মোতাহার সাহেব ঈষৎ অবাক হলেন, ভর্তি করতে এসেছেন মানে! ওরা কি এখানেই থাকবে?
হ্যাঁ।
কলকাতা ছেড়ে এই গ্রামে থাকতে ভাল লাগবে।
ওর বাবার খেয়াল। কলকাতায় ব্যবসা ট্যবসা ছিল। সব তুলে দিয়ে এখানে জমিজমা কিনেছে। ইস্টবেঙ্গল নাকি ওর খুব ভাল লেগেছে।
খুব ইন্টারেস্টিং তো৷ মোতাহার সাহেব কৌতূহলের গলায় বললেন, ভদ্রলোকের সঙ্গে একদিন আলাপ করতে হয়।
হেমনাথ বললেন, পরশু আমাদের বাড়ি যাচ্ছিস তো, তখন আলাপ করিয়ে দেব’খন।
আচ্ছা। কিন্তু হেমদাদা–
কী বলছিস?
সামান্য একটা ভর্তির জন্যে আপনি আবার কষ্ট করে নিজে এসেছেন কেন? এখন তো স্কুল বন্ধ। জানুয়ারির ফাস্ট উইকে কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দেবেন। ভর্তি করে নেব।
উঁহু– জোরে জোরে প্রবল বেগে মাথা নাড়তে লাগলেন হেমনাথ, আমার খাতিরে এমনি এমনি ভর্তি করলে চলবে না। যে ক্লাসে ভর্তি হবে তার যোগ্য কিনা পরীক্ষা করে নিতে হবে।
স্থির চোখে হেমনাথকে দেখলেন মোতাহার সাহেব। তারপর অসীম সম্ভ্রমের সুরে বললেন, পরীক্ষা করে নেবার কথা কোনও অভিভাবকই বলে না। আপনার ওপর আমার শ্রদ্ধা দশগুণ বেড়ে গেল হেমদাদা। আপনি যখন চাইছেন, পরীক্ষা আমি নেব।
আজ যখন এসে পড়েছি, আজই নিয়ে নে। পরে না হয় মাইনেপত্তর দিয়ে ফি-বুক, বুকলিস্ট নিয়ে যাবে।
মোতাহার সাহেব অদ্ভুত হাসলেন।
হেমনাথ শুধোলেন, হাসলি যে?
আমাকে বুঝি আপনার বিশ্বাস নেইপাছে অন্য কারোর সঙ্গে পাঠালে পরীক্ষা না নিই তাই এখনই নিতে বলছেন।
বিব্রতভাবে হেমনাথ বললেন, না, ঠিক তা নয়।
হাসতে হাসতে মোতাহার সাহেব বললেন, বেশ বেশ, আপনার যখন এতই অবিশ্বাস তখন পরীক্ষাটা নিয়ে নিচ্ছি।
দাদুর ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছিল বিনুর। হেডমাস্টারমশাই যেখানে এমনিতেই ভর্তি করে নিতে চাইছেন সেখানে দাদু পরীক্ষা’ পরীক্ষা করে অস্থির হয়ে উঠছেন। শুধু রাগই না, তার সঙ্গে অভিমানও মিশল।
চোখে প্রায় জলই এসে যাচ্ছিল বিনুর। সেই সময় মোতাহার সাহেবের গলা শোনা গেল, তোমার নাম কী?
বিনু চমকে উঠল। বুকের ভেতরটা ভয়ানক দুলতে লাগল তার। কাঁপা গলায় বলল, বিনয়কুমার বসু–
বাবার নাম?
অবনীমোহন বসু
চোখ কুঁচকে মোতাহার সাহেব বলেন, শুধু অবনীমোহন বসু? বাবার নামের আগে একটা শ্ৰীযুক্ত বসাতে হয় তাও জানো না?
মুখ নিচু করে বসে রইল বিনু।
কলকাতায় কোন স্কুলে পড়তে?
সাউথ সাবারবনে—
কোন ক্লাস ছিল?
সেভেন।
তার মানে এইটে ভর্তি হবে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আচ্ছা, ওই ছবিটা কার বল তো?
চোখ তুলতেই বিনু দেখতে পেল, মোতাহার সাহেব ডানদিকের দেওয়ালে একটা ছবির দিকে আঙুল নির্দেশ করেছেন।
ছবির মানুষটিকে বিনু চিনত। বলল, উনি রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়—
গুড–বলেই আরেকটা ছবি দেখালেন মোতাহার সাহেব, উনি?
লালা লাজপত রায়।
আচ্ছা বলতে পার, বঙ্গভঙ্গ আন্দেলন কবে হয়েছিল?
ভাগ্য ভাল, উত্তরটা জানা ছিল বিনুর। তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ১৯০৫-এ—
ভেরি গুড—
নিঃশব্দে বসে ছিলেন হেমনাথ। হঠাৎ বলে উঠলেন, এ সব কী পরীক্ষা রে মোতাহার?
এগুলোই তো আসল পরীক্ষা দাদা’ মোতাহার সাহেব বলতে লাগলেন, দেশের ছেলে দেশের সত্যিকার খবর রাখে কিনা সেটা জানা দরকার।
একটু পড়াশোনার কথাও জিজ্ঞেস কর—
নিশ্চয়ই করব।
গোটা পাঁচেক ট্রানস্লেশন ধরলেন মোতাহার সাহেব, বিনু তিনটে পারল। অ্যালজেব্রার ফরমুলাগুলো ঠিক ঠিক বলল। বাংলা ব্যাকরণের উত্তরগুলোও নির্ভুল হল।
পরীক্ষা হয়ে যাবার পর মোতাহার সাহেব বললেন, বিনয়বাবু আমাদের বেশ ভাল ছেলে। স্কুল খুললে রোজ ক্লাস করবে, বুঝলে? একদিনও ফাঁকি দেবে না।
আজ্ঞে না–বিনু আধফোঁটা গলায় বলল। তারপর মাথা হেলাল।
হেমনাথ বললেন, ক্লাস এইটে ও পারবে তো?
মোতাহার সাহেব বললেন, নিশ্চয়ই পারবে। দেখবেন, স্ট্যান্ড করবে।
আরও কিছুক্ষণ এলোমলো কথার পর হেমনাথ বললেন, এবার তা হলে উঠি—
এখনই উঠবেন?
হ্যাঁ, ধানকাটা চলছে। একবার মাঠে যাওয়া দরকার। বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন হেমনাথ। তারপর হঠাৎই যেন কথাটা মনে পড়ে গেল। বিনুর দিকে ফিরে বললেন, মাস্টারমশাইকে প্রণাম কর।
মোতাহার সাহেবকে প্রণাম করে বিনু যখন উঠে দাঁড়াল, হেমনাথ আবার বললেন, এঁকে আজ প্রথম দেখলে, ভবিষ্যতে অনেক বার দেখবে। জীবনে এই মানুষটির মতো হবার চেষ্টা করো।
২.১১-১৫ ধানকাটার মধ্যে
ধানকাটার মধ্যে সময় করে একে একে সুধা, সুনীতি এবং ঝিনুককেও ভর্তি করে দিলেন হেমনাথ। সুধা সুনীতিকে কলেজে, ঝিনুককে মেয়েদের স্কুলে।
স্থির হয়েছে, আপাতত ঝিনুক এই বাড়িতেই থেকে যাবে। এখানে থেকেই লেখাপড়া করবে। পরে যা-হয় ভেবে ঠিক করা যাবে। ভবতোষও এতে রাজি হয়েছেন। না হয়ে উপায়ই বা কী? তার কলেজ খুলে গেছে। ফাঁকা বাড়িতে ঝিনুককে কার কাছে রাখবেন? কে তাকে দেখবে? সব দিক বিবেচনা করে এই ব্যবস্থাই ভবতোষের ভাল মনে হয়েছে।
সবাই ভর্তি টর্তি হয়ে যাবার দিনকয়েক পর এক সন্ধেবেলায় লারমোর এসে হাজির। এ বাড়িতে তাঁর অনিয়মিত যাতায়াত নিয়ে স্নেহলতার অভিমান আছে। অবশ্য সে অভিমানের ভেতর অভিযোগ নেই, স্নিগ্ধ কৌতুকের আভায় তা ঝলমলে।
অনেক দিন পর লারমোর আজ এ বাড়ি এলেন। দীর্ঘকাল না আসার জন্য যথারীতি অনুযোগ করলেন স্নেহলতা, ঠাট্টা-টাট্টাও করলেন।
