সকালে খাওয়া হলে আর এক দণ্ডও বসে থাকে না লোকগুলো। ধানকাটা কঁচি, ভাতের পাতিল আর তামাকের যাবতীয় সরঞ্জাম নিয়ে ঝাঁক বেঁধে বেরিয়ে পড়ে। হেমনাথ, অবনীমোহন আর বিনুও রোজ তাদের সঙ্গে চলে যায়। ধানকাটা শুরু হতেই লেখাপড়া একরকম বন্ধ করে দিয়েছে বিনু।
এমনিতে কোনও রাস্তা নেই। জমির আলের ওপর দিয়ে পথ। পথের ঘাস শিশিরে ভিজে থাকে। পৌষ মাসের সকালে তার ওপর দিয়ে যেতে যেতে পা শিরশির করতে থাকে বিনুর। অঘ্রাণের মাঝামাঝি থেকেই উত্তুরে হাওয়া ছাড়তে শুরু করেছিল। পৌষ মাসে তার যেন দাঁত বেরিয়েছে। শরীরের যে জায়গাগুলো ভোলা, বাতাস যেন সেখানে কেটে কেটে বসে।
যতখানি সম্ভব বিনুরা দামী গরম জামা-কাপড়ে গা মুড়ে আসে। কিন্তু ধানকাটা এই লোকগুলোর বড় কষ্ট। আচ্ছাদন বলতে লুঙ্গি আর মার্কিন কাপড়ের পিরহানের ওপর জ্যালজেলে চাদর। অনেকে আবার চাদরটাও জোটাতে পারেনি। পৌষ মাসের শীতল প্রভাতে খোলা আকাশের তলায় হু হু উত্তরে বাতাসের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে লোকগুলো হি-হি করে কাঁপতে থাকে। রোদ থেকে যে ভরসা পাবে তারও উপায় নেই। এই শীতে সূর্যালোক বড় কৃপণ, বড় কুণ্ঠিত, বড় নিস্তেজ। যদিও রোদ উঠে যায়, কাছে-দূরে কুয়াশার পর্দাগুলো ঝুলতে থাকে। কুয়াশার জন্য পরিষ্কার কিছুই চোখে পড়ে। উত্তরের চক, দক্ষিণের চক, পুব-পশ্চিমের আদিগন্ত ধানের খেত-সব কিছুই ঝাঁপসা, নিরবয়ব।
যেতে যেতে লোকগুলো বলাবলি করে, এই বছর বেজায় শীত। জবর হিয়ল (কুয়াশা)।
হ।
হাত-পাও কালাইয়া (শীতে জমে যায়) যায়।
হ।
সুজনগুঞ্জের হাট থন একখান চাদর যদি কিনতে পারতাম।
চাদরের যা দাম!
কত?
আড়াই ট্যাহা, তিন ট্যাহা—
হায় আল্লা, অত ট্যাহা কই পামু।
একটু চুপচাপ।
তারপর কে একজন ডেকে ওঠে, বছির ভাই–
বছির নামে লোকটি তক্ষুনি সাড়া দেয়, কী কও তাহের ভাই–
তাহের বলে, ধান কাটতে বাইর হওনের সোময় ছোট মাইয়াটার ধুম জ্বর দেইখা আইছিলাম—
হ।
অহন ক্যামন আছে, ক্যাঠা (কে) জানে।
মনখান খারাপ লাগে?
হ।
মাইয়ার ব্যারাম, তোমার বাইরন (বার হওয়া) ঠিক হয় নাই।
বিষণ্ণ গলায় তাহের বলে, তুমি তো কইলা বাইরন ঠিক হয় নাই। কইয়াই খালাস। কিন্তুক–
কী? জিজ্ঞাসু সুরে বছির শুধোয়।
তাহের বলে, ধানকাটা হইয়া গ্যালে তিন মণ ধান পামু। লুঙ্গি গামছা পামু দুইখান কইরা। মাইয়া লইয়া ঘরে বইসা থাকলে কে আমারে এই হগল দিব? এই ধানটা পাইলে দুই মাসের লেইগা নিশ্চিন্তি–
তয় আড়বুইঝার (অবুঝ) লাখান কথা কইতে আছিলি যে বড়। মাইয়া বাচুক-মারুক, এইটা কি আমাগো ঘরে বইসা থাকনের সোময়?
না।
বাইচা থাকলে মাইয়া লইয়া পরে সুহাগ করন যাইব।
হ।
একটু চুপ করে থেকে বছির বলে, তোমার মাইয়ার কথায় আমার একখান কথা মনে পড়ল তাহের ভাই–
তাহের বলে, কী?
আহনের সোময় বিবির হাতে তিনখান ট্যাহা দিয়া আইছিলাম। ঘরে আছিল তিন পাসারি চাউল, দুই স্যার তিল আর এক আগইল (ধামা) কাঐনের (কাউনের) চাউল। দুইটা মাস চাইরটা পোলা লইয়া ক্যামনে যে চালাইব!
তাহের উত্তর দেয় না।
বছির আবার বলে, ঘরে এক টুকরা সোনা দানা নাই যে বেইচা, কি বান্ধা দিয়া দুইটা পয়সা পাইব! কী যে করব বউটা!
তাহের এবার বলে, ভাইবা কী করবা? পথ আছে কুনো? শুদাশুদি মন খারাপ। তার থনে যা করতে আছ, কর।
ধানকাটা লোকগুলোর টুকরো টুকরো ঘর সংসারের কথা শুনতে শুনতে একসময় বিনুরা জমিতে এসে পড়ে।
ধানখেতে এসে প্রথমে লোকগুলো এক ছিলিম করে তামাক খেয়ে গা গরম করে নেয়। তারপর জামাটি খুলে সযত্নে গাছের ডালে ঝুলিয়ে লুঙ্গিতে মালকোচা মারে, তারও পর খাঁজকাটা বাঁকানো ধারাল কাস্তেটি হাতে নিয়ে জমিতে নামে। শুরু হয়ে যায় ধানকাটা। সমস্ত মাঠ জুড়ে শব্দ ওঠে খসর-খ। গোড়া থেকে খড়সমেত ধানের গোছা কেটে একেক জন একেক জায়গায় স্থূপাকার। করতে থাকে।
হেমনাথের বসবার সময় নেই। মাঠময় ঘুরে ঘুরে তিনি ধানকাটা তদারক করতে থাকেন। অবনীমোহন আর বিনুও বসে থাকে না। হেমনাথের পিছু পিছু ঘুরতে থাকে।
কিছুক্ষণ নিঃশব্দে ধানকাটার পর নতুন লোকগুলোর ভেতর থেকে কেউ হয়তো বলে ওঠে, মুখ বুইজা কাম করন যায় না। এই ছ্যামরারা একখান গীত ধর
সঙ্গে সঙ্গে তালমাত্রাহীন বেসুরো গলায় গান শুরু হয়ে যায়।
দোহাই আল্লা মাথা খাও
হামাক ফেইল্যা কই বা যাও
বিদ্যাশ গ্যালে এবার তুমার
সঙ্গ ছাড়ম না–আ-আ—
পো নাই মোর, মাও নাই,
একলা ঘরে কাল কাটাই,
গোসা করলে আর তো
আমি ছালুন রাম না–আ-আ-আ–
নয়া শীতের জারেতে
যাইবা যহন ধান দাইতে,
তুমার কচি-ক্যাথা, হক্কা-তামুক
দিমু না–আ-আ-আ–
খসম আমি তুমার
সঙ্গ ছাড়ম না-আ-আ-আ–
নিদয় হইলে মানুষ পাইবা
পিরীত পাইবা না–আ-আ-আ—
রোজই অবশ্য গান হয় না। কোনও কোনও দিন অল্পবয়সী ছোকরারা দলের সব চাইতে বর্ষীয়ান কৃষাণটিকে ডেকে বলে, একখান কিচ্ছা কও খলিল চাচা।
খলিল বলে, কী কিচ্ছা শুনবি?
হেই ‘গুলেবাখালি’ রাজকইন্যার—
রাজকইন্যার কিচ্ছায় বড় রস, না?
ছোকরারা কিছু বলে না, শব্দ করে হাসতে থাকে শুধু।
বুড়ো খলিল ধবধবে দাড়ি আর শীৰ্ণ হাত নেড়ে গল্প জুড়ে দেয়, এক আছিল রাজকইন্যা। তার চিকন চিকন চুল, চাম্পা ফুলের লাখান বন্ন (রং), মুক্তার লাখান দাঁত। হেয় হাসলে হাজারখান চান্দ য্যান ঝলমলাইয়া ওঠে–
