যুগল ঘাড় গুঁজে এক মনে নখ খুঁটে যাচ্ছিল, আরও ঝুঁকে পড়ল সে, জবাব দিল না।
হেমনাথ বললেন, লজ্জায় তো একেবারে গেলি! তাড়াতাড়ি বল, কাল থেকে কামলা লাগাব।
যুগল আর বসে থাকতে পারল না, উঠে বার-বাড়ির দিকে দৌড় লাগাল।
হেমনাথ হেসে উঠলেন, দেখাদেখি অন্য সবাইও হাসল।
সেইদিনই ঘুরে ঘুরে যুগলের ঘরের জন্য জায়গা ঠিক করে ফেললেন হেমনাথ। দক্ষিণের ঘরের গা ঘেঁষে পেঁকিঘর। তার পেছন দিকে কইওকড়া আর চোখ-উদানে গাছের ঝুপসি জঙ্গল। স্থির হল, এই জায়গাটা সাফ-টাফ করে কাল থেকে ঘর ভোলা হবে। পঁচিশের বন্দ’র মস্ত ঘর।
হেমনাথ যা বলেছিলেন তাই করলেন। পরের দিনই মজুর লাগিয়ে দিলেন।
ঢেঁকিঘরের পাশে যুগলের জন্য নতুন ঘর উঠতে লাগল। আর এদিকে হেমনাথ তাঁর পুকুরে মাঝধরা’ দিলেন।
অঘ্রাণ মাসের শুরু থেকেই এদেশের পুকুরগুলো খারাপ হয়ে যায়। যত কচুরিপানা, টোপাপানা, বাইচা (এক জাতের জলজ আগাছা)। সব পচতে শুরু করে। ফলে জল যায় নষ্ট হয়ে, তার রংও যায় বদলে। কালচে দুষিত জল থেকে দুর্গন্ধ উঠতে থাকে। এই সময় জলের ভেতর মাছেদের বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। পাবদা-ট্যাংরা-ফলুই-নলা-গরমা-বোয়াল-বজুরি-ভাগনাআঁক বেঁধে পুকুরের সব মাছ জলতল থেকে আধমরার মতো ওপরে উঠে ভাসতে থাকে। এদেশে একে বলে, মাঝ গাবানো।
মাছ গাবাতে শুরু করলে ধরে ফেলতেই হবে। নইলে জলজ আগাছার সঙ্গে মাছ মরে পচতে থাকলে আবহাওয়া বিষাক্ত হয়ে উঠবে। কিন্তু একসঙ্গে এত মাছ দিয়ে কী হবে? তাই বড় বড় গৃহস্থরা মাছধরা দেয়। রাজ্যের লোক জুটিয়ে এনে গাবানো মাছ’ ধরিয়ে ফেলে। যে যতটা ধরতে পারে সবটাই তার। এর জন্য পুকুরের মালিককে ভাগ দিতে হয় না।
‘মাছধরা’ দিলে দুদিক থেকে সুবিধে। এক, মরা আধমরা মাছগুলো জল থেকে হেঁকে আনা যায়। দুই, অসংখ্য মানুষ মাছধরার ফলে পুকুরের সমস্ত আগাছা যায় সাফ হয়ে।
‘মাছধরা’ দেবার জন্যে ঢেঁড়া দিতে হয় না। দু’চারজনের কানে তুলে দিলেই হল। তারাই খবরটা দিগদিগন্তে পৌঁছে দেয়।
একদিন সকালবেলা বিনু দেখল কয়েক শ মানুষ পলো, ধর্মজাল, ঝাঁকিজাল নিয়ে তাদের পুকুরে এসে পড়েছে। তারপর সমস্ত দিন ধরে জল তোলপাড় করে চলল মাছধরা। মানুষের সঙ্গে মাছরাঙা আর শঙ্খচিলেরাও মাছ ধরবার জন্য পাল্লা দিতে লাগল।
বেলা একটু বাড়লে বিনুও বায়না ধরে যুগলের সঙ্গে পুকুরে নামল। এবং কী আশ্চর্য, সারা গায়ে জল আর পাঁক মেখে দুটো মেনি আর একটা সরপুঁটি মাছ ধরেও ফেলল।
শুধু হেমনাথের পুকুরেই না। পর পর ক’দিন রাজদিয়ায় আরও অনেক পুকুরে মাছধরা চলল। যুগলের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সে সব জায়গা থেকেও মাছ নিয়ে এল বিনু।
.
দেখতে দেখতে পৌষ মাস পড়ে গেল।
আশ্বিনের শুরুতে মাঠময় শুধু ছিল জল। অথৈ অপার সমুদ্র হয়ে শরতের মাঠ দিগদিগন্ত জুড়ে দুলতে থাকত। তার ওপর আমন ধানের চারাগুলো মাথা তুলে ছিল। তখন যেদিকে চোখ যেত, সবুজ আর সবুজ।
কার্তিকের গোড়াতেই জলে টান ধরেছিল। পৌষ মাস পড়তে না পড়তেই মাঠ একেবারে শুকনো, এক ফোঁটাও জল নেই। অবশ্য মাটি এখনও নরম, কোথাও কোথাও কাদা জমে আছে।
তবে সব চাইতে বিস্ময়কর যা, তা হল ধানগাছগুলো। কোন এক জাদুকরের ছোঁয়ায় সেগুলো এখন সোনা হয়ে গেছে। মাঠের ঝাপি ফসলের লাবণ্যে ভরে উঠেছে।
হেমনাথ একদিন বললেন, আর দেরি করা যাবে না। দু’একদিনের মধ্যে ধানকাটা শুরু করতে হবে।
একটু চিন্তা করে অবনীমোহন বললেন, কিন্তু মামাবাবু—
হেমনাথ জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন।
অবনীমোহন বলতে লাগলেন, আপনার জমি এক শ’ কানির মত। বার মাসের লোক বলতে মোটে দু’জন-যুগল আর করিম। দুটো লোকের পক্ষে এত জমির ধান কেটে ঘরে তোলা অসম্ভব। আরও কয়েকজন তো দরকার।
হেমনাথ কিন্তু আদৌ চিন্তিত নন। ব্যাপারটা যেন কোনও সমস্যাই নয় এমনভাবে বললেন, তা তো দরকার।
দু’একদিনের মধ্যে যদি ধানকাটা শুরু করেন, অন্তত আজকালের ভেতর লোকজন যোগাড় করে নিতে হবে।
সে ঠিক জুটে যাবে।
হেমনাথকে যতখানি ভাবনাশূন্য দেখাল, অবনীমোহন কিন্তু ততখানি নিশ্চিন্ত নন। কিভাবে কোত্থেকে এত লোক যোগাড় হবে, তিনি ভেবে উঠতে পারছিলেন না। অবশ্য এ প্রসঙ্গে আর কোনও প্রশ্ন করলেন না।
হেমনাথ বুঝিবা অবনীমোহনের মনোভাব টের পেয়েছিলেন। হাসতে হাসতে বললেন, দেখো, লোক ঠিক বাড়িতে এসে হাজির হবে।
আপনি আগেই ঠিক করে রেখেছেন?
না।
তবে? অবনীমোহনকে ঈষৎ বিমূঢ় দেখাল।
হেমনাথ বললেন, আগে থেকে ঠিক করার দরকার নেই। সময়মতো ওদের পাওয়া গেলেই তো হল।
হেমনাথ যা বলেছিলেন তা-ই। লোক যোগাড় করতে হিল্লি দিল্লি ছুটতে হল না, ঘরে বসেই পাওয়া গেল।
সেইদিনই বিকেলবেলা লক্ষ্মীছাড়া চেহারার একদল মানুষ এসে হাজির। হাত-পা তাদের ফাটা ফাটা, চামড়া থেকে খই উড়ছে। চুল জট পাকাননা, চিরুনি এবং তেলের সঙ্গে সেগুলোর বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। পরনে চিটচিটে লুঙ্গি আর চেক-কাটা জামা কিংবা গেঞ্জি। সবার হাতেই দু’টো করে ধানকাটা কাস্তে। চেহারা এবং পোশাক আশাক দেখে এক পলকেই বোঝা গেল, ওরা খুব গরিব মুসলমান।
সবার আগে ছিল বুড়োমতো একটা লোক, সম্ভবত সে-ই দলপতি। হেমনাথের কাছে এগিয়ে এসে বলল, আদাব হ্যামকত্তা
অন্য লোকগুলোও বিনীত সুরে বলে উঠল, আদাব আদাব—
