড়লে স্নেহলতা একবার বললেন, বড়দিনের উৎসব তো মিটল। এবার আমরা বাড়ি যাই?
তার কথা শেষ না হতেই চেঁচামেচি জুড়ে দিলেন লারমোর, কোথায় মিটল! আজ সারা দিনই বড়দিন।
তার মানে কী বলতে চান আপনি?
কপাল কুঁচকে, কপট শঙ্কার গলায় স্নেহলতা বললেন, সারা দিন!
হ্যাঁ, সারা দিন। লারমোর ঘাড় হেলিয়ে দিলেন।
সন্ধে পর্যন্ত একটানা গল্পগুজব, খাওয়াদাওয়া, এবং হালকা সুরের ঠাট্টা টাট্টা চলল। স্নিগ্ধ মনোরম একটি দিন কাটিয়ে অনেক, অনেক রাত্তিরে বিনুরা ফিটনে উঠল। এতক্ষণে বাড়ি ফেরার অনুমতি মিলেছে।
.
২.১২
দিনকয়েক পর এক সকালবেলায় পুরের ঘরের তক্তপোষে বসে ছিল বিনু। নাকের ডগা এবং চোখদুটো বাদ দিলে গা গরম চাদরে ঢাকা। একটা পুঁটুলির মতো দেখাচ্ছিল তাকে। বাতাস এমন কনকনে যে চাদরের ভেতর থেকে হাত-পা বার করতে ইচ্ছে হয় না।
একটু আগে ঘুম ভেঙেছে বিনুর। স্কুলে ভর্তির সমস্যাটা মিটে যাবার পর আজকাল বই টই ছুঁচ্ছে না সে। বিনু জানিয়ে দিয়েছে, নতুন বছরে নতুন ক্লাস শুরু না হলে সে আর পড়ছে না।
দাদুর কাছে যদিও সে শোয়, ইদানীং এত ঠান্ডায় ভোরবেলা আর উঠতে চায় না। হেমনাথও টানাটানি করেন না। শীতকালের মাঝামাঝি এই হিমবর্ষী দিনগুলোর জন্য বিনুর সূর্যস্তব স্থগিত আছে।
এখন বেশ বেলা হয়েছে। আকাশের খাড়া দেওয়াল বেয়ে সূর্যটা অনেকখানি ওপরে উঠে এসেছে। জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল বিনু। উঠোনভর্তি এখন শুধু ধান আর ধান, হেমনাথের খেতের ধান–সোনার পাহাড়ের মতো স্তূপাকার হয়ে আছে। উঠোনের পর বাগান, তারপর পুকুর। অঘ্রাণের গোড়াতেই পুকুরের ওপারের মাঠ থেকে জল নেমে গিয়েছিল। এখন ওখানকার মাঠ একেবারে নিঃস্ব। কৃষাণেরা ধান কেটে নিয়ে গেছে। ধানকাটা ফাঁকা মাঠ কেমন যেন ধূসর দেখায়। শস্যকণার খোঁজে ঝাকে ঝাকে মোহনচূড়া পাখি আর বুলবুলি সেখানে চক্কর দিয়ে ফিরছে। এছাড়া আর কেউ নেই, কিছু নেই।
হেমনাথ ঘরে ঢুকলেন। বললেন, কী করছিস বিনুদাদা?
দূর মাঠের দিকে চোখ রেখেই অনমনস্কের মতো বিনু উত্তর দিল, বসে আছি।
কৌতুকের গলায় হেমনাথ এবার বললেন, ফাঁকা মাঠের শোভা দেখছিস? বলে শব্দ করে হাসলেন।
একটু পর পেছন দিকে কিসের আওয়াজ হতে বিনু মুখ ফেরাল। তার চোখে পড়ল, তক্তপোষের তলা থেকে প্রকাণ্ড স্টিলের বাক্স বার করে খুলে ফেলেছেন হেমনাথ। এবং তন্ময় হয়ে ভেতরে কী সব দেখছেন।
আগেও বারকয়েক এই বাক্সখানা খুলে বিভোর হয়ে হেমনাথকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছে বিনু। তখন কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
আজ পৌষ মাসের এই অলস সকালে হঠাৎ অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে উঠল বিনু। ডাকল, দাদু–
হেমনাথ প্রথমটা শুনতে পাননি। আরও দু’চারবার ডাকাডাকির পর মুখ তুললেন, কী বলছিস?
বাক্সের ভেতর কী দেখছ?
উত্তর না দিয়ে হেমনাথ জিজ্ঞেস করলেন, তুই দেখবি?
বিনুর কৌতূহল ক্রমশ বেড়েই যাচ্ছিল। বলল, হ্যাঁ।
আয়—
জানালার পাশ থেকে উঠে পড়ল বিনু, পায়ে পায়ে হেমনাথের কাছে চলে এল।
বাক্সের ডালাটা পুরোপুরি মেলে ধরলেন হেমনাথ। বললেন, দ্যাখ
ভেতরে চমৎকার চমৎকার সব জিনিস স্থূপীকৃত হয়ে আছে। বেতের সাজি, নকশাকরা কাশ্মিরি শালের পাড়, বহুবর্ণময় ময়ূরের পালক, অসংখ্য ছবি, মাটির পুতুল, পট, ডাকের সাজের অগণিত নমুনা, কারুকার্য করা প্রাচীন কথা, নানারকম রঙচঙে পাথর, মণিপুরী চাদর, মোটা আর্ট পেপারে ঘন কালো কালির অতি সুন্দর হস্তাক্ষর, কাঠের এবং হাড়ের রমণীয় শিল্পকার্য–এমনি কত কী।
বিনু অবাক হয়ে গিয়েছিল। বলল, এসব কার দাদু?
হেমনাথ বললেন, আমার। একটা বাক্স দেখলি তো?
হ্যাঁ।
এইরকম আরও পাঁচ ছ’টা বাক্স আছে। এখন আমার বয়স পঁয়ষট্টির মতো। কুড়ি পঁচিশ বছর বয়স থেকে এসব জিনিস জমাচ্ছি। যেখানে যা কিছুই ভাল, যা কিছু সুন্দর চোখে পড়েছে, চেয়ে চিন্তে বা পয়সা দিয়ে কিনে এনে জমিয়ে রেখেছি।
বিনু কী বলতে যাচ্ছিল, কোত্থেকে হঠাৎ ঝিনুক এসে হাজির। এক পলকে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে সুর টেনে টেনে বলল, বিনুদাদাকে কী দেখাচ্ছ গো?
বাক্সের ভেতরটা দেখিয়ে হেমনাথ বললেন, এই সব—
বিনুদাদাকে দেখালে আমাকেও দেখাতে হবে- ঝিনুক নাকে কান্না জুড়ে দিল।
কাঁদছিস কেন, দ্যাখ না–
এই এক মেয়ে হয়েছে। বিনু যা করবে, যা দেখবে, যেখানে যাবে, তারও তাই করা চাই, সেখানে যাওয়া চাই।
মনে মনে ঝিনুকের ওপর রেগে গেল বিনু। একবার ইচ্ছা হল, বঁটিটা টেনে ছিঁড়ে দেয় কিন্তু কিছুই করল না। ঝিনুককে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সে বলল, এত সব জিনিস জমিয়েছ কেন?
হেমনাথ বললেন, এমনি, শখ। একটু চুপ করে থেকে দূরমনস্কের মতো আবার বললেন,
ঠিক শখ না। ভাল ভাল, সুন্দর সুন্দর জিনিস যোগাড়ের নেশা থাকলে মন খারাপ দিকে যায় না। তা ছাড়া–
কী?
মাঝে মাঝে কোনও কারণে বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে থাকলে বাক্স খুলে বসি। এসব দেখতে দেখতে সব ভার কেটে যায়।
হেমনাথের শেষ কথাগুলো খানিক বুঝল বিনু, অনেকখানিই দুর্বোধ্য থেকে গেল। বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে থাকল সে।
হেমনাথ আবার বললেন, জিনিসগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সুধা সুনীতিকে বলব, যেন সাজিয়ে গুছিয়ে ঠিক করে রাখে।
.
২.১৩
দেখতে দেখতে ইংরেজি নতুন বছর পড়ে গেল। আজ থেকে বিনুদের ক্লাস শুরু হবে। একা বিনুর না, সুধা সুনীতি এবং ঝিনুকেরও।
