হেমনাথও হাতজোড় করে বললেন, আদাব। তারপর কী খবর বল। আজই এলে নাকি?
জি– সবার প্রতিনিধি হিসেবে বুড়ো লোকটা বলল, দেরি নি হইয়া গেল কত্তা?
না। ঠিক সময়েই এসেছ?
ধানকাটা কামলা রাখেন নাই তো?
না। তবে আজকালের মধ্যে তোমরা না এলে অন্য লোক দেখতে হত।
নসিব ভাল, আইজই আমরা আইছি। তা ধানাকাটা আরম্ভ হইব কবে?
এসেই যখন পড়েছ, কাল থেকেই আরম্ভ করব ভাবছি।
হেই ভালা। আইলসা বইসা থাইকা লাভ কী?
হেমনাথ শুধোলেন, তোমরা ক’জন এসেছ?
বুড়ো লোকটা জানাল, পঁচিশ জন।
ঠিক আছে। পঁচিশ জনই আমার দরকার। হেমনাথ গলা তুলে ডাকলেন, যুগল, যুগল–
যুগল বার-বাড়ির দিক থেকে ছুটে এল। হেমনাথ দলটাকে দেখিয়ে বললেন, এদের থাকার ব্যবস্থা করে দে।
আরেক প্রস্থ আদাব জানিয়ে লোকগুলো যুগলের সঙ্গে চলে গেল।
অবনীমোহন অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বললেন, এরা কারা?
হেমনাথ বললেন, চরের কৃষাণ।
আপনি জানতেন, ওরা আসবে?
জানতাম। প্রত্যেক বছরই ওরা আসে। হেমনাথ এরপর যা বললেন, সংক্ষেপে এইরকম।
অঘ্রাণের শেষাশেষি ধলেশ্বরীর চরগুলো থেকে এবং সুদূর ভাটির দেশ থেকে দলে দলে ভূমিহীন গরিব কৃষাণ রাজদিয়ার দুয়ারে দুয়ারে এসে হানা দেয়। ফি বছরই এই সময়টা ওরা এখানে আসে। শুধু অঘ্রাণেই না, বৈশাখ-জষ্ঠি-আষাঢ়ে-ধান-পাট রোয়ার দিনগুলোতেও আসে। দরকার মতো সম্পন্ন গৃহস্থেরা তাদের কাজে লাগায়, সাময়িক প্রয়োজন ফুরোলে তারা আবার দল বেঁধে ফিরে যায়। যে লোকগুলোকে আজ হেমনাথ রেখেছেন তারাও নির্ভুম, নিরন্ন চাষী।
অবনীমোহন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। এই বিশাল দেশে যেখানে এত প্রাচুর্য, জিনিসপত্র এত অকল্পনীয় রকমের শস্তা, সেখানেও মানুষের দুমুঠো ভাত জোটে না? পূর্ব বাংলার দিগদিগন্ত জুড়ে ফসলের মাঠ ছড়ানো। অথচ এদেশে বেশির ভাগ মানুষই নাকি ভূমিহীন। অবনীমোহন আরও জানতে পারলেন, জমিজমাগুলা বড় বড় গৃহস্থের বাড়িতে বছরে মোটে চার মাসের মত তারা কাজ পায়।
অবনীমোহন শুধোলেন, বাকি আট মাস ওদের কিভাবে কাটে?
আন্দাজ কর না– হেমনাথ হাসলেন।
বুঝতে পারছি না।
হেমনাথ এবার বিশদভাবে বুঝিয়ে দিলেন। চার মাস লোকের জমিতে ধান-পাট বুনে এবং খেটে ওদের কাটে। সারা বছরে এই সময়টাই যা একটু সুখের মুখ ওরা দেখতে পায়। একমাস কাজ করে পানের বরজ-এ। মাস দুয়েকের মতো মুত্রা আর বাঁশ দিয়ে ধামা কুলো-পাটি, এই সব বুনে হাটে হাটে বেচে। তা ছাড়া, খালে-বিলে-নদীতে মাছমারা তো আছেই। জীবনধারণের জন্য তাদের নির্দিষ্ট সম্মানজনক কোনও জীবিকা নেই, আছে হাজার রকমের উঞ্ছবৃত্তি।
হেমনাথ বলে যাচ্ছিলেন, দু’চারটে মাস বাদ দিলে দুর্ভিক্ষ ওদের নিত্য সঙ্গী। কত কষ্টে যে ওরা দিন কাটায় ভাবতে পারবে না।
একটু ভেবে অবনীমোহন বললেন, আমার ধারণা ছিল, এদেশের সব মানুষ খুব সুখে আছে।
ধারণাটা ঠিক নয়।
তাই তো দেখছি।
একটু নীরবতা। তারপর অবনীমোহনই আবার শুরু করলেন, এত প্রচুর ফসল এদেশে, এত শস্তাগণ্ডা, তবু লোকে খেতে পায় না! আশ্চর্য ব্যাপার।
হেমনাথ আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন। আবছা গলায় বললেন, সত্যিই আশ্চর্য।
আচ্ছা মামাবাবু—
বিল—
এভাবে এত কষ্টের ভেতর কতদিন মানুষ বাঁচতে পারে?
বংশ পরম্পরায় ওরা বেঁচে আছে। আমাদের সমাজ-ব্যবস্থাই এইরকম। কী আর করা যাবে!
অবনীমোহন উত্তর দিলেন না।
একধারে চুপচাপ বসে দাদু আর বাবার কথাগুলো শুনছিল বিনু। সব বোঝে নি সে। তবু গরিব ওই মানুষগুলোর জন্য অসীম দুঃখে তার বুক ভারী হয়ে গেল।
পাঁচশ জন লোক রেখেছেন হেমনাথ। তারা সবাই ধলেশ্বরীর চর থেকে এসেছে। উদয়াস্ত খাটলেও এক শ’ কানি জমির ধান কাটতে, সেই ধান ঝেড়ে শুকিয়ে ডোলে তুলতে কম করে মাস দুই লাগবে। নতুন লোকগুলো ততদিন এখানেই থাকবে। অর্থাৎ ফিরে যেতে যেতে তাদের সেই ফাল্গুন মাস।
যতদিন ধানকাটা চলবে ততদিন খোরাকি পাবে লোকগুলো। মুজরি হিসেবে টাকাপয়সা অবশ্য দেবেন না হেমনাথ, দু’মাস পর দেশে ফেরার সময় প্রত্যেককে তিন মণ করে ধান, দু’খানা করে নতুন লুঙ্গি আর গামছা দেবেন।
উত্তর আর দক্ষিণের দু’খানা ঘর লোকগুলোকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা তাদের নিজেদের। অবশ্য চাল-ডাল-তেল-মশলা স্নেহলতা পাঠিয়ে দেন। রান্নাবান্না ওরা করে নেয়।
.
লোকগুলো কাজে লাগবার পর থেকেই ছায়ার মতো বিনু তাদের সঙ্গে সঙ্গে আছে। ভোরবেলা উঠেই কাঠকুটো জ্বেলে ওরা রান্না চড়িয়ে দেয়। তারপর উনুনের চারধারে গোল হয়ে বসে হাত পা সেঁকতে থাকে। তখনও কুয়াশা আর হিমে চারদিক ঝাঁপসা, সূর্যের তো দেখাই পাওয়া যায় না। তার বদলে আকাশের দূর প্রান্তে প্রভাতিয়া তারাটা জ্বলজ্বল করতে থাকে।
ওদের ওঠার আওয়াজ পেয়েই আজকাল ঘুম ভেঙে যায় বিনুর। ধড়মড় করে বিছানা থেকে উঠে পড়ে। প্রতিদিনই উঠে সে দেখে, হেমনাথ বসে আছেন। এমনিতেই হেমনাথ তাড়াতাড়ি ওঠেন। ইদানীং ধানকাটা শুরু হবার পর তাঁর চোখ থেকে ঘুম গেছে। সারারাত বোধহয় জেগেই থাকেন।
তাড়াতাড়ি দাদুর সঙ্গে সূর্যবন্দনা সেরে সকালবেলার খাবার খেতে খেতে রোদ উঠে যায়। শীতের নিরুত্তাপ, স্তিমিত রোদ।
এদিকে অবনীমোহনও উঠে পড়েন। ওদিকে লোকগুলোর খাওয়াও হয়ে যায়। সকালবেলায় অবশ্য ওরা ভরপেট খায় না। নাকেমুখে দু’চার গরাস কোনও রকমে খুঁজে বাকি ভাত-তরকারি আর নুন লঙ্কা-পেঁয়াজ মেটে পাতিলে ভরে গামছায় বেঁধে নেয়।
