লারমোর বললেন, সুধাদিদি সুনীতিদিদি, আর কী লাগবে বল—
সুধা সুনীতি একসঙ্গে বলল, আর কিছু না।
এবার তা হলে সাজাতে শুরু কর।
দু’বোন কোমর বেঁধে লেগে গেল। ফুল এবং লতাপাতায় চমৎকার নকশা করে গেট সাজাল, তিন চারটে তোরণ বানালো। নানা রঙের কাগজ কেটে অসংখ্য শিকলি বানিয়ে চারদিকে টাঙিয়ে দিল। দেওয়ালে আর মেঝেতে আলপনা আঁকল অনেক। একটা ক্রিসমাস ট্রি বানাল, তার তলায় কাগজ টাগজ দিয়ে বুড়ো সান্তা ক্লজ তৈরি করে দাঁড় করিয়ে দিল। সব চাইতে সুন্দর করে সাজাল যিশুখ্রিস্টের ছবিখানা। অবশ্য যুগল-লারমোর-বি-ঝিনুক, যার যেমন সাধ্য সুধা সুনীতিকে সাহায্য করেছে।
রাত পোহালেই বড়দিন। কোথায়, কত শতাব্দী আগে বেথেলহেমের আকাশে উজ্জ্বল তারাটি দেখা দিয়েছিল। তারপর এই ধূলিধূসর মর্তে আবির্ভাব হয়েছিল মানবপুত্রের। আপন রক্তে এই রিপুতাড়িত জগৎকে তিনি শুদ্ধ করে গেছেন।
সেই জ্যের্তিময় পুরুষটিকে কৃতজ্ঞ মানুষ আজও ভোলেনি। বহু শতাব্দী পরও বসুন্ধরার এক প্রান্তে রাজদিয়া নামে এক অখ্যাত নগণ্য জনপদে তার পূণ্য জন্মদিন স্মরণ করে তারা ধন্য হচ্ছে।
লারমোর ঘুরছেন, ফিরছেন আর সুসজ্জিত গির্জা বাড়িটাকে দেখছেন, যিশুর ছবিখানা দেখছেন। দেখে দেখে সাধ যেন তার মেটে না।
দেখেন আর ঘন আবেগের গলায় লারমোর বলেন, চল্লিশ বছর ধরে রাজদিয়ায় আছি। সব বছরই তো বড়দিনের উৎসব হয়। কিন্তু কোনও বার এমন করে গির্জাবাড়ি সাজাতে পারিনি। ভাগ্যিস সুধাদিদি সুনীতিদিদিরা রাজদিয়া এসেছিল। কী আনন্দ যে হচ্ছে!
কঘন্টা পরেই বড়দিন। গির্জার চারধারে ক’টি মানুষ তার জন্য হৃদয় বিছিয়ে রেখেছে।
গির্জা সাজাতে সাজাতে অনেক রাত হয়ে গেল। তারপর খেয়ে দেয়ে সবাই শুয়ে পড়ল। কতক্ষণের জন্যই বা শোওয়া! খানিক পরে, তখনও রাতের অন্ধকার রয়েছে, লারমোর উঠে পড়লেন। এমন যে ঘুমকাতুরে বিনু, সেও শুয়ে থাকতে পারল না।
শীতের এই শেষ রাতে চারদিক যখন বরফের মতো ঠান্ডা, পেছনের নদী থেকে লারমোর এবং হেমনাথ স্নান করে এলেন। সুধা সুনীতিও স্নান করতে চেয়েছিল, হেমনাথ করতে দেননি। অভ্যেস তো নেই। শেষে অসুখ বিসুখ হয়ে যেতে পারে। দু’একখানা বেশি জামাকাপড় নিয়ে এসেছিল ওরা। তাড়াতাড়ি মুখটুখ ধুয়ে কাপড় বদলে নিল।
এত ঠান্ডায় প্যান্টজামা বদলাতে ইচ্ছা করছিল না বিনুর। হেমনাথ বললেন, কী ছেলে রে তুই, উৎসবের দিনে কেউ বাসি জামা টামা পরে থাকে! যা যা, পরিষ্কার জামাপ্যান্ট পরে নে–
অগত্যা কী আর করা, চটকানো বাসি জামাটামা ছাড়তেই হল বিনুকে। দেখাদেখি ঝিনুকও চট করে ফ্রক বদলে নিল।
এদিকে যিশুর ছবির সামনে অসংখ্য মোমবাতি জ্বেলে দিয়েছেন লারমোর। একসময় সবাইকে ডেকে পবিত্র শুদ্ধ মনে চোখ বুজে আশ্চর্য সুরেলা গলায় বড়দিনের প্রার্থনা শুরু করে দিলেন। যিশু বন্দনার পর বাইবেল থেকে তাঁর প্রিয় কটি পদ আবৃত্তি করলেন :
Make a joyful noise
unto the Lord, all ye lambs
Serve the Lord, with gladness.
Come before his presence with singing.
Know ye that the Lord he is
God. it is he that hath made us.
And not we ourselves; we are his
People, and the sheep of his pasture.
আবৃত্তি শেষ হলে অসংখ্য পবিত্র প্যারাবেল শোনালেন লারমোর। ওল্ড এবং নিউ টেস্টামেন্ট থেকে অনেক কথা শোনালেন। যিশুর জন্ম থেকে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ পর্যন্ত পুণ্য জীবনকাহিনী বর্ণনা করলেন। বুড়ো সান্তা ক্লজের কথা বললেন। হেমনাথ-সুধা-সুনীতি-বি-ঝিনুক, সবাই অভিভূত হয়ে শুনতে লাগল।
যিশুভজনা শেষ হতে ভোর হয়ে গেল। ঘন করে বোনা কুয়াশার ভারী পর্দাগুলো ছিঁড়েখুঁড়ে রোদ উঠল।
রাত থাকতে থাকতেই যুগল বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। তাকে আবার কৃষাণদের সঙ্গে মাঠে যেতে হবে।
বেলা বাড়লে সুরমা স্নেহলতাকে নিয়ে অবনীমোহন গির্জায় এলেন। শিবানী আসেননি, ক’দিন ধরে তার জ্বর। তা ছাড়া, সবাই চলে এলে তো হয় না, বাড়ি পাহারা দেবার জন্য এক-আধজন থাকা দরকার।
শুধু হেমনাথদের বাড়ির লোকজনই নয়, বেলা যত চড়তে লাগল রাজদিয়া এবং দূর-দুরান্তের গ্রাম-গঞ্জ থেকে কত মানুষ যে আসতে লাগল গির্জায়! চেনাজানা যাকে পেয়েছেন তাকেই নেমন্তন্ন। করেছেন লারমোর।
যে আসছে তারই হাতে ফল-টল মিষ্টি-টিষ্টি দিচ্ছেন লারমোর, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরিচ্ছন্ন সুসজ্জিত গির্জাবাড়ি দেখাচ্ছেন আর বলছেন, কেমন দেখলে বল তো?
চোমকার! কতকাল ধইরা এই গিজ্জায় বড়দিন দেখতে আছি। কিন্তুক অ্যামন সাজান-গুজান। কুনোদিন দেখি নাই।
কোত্থেকে দেখবে? আমরা কি সাজাতে টাজাতে জানতাম?
এইবার তাইলে অ্যামন সোন্দর কইরা সাজাইলেন ক্যামনে?
আমরা কি সাজিয়েছি?
তয়?
আমরা নাতনীরা সাজিয়েছ। বলে সুধা সুনীতির হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে এসে সগর্বে সবাইকে দেখান লারমোর।
সারাদিনই লোক আসছে। একদল যায় তো আর একদল তক্ষুনি এসে পড়ে। জনস্রোতের আর বিরাম নেই। এ তো শুধু খ্রিস্টানদেরই উৎসব নয়, সমস্ত মানবজাতির কাছেই এক পরম পবিত্র দিন। অন্তত রাজদিয়ার মানুষ এইভাবেই দিনটিকে গ্রহণ করেছে।
লোক আসছে, যাচ্ছে। হেমনাথরা কিন্তু ছাড়া পেলেন না।
