কাজের ফাঁকে ফাঁকে গান কিংবা গল্প। গানে গানে, গল্পে গল্পে বেলা দুপুর হয়ে যায়। শীতের সূর্য খাড়া মাথার ওপর এসে ওঠে। এ সময়টা ধানকাটা বন্ধ রেখে লোকগুলো পাশের একটা খাল থেকে হাত-মুখ ধুয়ে, ভাতের পাতিল খুলে, আলের ওপর সারি সারি খেতে বসে যায়।
দুপুরবেলায় হেমনাথ মাঠে থাকেন না। অবনীমোহন আর বিনুকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। জিরোবার সময় নেই। কোনওরকমে চান-খাওয়া সেরেই আবার ধানখেতে ছোটেন। এ বেলাও অবনীমোহন এবং বিনু তার সঙ্গে সঙ্গে যায়।
সূর্যটা পশ্চিম আকাশের ঢাল বেয়ে খানিক নেমে গেলেই ধানকাটা বন্ধ করে দেয় লোকগুলো। তখন ফেরার পালা। সকাল থেকে একটানা পরিশ্রমে যে শস্য কেটে কেটে স্থূপাকার করা হয়েছিল, কৃষণেরা এবার তা মাথায় নিয়ে বাড়ির পথ ধরে। একবারে তো এত ফসল নিয়ে যাওয়া যায় না। তাই বার বার তাদের মাঠে আসতে হয়।
সমস্ত শস্য বাড়ি নিয়ে তুলতে সন্ধে নেমে যায়। তারপর পুকুরে হাত-পা ধুয়ে এসে লোকগুলো উত্তর আর দক্ষিণের ঘরে বসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেয়।
সারাদিন তো কাছে কাছেই থাকে, বাড়ি ফিরেও তাদের সঙ্গ ছাড়ে না বিনু। উত্তর কি দক্ষিণের ঘরে গিয়ে ওদের কথা শোনে।
লোকগুলোকে সারাদিন দেখেও বিনুর বিস্ময় কাটে না। কোথায় কতদূরে তাদের দেশ, কে জানে। ঘর-সংসার ছেলেমেয়ে ফেলে শুধু দুমুঠো ভাতের জন্য তারা এখানে পড়ে আছে। কতদিন ওরা বাড়ি নেই, বাবাকে না দেখে ওদের ছেলেমেয়েদের মন খারাপ হয়ে যায় না? বিনু ভাবতে চেষ্টা করে।
সমস্ত দিন তো কথা বলার ফুরসত নেই। সন্ধেবেলা মাঠ থেকে ফেরার পর লোকগুলো বিনুর সঙ্গে গল্প জুড়ে দেয়।
বছির বলে, অ বাবুগো পোলা—
বিনু তক্ষুণি সাড়া দেয়, কী বলছ?
আপনের নাম কী?
বিনু–বিনয়কুমার বসু।
বড় বাহারের নাম। বছির বলতে থাকে, কিষাণগো কাম আপনের ভাল লাগে?
বিনু ঘাড় হেলিয়ে বলে, হ্যাঁ।
আমাগো লগে ধান নি কাটবেন?
বিনু উত্তর দেবার আগেই ওধার থেকে বুড়ো খলিল বলে ওঠে, কী যে কস বছিরা, বাবুগো পোলায় ধান কাটব কোন দুঃখে? লিখাপড়া শিখা দারোগা হইব, ম্যাজিস্টর হইব।
বছির বলে, আমি তামসা করলাম স্যান–
এমনি টুকরো টুকরো কথা। কথায় কথায় শীতের রাত ঘন হতে থাকে। উত্তরে বাতাস বাগানের গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে শনশনিয়ে ছুটে যায়। কোথায় যেন কালাবাদুড় ডানা ঝাঁপটায়, রাতজাগা পাখিরা গাঢ় গলায় খুনসুটি করে। ভারী কুয়াশা জমে জমে চারদিক ঝাঁপসা হয়ে যায়।
হঠাৎ একসময় খেয়াল হতে ব্যস্তভাবে কেউ বলে ওঠে, রাইত মেলা হইল, আর কত গপ করবি? ভাত বসাইতে হইব না?
সবাই চকিত হয়ে উঠে পড়ে।
ওদিকে ভেতর-বাড়ি থেকে স্নেহলতার গলা ভেসে আসে, বিনু–বিনু, খাবি আয়—
লাফ দিয়ে উত্তর কি দক্ষিণের ঘর থেকে বেরিয়ে বিনু ছুট লাগায়।
.
শুধু হেমনাথের জমিতেই নয়, চকের পর চক জুড়ে এখন ধানকাটা চলছে। শীতের নিস্তেজ রোদেও কৃষাণদের হাতের কাস্তেগুলো ঝকমক করতে থাকে।
হেমনাথের জমির পশ্চিমে রামকেশবের জমি, উত্তরে লারমারের। ধানকাটা তদারক করার ফাঁকে ফকে লারমার আর রামকেশব গল্প করতে আসেন।
রামকেশব বলেন, এইবার ফলন বেশ ভাল।
হেমনাথ আর লারমোর মাথা নাড়েন, হ্যাঁ—
আমার পঞ্চাশ কানি জমিতে কম করে পাঁচ শ’ মণ ধান উঠবে।
হেমনাথ বলেন, অত ধান নিয়ে কী করবি?
রামকেশব বলেন, বছরের খোরাকি রেখে বাকিটা বেচে দেব।
আমারও তাই ইচ্ছে। তা দরটর কেমন শুনছিস?
দর বেশ তেজী। সেদিন নিত্য দাসের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, সে বলল।
বাজার তেজী থাকলে ভালই। দুটো পয়সা হাতে আসবে। হেমনাথ বলতে থাকেন, তবে একটা কথা।
কী? জিজ্ঞাসু চোখে তাকান রামকেশব।
আমাদের তো সুবিধেই। কিন্তু যাদের জমিজমা নেই, শরীরের খাটুনিই ভরসা, তারা খুব মুশকিলে পড়ে যাবে।
একটু নীরবতা।
একসময় হেমনাথ বলেন, যা হবার তা হবে। তারপর লালমোহন—
বল– লারমোর মুখ তুলে তাকান।
খুব তো ধানখেতে এসে বসে আছ, তোমার রোগীরা ছাড়লে? হাটে যাচ্ছ না আজকাল?
হেমনাথের কোনও নেশা নেই। চা-পান-বিড়ি-সিগারেট কিছুই খান না। রামকেশবও তা-ই। লারমোর কিন্তু নেশার জিনিসটা হাতে পেলে ছাড়াছাড়ি নেই। পেলেন তো দিনে দশ বার চাই খেলেন। বান্ডিল বান্ডিল বিড়ি শেষ করলেন। না পেলেন তো বছরখানেক কিছুই খেলেন না।
আলে কৃষাণদের হুঁকো-কলকে-তামাক, সব কিছু মজুদ থাকে। পরিপাটি করে এক ছিলিম তামাক সেজে আয়েস করে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে লারমোর বলেন, ধানকাটার জন্যে কদিন রোগীদের কাছ থেকে ছুটি নিয়েছি। বলেছি, তেমন জরুরি কেস থাকলে গির্জায় আসে যেন। বুঝতেই তো পারছ, এই সময়টা ধান টান ঠিকমতো তুলতে না পারলে সারা বছর না খেয়ে থাকতে হবে।
হেমনাথ হাসেন, ত্যাগব্রতী হলে কী হবে, আসল ব্যাপারে টনটনে—
লারমোর জোরে জোরে মাঠ কাঁপিয়ে হাসতে থাকেন, যা বলেছ।
.
ধানকাটার মধ্যেই একদিন সময় করে নিলেন হেমনাথ। বললেন, আজ বিনুদাদা আর আমি মাঠে যাব না। কৃষাণদের নিয়ে অবনী একলা যাবে।
অবনীমোহন শুধোলেন, আপনার কোনও কাজ আছে?
হ্যাঁ।
কী?
আজ বিনুদাদাকে স্কুলে ভর্তি করতে নিয়ে যাব।
হঠাৎ যেন কথাটা মনে পড়ে গেছে, এমনভাবে অবনীমোহন বললেন, ও হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি তো একেবারে ভুলেই গিয়েছিলাম।
হেমনাথ বললেন, তুমি মাঠে গিয়ে একালা অতগুলো লোককে সামলোতে পারবে তো?
