খরচ বলে খরচ। স্কুলের কত আর আয় বলুন। বেশির ভাগ ছেলেই তো ফ্রি, হাফ ফ্রি’তে পড়ছে–
হেমনাথ বললেন, একবার একটু কষ্ট করে পাকাপাকি বন্দোবস্ত করতে পারলে সব দিক থেকেই ভাল।
মোতাহার সাহেব বললেন, কিন্তু টাকা পাব কোথায়? আপনি তো জানেন, গভর্নমেন্ট থেকে একটা পয়সাও পাওয়া যাবে না।
কেন যাবে শুনি? সারা গায়ে কংগ্রেসের গন্ধ মাখিয়ে রেখেছিস, ইংরেজদের তাড়াবার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছিস। আর ওরা দেবে টাকা!
হাসতে হাসতে মোতাহার সাহেব বললেন, তাই ভাবছিলাম, দু’একদিনের ভেতর আপনার কাছে যাব।
পাকা ভুরু কুঁচকে হেমনাথ বললেন, আমার কাছে কেন?
শুরু কে কখনও বিমুখ হয়ে উদার হেমনাথ মিত্রের
আপনার কাছে ছাড়া আর কার কাছে যেতে পারি?
আমি বুঝি তোর স্কুলের জন্যে টাকার থলে নিয়ে বসে আছি?
তা জানি না।
তবে কী জানো শুনি?
মোতাহার সাহেব গম্ভীর গলায় বলেন, একটা কথাই জানি। তা হল, রাজদিয়ার হেমনাথ মিত্রের কাছে কোনও শুভ কাজের আর্জি নিয়ে গেলে কেউ কখনও বিমুখ হয়ে ফেরে না।
হেমনাথ বললেন, আমাকে তোরা কল্পতরু পেয়েছিস নাকি?
পেয়েছিই তো।
কিন্তু—
জিজ্ঞাসু চোখে মোতাহার সাহেব বললেন, কী?
চিন্তিত মুখে হেমনাথ বললেন, স্কুল বিল্ডিং করে দেবার মতো অত টাকা তো আমার নেই। অবশ্য একটা কাজ করা যেতে পারে–
কী কাজ?
সবার কাছ থেকে টাকা তোলা। যার যেমন সাধ্য সে তেমন দেবে। মোট কথা, একটা ফান্ড খোলা দরকার।
সে আপনি যা ভাল বোঝেন—
তুই কবে আমার বাড়ি যাচ্ছিস?
কবে যেতে বলেন?
যেদিন তোর খুশি—
পরশু সকালে যাব।
আচ্ছা।
একটু নীরবতা।
তারপর মোতাহার সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, যাক, আমার দুর্ভাবনা কাটল। স্কুলবাড়ি এবার হয়ে যাবেই।
হেমনাথ হাসলেন, স্কুলের কথা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে আমার ভালই লাভ হল দেখছি। তারপর তোর কংগ্রেসের খবর কী?
নিমেষে হাসি থেমে গেল। কপালে অসংখ্য রেখা ফুটল মোতাহার সাহেবের। গম্ভীর গলায় বললেন, খুবই সাঙ্ঘাতিক। খবরের কাগজে নিশ্চয়ই দেখেছেন ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্টে ছোট বড় সব নেতাই অ্যারেস্টেড। সত্যাগ্রহ শুরু হয়ে গেছে।
দেখেছি। তোর কী মনে হয়?
আমার তো মনে হয়, ভেতরে ভেতরে ইংরেজরা খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভেতরে যত কাবু হচ্ছে, বাইরে অত্যাচার ততই বেড়ে চলেছে।
তুই তো এখানকার কংগ্রেসের সেক্রেটারি। তোকে কি অ্যারেস্ট করবে?
বুঝতে পারছি না। তবে–
কী?
গেল সপ্তাহে দুতিন বার পুলিশ এসেছিল।
হেমনাথ বললেন, এখানে কি সত্যাগ্রহ শুরু করবি?
মোতাহার সাহেব বললেন, এখনও কিছু ঠিক করিনি। আরও কয়েক দিন দেখি। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হেমনাথ এবার শুধোলেন, যুদ্ধের হালচাল কেমন বুঝছিস মোতাহার?
খুব খারাপ। মিত্রশক্তি চারদিকেই মার খাচ্ছে। ইউরোপ আফ্রিকার কথা থাক, ইস্টার্ন ওয়ার্ল্ডের অবস্থাও ভাল নয়। আমার ধারণা, কলকাতায় যে কোনও দিন বোমা পড়তে পারে। কলকাতায় বোমা পড়া মানে সারা বাংলাদেশ তোলপাড় হওয়া। কী যে হবে!
সেদিন কাগজে পড়লাম, কলকাতায় ব্ল্যাক-আউটের মহড়া চলছে। এয়ার-রেডের সবরকম প্রিকশানও নেওয়া হয়েছে।
হ্যাঁ। ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন মোতাহার সাহেব।
হেমনাথ বললেন, তোর কী ধারণা, এ যুদ্ধে ইংরেজরা হারবে?
বলা মুশকিল। হারুক জিতুক, আমি একটা ব্যাপার দেখতে পাচ্ছি।
কী?
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা খুব বেশি দূরে নেই।
হঠাৎ তোর এ ধারণা হল?
মোতাহার সাহেব থেমে থেমে বলতে লাগলেন, হিটলারের বোমা খেয়ে খেয়ে ইংল্যান্ডের আর কিছু নেই। যতই ওরা গলা ফাটাক আমাদের কিছু হয়নি, লোক তা বিশ্বাস করে না। আমরা তো আর ঘাস খাই না, আসল ব্যাপারখানা মোটামুটি আন্দাজ করতে পারি। যুদ্ধ থেমে গেলে ইংল্যান্ডে রিকনস্ট্রাকশনের প্রশ্ন দেখা দেবে। তখন নতুন করে পোড়া ঘর তুলবে, না এতদূরে ইন্ডিয়ার কলোনি সামলাবে? অবশ্য–
কী?
এই হচ্ছে সব চাইতে বড় সুযোগ। আমাদের তা হাতছাড়া হতে দেওয়া উচিত নয়। একবার যদি এ সুযোগ আমাদের হাতের বাইরে চলে যেতে দিই, পরে আপসোস করেও কূলকিনারা পাব না।
হেমনাথ বললেন, সুযোগ বলতে?
মোতাহর সাহেব ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিলেন, ইংরেজ এখন যুদ্ধ নিয়ে অস্থির হয়ে আছে। ইউরোপে এশিয়ায়-আফ্রিকায়, যেদিকেই তাকানো যাক, শুধু বারুদের গন্ধ। এ সময় সমস্ত ভারতবর্ষ জুড়ে যদি একটা আন্দেলন করা যেত।
হেমনাথ বললেন, তোর কি ধারণা, শিগগিরই কোনও মুভমেন্ট শুরু হবে?
আমার তো তাই মনে হয়। এ সময় যদি মুভমেন্ট না করা যায় তবে আর কবে হবে? দেখা যাক, নেতারা কী করতে বলেন–
হেমনাথ এবার আর কিছু বললেন না। তার পাশে বসে দাদু আর মোতাহার সাহেবের কথা শুনছিল বিনু। অল্পস্বল্প বুঝতে পারছিল সে, তবে বেশির ভাগই অবোধ্য।
একটুক্ষণ চুপচাপ।
তারপর মৃদু হেসে মোতাহার সাহেব বললেন, দেশের কথা, কংগ্রেসের কথা এখন থাক। তখন কী একটা দরকারের কথা বলছিলেন যেন– বলতে বলতে হঠাৎ বিনুর দিকে নজর পড়ল, ছেলেটি কে হেমদাদা?
আমার নাতি।
কিরকম নাতি?
কিরকম, হেমনাথ বুঝিয়ে দিলেন।
মোতাহার সাহেব বললেন, শুনেছিলাম বটে, কলকাতা থেকে আপনার আত্মীয়স্বজন এসেছে। তা হলে এরাই?
হ্যাঁ।
এবার বলুন দরকারটা কী।
বিনুকে দেখিয়ে হেমনাথ বললেন, দরকারটা এর জন্যেই। ওকে তোর স্কুলে ভর্তি করতে এসেছি।
