হাতজোড় করে পুরোপুরি আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে লারমোর বললেন, এইবার–এইবারটা শুধু ক্ষমা করে দিন বৌঠাকরুন। কদিন পর থেকে দেখবেন, বোজ আসছি।
লারমোরের সারল্য, কাঁচুমাচু মুখভঙ্গি, করুণ ক্ষীণ কণ্ঠস্বর–সব মিলিয়ে এমন একটা আবহাওয়া তৈরি করে যাতে না হেসে কেউ পারে না। আজও সবাই হাসল। স্নেহলতা কিন্তু হাসলেন না। তীক্ষ্ণ কুটিতে লারমোরকে বিদ্ধ করতে করতে বললেন, যেদিন থেকে সাহেব তোমার সঙ্গে আলাপ হয়েছে সেদিন থেকেই তো এ কথা শুনে আসছি। তা প্রায় চল্লিশ বছর হতে চলল।
যা হবার হয়ে গেছে। এবার থেকে আমি সুবোধ বালক হয়ে যাব।
ঠিক?
ঠিক।
কতবার তো প্রতিজ্ঞা করা হল! সে যাক গে, এতদিন পর কোত্থেকে উদয় হলেন? করছিলেন কী?
রোগী-টোগী ছিল। তার ওপর ধান উঠছে। নানা ঝঞ্ঝাটে আর আসা হচ্ছিল না।
স্নেহলতা শুধোলেন, আজ হঠাৎ কী মনে করে?
লারমোর একটু যেন অবাকই হলেন, আহতও। বললেন, বা রে, সব ভুলে গেছেন?
তবু মনে করতে পারলেন না স্নেহলতা। অপ্রস্তুত মুখে বললেন, কী বলুন তো?
হেমনাথ খানিক দূরে বসে ছিলেন। তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, পরশু পঁচিশে ডিসেম্বর, বড়দিন। তাই না?
হা। আস্তে মাথা হেলিয়ে দিলেন লারমোর। স্নেহলতা লজ্জিত, বিব্রত। বললেন, সত্যি, আমার একেবারেই খেয়াল ছিল না। মন আজকাল যে কি বেভুলো হয়ে যাচ্ছে!
হেমনাথ বললেন, বড়দিনের নেমন্তন্ন করতে এসেছ বুঝি লালমোহন? লারমোর বললেন, হ্যাঁ। পরশু আমার ওখানে সবাই যাবে।
একটু ভেবে হেমনাথ বললেন, গির্জা পরিষ্কার টরিষ্কার করিয়েছ? চারধার যা নোংরা করে রেখেছিলে।
না। কোথায় আর করানো হল! লারমোর বলতে লাগলেন, ধানকাটা শুরু হয়ে গেল, তাই নিয়ে মেতে উঠলাম।
চমৎকার! হেমনাথ অত্যন্ত রেগে গেলেন, পরশু বড়দিন, এখনও নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছ! গির্জা ঘোয়ামোছা মাজা-ঘষা হবে কবে?
কাল সকালবেলা তুমি যদি একবার আসো—
যেতেই হবে। ভাবছি যুগলকে নিয়ে যাব।
তা হলে খুব ভাল হয়। আমার ওখানে পরানের মা আছে। সবাই হাত লাগালে কতক্ষণ আর লাগবে?
একটু চুপ করে থেকে হেমনাথ বললেন, যা দেখছি, গির্জা সাফটাফ করে সাজিয়ে-গুজিয়ে কাল আর আমার ফেরা হবে না।
কাল তোমাকে ফিরতে দিচ্ছে কে? তুমি ফিরবে পরশু বিকেলে। বলতে বলতে লারমোরের হঠাৎ কী মনে পড়ে গেল, ভাল কথা—
কী?
আমরা না-হয় পরিষ্কার টরিষ্কার করব। গির্জা সাজানোর ভার সুধাদিদি সুনীতিদিদিকে দিলে কেমন হয়?
খুব ভাল, খুব ভাল–
তা হলে কাল বিকেলে সুধা সুনীতিকে নিয়ে যাবার জন্যে গাড়ি পাঠিয়ে দেব। বাকি সবাই পরশু যাবে।
আচ্ছা।
একধারে বসে বসে চুপচাপ সবার কথা শুনে যাচ্ছিল বিনু। হঠাৎ সে বলে উঠল, কাল সকালে দাদুর সঙ্গে আমিও যাব।
সুরমা ওধার থেকে তাড়াতাড়ি বললেন, না। কাজের মধ্যে গিয়ে তোমাকে আর ঝঞ্জাট করতে হবে না। আমাদের সঙ্গে তুমি পরশু যাবে।
বিনুর মুখখানা কালো হয়ে গেল।
লারমোর বিনুকে লক্ষ করছিলেন। সস্নেহ গলায় বললেন, না না, পরশু নয়, কালই তুমি যাবে।
ঝিনুক এতক্ষণ একটি কথাও বলেনি। বিনুর যাবার ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে দেখে হিংসুটি মেয়েটা আর মুখ বুজে থাকতে পারল না। কান্নার মতো সরু গলায় হঠাৎ বায়না জুড়ে দিল, বিনুদাদা গেলে আমি যাব, আমি যাব।”
অত্যন্ত বিরক্ত চোখে বিনু ঝিনুকের দিকে তাকাল। মেয়েটা তার পেছনে সবসময় প্রায় জোঁকের মতো লেগে আছে।
লারমোর বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাবি। নিশ্চয়ই যাবি।
সুধা সুনীতিও এ ঘরেই ছিল। সুধা হঠাৎ বলল, বড়দিনে আমাদের ক্রিসমাস কেক খাওয়াবেন তো লালমোহন দাদু?
লারমোর হাসলেন, এই গ্রামদেশে কেক কোথায় পাব দিদি? তবে—
কী?
চমচম খাওয়াব, পাতক্ষীর খাওয়াব, রসগোল্লা খাওয়াব। দেখব, কে কত খেতে পারিস।
সুধা কিন্তু খুঁতখুঁত করতে লাগল, বড়দিনে কেক না হলে ভাল লাগে না।
.
পর দিন ভোরবেলা ফিটন পাঠিয়ে দিলেন লারমোর।
ধানকাটা এখনও চলেছে। একশ’ কানি জমির ফসল তো অল্প সল্প ব্যাপার নয় যে মুখের কথা খসলেই খেত থেকে উঠে এল।
ঠিক হল, কুষাণদের সঙ্গে জমিতে গিয়ে অবনীমোহন আজকের দিনটা ধানকাটা তদারক করবেন। কাল ভোরবেলা যুগল ফিরে আসবে। যুগল ফিরলে অবনীমোহন বাড়ির বাকি সবাইকে নিয়ে গির্জায় যাবেন। কালকের দিনটার ধানকাটা দেখাশোনার ভার থাকবে যুগলের ওপর।
এত ভোরে রোদ ওঠেনি। কুয়াশায় চারদিক আচ্ছন্ন। পৌষের হাওয়া এত ঠাণ্ডা, মনে হয় বরফের দেশ থেকে ছুটে আসছে। ভেজা মাটি থেকে এমন হিম উঠছে যে পা ফেলা যায় না। সারা গায়ে গরম জামাকাপড়, তবু শীত কাটে না। হি হি কাঁপতে কাঁপতে বিনু ঝিনুক হেমনাথ এবং যুগলের। সঙ্গে ফিটনে গিয়ে উঠল।
গির্জায় পৌঁছতে পৌঁছতে রোদ উঠে গেল। শীতের রোদ–নিস্তেজ, উত্তাপহীন। তবু তো রোদ। পকেট থেকে হাত বার করে সিটনো আঙুলগুলো সেঁকে নিতে লাগল বিনু।
গির্জায় এসে এক মুহূর্তও বসলেন না হেমনাথ। যুগল আর লারমোরকে সঙ্গে নিয়ে ঝাড়পোঁছ শুরু করে দিলেন। দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়ার সময়টুকু বাদ দিলে সারাদিন ধোয়ামোছা চলতে লাগল।
বিকেলে সুধা সুনীতি এল। ততক্ষণে ঘষে মেজে গির্জাকে ঝকঝকে করে তোলা হয়েছে। চারদিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।
সুধারা আসতে না আসতেই বিনুকে সঙ্গে নিয়ে যুগল, বেরিয়ে পড়ল। ঘুরে ঘুরে রাজ্যের ফুল, লতা পাতা যোগাড় করে গির্জার সামনে পাকার করল। নদীপাড়ের মনিহারি দোকান থেকে লাল নীল-সবুজ, নানা রঙের কাগজ কিনে আনল।
