পারব।
দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়ার পর হেমনাথের সঙ্গে স্কুলে রওনা হল বিনু। স্টিমারঘাট, বরফকল, মাছের আড়ত পেরিয়ে ল্যান্ড রেভিনিউ অফিসের গায়ে স্কুলবাড়িটা। নাম রাজদিয়া হাই স্কুল।
স্কুল বাড়িটাকে ঘিরে কোনও বিস্ময় নেই। টিনের চাল আর কাঁচা বাঁশের বেড়া লাগানো অসংখ্য ঘর সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো। সামনের দিকে প্রকান্ড মাঠ, সবুজ সতেজ ঘাসে ছেয়ে আছে। মাঠটার দু’ধারে বাঁশের গোলপোস্ট।
রাজদিয়ার এ প্রান্তে কতবার এসেছে বিনু, যাতায়াতের পথে দূর থেকে স্কুল-বাড়িটাকে দেখেছে। ভেতরে অবশ্য ঢোকেনি।
আজ হেমনাথের সঙ্গে সামনের মাঠখানা পেরিয়ে স্কুলের দিকে যেতে যেতে বুকের মধ্যেটা কেন যেন দুরু দুরু করতে লাগল বিনুর। হঠাৎ সে ডেকে উঠল, দাদু
কী রে– হেমনাথ মুখ ফিরিয়ে তাকালেন।
ভর্তি হতে হলে পরীক্ষা দিতে হবে, না?
নিশ্চয়ই দিতে হবে।
বিনু কী বলতে গিয়ে থেমে গেল। তার চোখমুখ দেখে কিছু অনুমান করলেন হেমনাথ। বললেন, আর কিছু বলবি?
হুঁ–
কী?
খানিক ইতস্তত করে বিনু বলল, হেডমাস্টার মশায়কে তুমি চেনো?
হেমনাথ বললেন, চিনব না কেন?
তুমি তাকে একটু বলবে–
কী বলব?
আমার পরীক্ষা যেন না নেন–
পূর্ণ দৃষ্টিতে হেমনাথ বিনুকে দেখলেন। তারপর খুব গম্ভীর গলায় বললেন, না। ওটা বলতে পারব না। ভর্তি হতে হলে পরীক্ষা দিতেই হবে।
বিনু চমকে উঠল। আশ্বিনের শুরুতে রাজদিয়া এসেছে তারা। এখন পৌষ মাস। হেমনাথের এমন কণ্ঠস্বর আগে আর কখনও শোনেনি সে।
.
২.১০
সামনের মাঠখানা পার হয়ে স্কুলবাড়ির বারান্দায় উঠলেন হেমনাথরা। লম্বা মাটির বারান্দা, তার শেষ প্রান্তে হেডমাস্টারের ঘর। সেখানে উঁচু টুলের ওপর দপ্তরী জাতীয় একটা লোক বসে আছে।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি এই সময়টা স্কুল বন্ধ। ক্লাসঘরগুলোতে তালা লাগানো রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী অ্যানুয়াল পরীক্ষা হয়ে যাবার কথা। খুব সম্ভব রেজাল্টও বেরিয়ে গেছে। ইংরাজি নতুন বছর না পড়লে নতুন করে ক্লাস শুরু হবে না। সারা বছর একটানা খাটুনির পর ক্লান্ত স্কুলবাড়িটার গায়ে এখন ছুটি আর আলসেমির আমেজ লেগেছে।
দূর থেকেই হেমনাথ চেঁচিয়ে ডাকলেন, এই উপেন—
টুলের ওপর থেকে দপ্তরীটা চকিত হয়ে উঠে দাঁড়াল, আইজ্ঞা—
হেডমাস্টার আছে রে?
উপেন বলল, আছেন–
কথা বলতে বলতে এগিয়ে এসেছিলেন হেমনাথ। বিনুকে সঙ্গে নিয়ে পর্দা ঠেলে হেডমাস্টারের ঘরে ঢুকলেন।
ঘরখানা প্রকান্ড। চারদিকে সারি সারি কাঁচের আলমারি। সেগুলোর ভেতর শুধু বই আর বই। আলমারিগুলোর মাথায় গ্লোব, ডাস্টার, ঝাড়ন, চকের বাক্স এবং অসংখ্য জিনিস সাজানো। দেওয়ালে দেওয়ালে মাহাপুরুষদের ছবি। গান্ধীজি রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্র বিবেকানন্দ তিলক বিদ্যাসাগর–এমনি অসংখ্য। তাদের কাউকে কাউকে চেনে বিনু, অনেকেই অচেনা।
রবীন্দ্রনাথের ছবিটার তলায় একটা গোলাকার বড় ঘড়ি। তার তলায় মস্ত একখানা টেবিল। টেবিলের এধারে অনেকগুলো কাঠের চেয়ার। ওধারে একটি মাত্র চেয়ারে যিনি বসে আছেন তাঁর বয়স ষাটের কাছাকাছি। পরনে মোটা খদ্দরের ধবধবে পাজামা এবং পাঞ্জাবি। চোখে পুরু লেন্সের গোল চশমা।
ভদ্রলোকের গায়ের রং টকটকে, ধারাল নাক, তীক্ষ্ণ চিবুক। দীর্ঘ চোখ দু’টি অত্যন্ত সজীব, দূরভেদী। মুখময় কাঁচাপাকা দাড়ি। মাথাটা কিন্তু একেবারেই সাদা, একটি কালো চুলও সেখানে খুঁজে বার করা যাবে কিনা সন্দেহ। এই বয়সেও মেরুদন্ড আশ্চর্য ঋজু, চামড়ায় তেমন ভাজ পড়েনি।
ঘরে আর কেউ ছিল না। বিনু বুঝতে পারল, ইনিই হেডমাস্টার। তার বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগল।
হেমনাথকে দেখে হেডমাস্টার উঠে দাঁড়লেন। একটু অবাক হয়ে বললেন, হেমদাদা যে—
হেমনাথ হাসলেন, খা, আমিই—
হেডমাস্টার বললেন, আপনি হঠাৎ স্কুলে?
সাধে কি আর এলাম রে, দরকারে আসতে হল। তারপর কেমন আছিস মোতাহার?
ওই একরকম। আপনি?
খুব ভাল। কখনও আমি খারাপ থাকি?
তা বটে। হেডমাস্টার অর্থাৎ মোতাহার সাহেব হাসলেন, কতকাল আপনাকে দেখছি। খারাপ আছেন, এমন কথা কক্ষণো শুনিনি। বলতে বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, এ কি হেমদাদা, দাঁড়িয়ে কেন? বসুন–বসুন–
হেমনাথ বসলে মোতাহার সাহেব বসলেন। বিনুও নিঃশব্দে দাদুর গা ঘেঁষে বসে পড়ল।
হেমনাথ বললেন, ব্যাপার কী রে? স্কুলে ছুটি, তুই একা একা এখানে কী করছিলি?
নতুন বছরের বুক লিস্টটা এখনও তৈরি হয় নি। তা-ই করছিলাম।
স্কুল কতদিন বন্ধ থাকবে?
জানুয়ারির দু’তারিখ পর্যন্ত।
তারপর অন্য সব খবর টবর কী?
কোন খবর জানতে চান, বলুন—
একটু ভেবে হেমনাথ বললেন, তোর খবর তো মোটে দুটো। এক কংগ্রেস আর এই স্কুল।
মোতাহার সাহেব কিছু বললেন না, চশমার কাঁচ মুছে গভীর দৃষ্টিতে হেমনাথের দিকে তাকালেন।
হেমনাথ থামেননি, বিয়ে করলি না, শাদি করলি না, ঘর নেই, সংসার নেই। চিরটা কাল স্কুল আর কংগ্রেস নিয়েই থাকলি।
মৃদু গলায় মোতাহার সাহেব বললেন, কিছু একটা নিয়ে থাকতে হবে তো। সত্যি বলছি হেমদাদা, স্কুল আর কংগ্রেস ছাড়া আমি আর কিছু ভাবতেই পারি না। বলে হাসলেন।
হেমনাথ বললেন, অনেক দিন তোর কাছে আসা হয়নি। তা স্কুল কেমন চলছে?
ভালই। তবে—
কী?
আমার বড় ইচ্ছা স্কুলবাড়িটা পাকা হোক–
মোতাহার সাহেবের কথা শেষ হবার আগেই হেমনাথ বলে উঠলেন, এক শ’ বার হওয়া উচিত। দু’চার বছর পর পর বর্ষায় কাঁচা বাঁশের বেড়া নষ্ট হয়ে যায়, মাটির ভিত ধসে যায়। সে সব কতবার তো পালটালি। বার বার কামলা লাগিয়ে খরচও তো কম হয় না।
