অবনীমোহন তাকালেন, কী বলছ?
আমার হেই কথাখান কিলাম কওয়া হয় নাই।
অবনীমোহনের মনে পড়ে গেল। সাগ্রহে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, বল—
তালেব বলল, জমিন কিনলেন, ধান রুইবেন তো?
সেইরকমই ইচ্ছে। চাষ না করলে আর কিনলাম কেন? অবনীমোহন হাসলেন।
অঘ্ঘান, পৌষ মাসে ধান কাটার পর–তালেব বলতে লাগল, আপনের জমিনে যা দুই চাইর দানা পইড়া থাকব, হেগুলান কিলাম আমার। ইন্দুরের গাদে (ইঁদুরের গর্তে) যা ধান থাকব হেও (তাও) আমার।
কিন্তু—
কী?
মাটির সঙ্গে যে ধান মিশে থাকবে তা তুলবে কী করে?
হে আমি য্যামনে পারি। আপনে খালি কথা দ্যান, উই ধান আমারে দিবেন।
সংশয়ের গলায় অবনীমোহন বললেন, তুমি যদি তুলে নিতে পার, আমার আপত্তি নেই।
তালেবের চোখমুখ থেকে আনন্দ যেন উছলে পড়তে লাগল। এত বড় জয় যেন আর কখনও হয়নি তার। উৎফুল্ল সুরে মাথা হেলিয়ে সে বলতে লাগল, কথা দিলেন কিলাম, পাকা কথা
হ্যাঁ হ্যাঁ, পাকা কথা বৈকি—
একসময় ফিটন চলতে শুরু করল।
অনীমোহনের বিস্ময় আর কাটছিল না। বললেন, অদ্ভুত লোক—
হেমনাথ বললেন, হ্যাঁ, অদ্ভুতই। প্রায়ই এই রেজিস্ট্রি অফিসে এসে বসে থাকে। আর যে জমি কেনে তাকে গিয়ে ধরে, যাতে ধান ওঠার পর ঝড়তি পড়তি ফসল ও কুড়িয়ে নিতে পারে।
আর কিছু করে না?
না। করতে তো অনেকেই বলে। আমি বলেছি, মজিদ বলেছে, রামকেশব বলেছে, গুয়াখোলার রহিম মিঞা বলেছে। কামলার তো সবারই দরকার। আমরা ওকে বাড়িতে এসে থাকতে বলেছি। কিন্তু কে কার কথা শোনে!
ধান কুড়িয়ে দিন চলে?
ভগবান জানে।
সারা রাস্তা তালেবের কথাই হল। কথায় কথায় একসময় বরফ কল, স্টিমারঘাট, সারি সারি মিঠাইর দোকান পেরিয়ে ফিটন হেমনাথের বাড়ি এসে থামল।
.
২.০৮
পুজোর আগে সেই যে ঝিনুক এ বাড়ি এসেছিল, এখনও যায়নি। ভবতোষ অবশ্য মাঝে মধ্যে এসে মেয়েকে দেখে গেছেন। ঠিক হয়েছে এখানে থেকেই পড়াশোনা করবে ঝিনুক। ইংরেজি নতুন বছর পড়লে স্কুলে ভর্তি হবে।
এখনও মাছের বড় টুকরোটা নিয়ে, দাদুর কাছে শোওয়া নিয়ে, স্নেহলতার ভাগ নিয়ে বিনুর সঙ্গে সমানে হিংসে করে যাচ্ছে ঝিনুক। তবে পুজোর ছুটিতে কলকাতা থেকে ঝুমারা আর পর ঝিনুক যেমনটি হয়ে উঠেছিল, এখন তেমন নেই। তখন সব সময় বিনুর দিকে তাকিয়ে থাকত। সে। বিনু কী করে, কোথায় যায়, সব তীক্ষ্ণ ধারাল চোখে লক্ষ করত। ঝুমার সঙ্গে বিনু খেলা করলে, কথা বললে, কিংবা বেড়াতে গেলে রাগে-আক্রোশে-বিদ্বেষে জর্জরিত হয়ে যেত ঝিনুক। আজকাল সে ভাবটা নেই তার।
একটা ব্যাপার বিনু লক্ষ করেছে, লেখাপড়া খেলাধুলো কিংবা তার সঙ্গে হিংসের ফাঁকে ফাঁকে কখনও কখনও পুবের ঘরের দাওয়ায় চুপচাপ গালে হাত দিয়ে বসে ঝিনুক, উদাস চোখে হেমন্তের অনুজ্জ্বল ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। যে ঝিনুক হিংসে করে, যে ঝিনুক দাদু-দিদার ভাগ নিয়ে গাল ফুলিয়ে দুর্বিনীত ঘাড় বাঁকিয়ে থাকে, তাকে তবু চেনা যায়। কিন্তু এই মেয়েটা বড় অচেনা, তাকে বড় দূরের মনে হয় তখন।
এমনিতে ঝিনুককে বিশেষ পছন্দ করে না বিনু, আবার অপছন্দও করে না। কিন্তু নির্বাক বিষণ্ণ, প্রতিমার মতো এই সুদূর, অচেনা মেয়েটা তাকে যেন অসীম আকর্ষণে টানতে থাকে।
একেক সময় বিনু তার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। জিজ্ঞেস করে, এখানে বসে কী করছ?
প্রথমটা হয়তো শুনতেই পায় না ঝিনুক। দু’চারবার ডাকাডাকির পর সে চমকে তাকায়। বিনু আগের প্রশ্নটাই আবার করে, এখানে কী করছ?
গাঢ় বিষাদের গলায় ঝিনুক বলে, মা’র কথা ভাবছি।
দুঃখী মেয়েটা নিমেষে যেন বিনুকে অভিভূত করে ফেলে। তার অনেকখানি কাছে গিয়ে অপার সহানুভূতির সুরে সে শুধোয়, মা’র জন্যে মন কেমন করছে?
আস্তে আস্তে কোঁকড়ানো চুলে-ভরা মাথাটা নেড়ে অস্ফুট গলায় বিনুকে বলে, হুঁ– রুপোর মতো বড় বড় চোখদুটো প্রথমে জলে ভরে যায়, তারপর ফোঁটায় ফোঁটায় টপ টপ ঝরে পড়তে থাকে।
এই সময়টা একেবারে দিশেহারা হয়ে যায় বিনু। কিভাবে ঝিনুককে সান্ত্বনা দেবে, কেমন করে কোন সমবেদনার কথা বললে মেয়েটা শান্ত হবে, সে ভেবেই পায় না। বিমূঢ়ের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গম্ভীর ভারী গলায় বিনু বলে, কেঁদো না।
কান্না থামে না। ঝিনুক ফুলে ফুলে ফেঁপাতেই থাকে, আর ভাঙা ভাঙা গলায় বলে, মাকে আমি আর কক্ষণো দেখতে পাব না।
গলার কাছটা, বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আসে বিনুর। কান্নার মতো কিছু একটা উথলে বেরিয়ে আসতে চায়, কিন্তু পথ পায় না। ফিসফিস করে বিনু এবার যা বলে, ঝিনুক তো নয়ই, নিজেও স্পষ্ট বুঝতে পারে না।
.
২.০৯
অঘ্রাণের শেষাশেষি একদিন হেমনাথ বললেন, মাঠের ধান তো পেকে এল। আর কদিন পর কাটা শুরু হবে। তার আগে একটা কাজ করা দরকার।
স্নেহলতা-অবনীমোহন-সুধা-সুনীতি-বিনু, এমনকি যুগলও কাছাকাছি ছিল। সবাই জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল, কী?
ধানকাটার পরই তো যুগলের বিয়ে। তার আগে একখানা ঘর তুলতে হয়। নইলে—
স্নেহলতা বললেন, নইলে কী?
হেমনাথ বললেন, নতুন বৌ এসে থাকবে কোথায়? যুগল যে ঘরে থাকে সেখানে নতুন বৌকে তো তোলা যায় না।
সে তো ঠিকই। স্নেহলতা উৎসাহিত হয়ে উঠলেন, তা ঘর উঠবে কোথায়?
উত্তর না দিয়ে হেমনাথ যুগলের দিকে তাকালেন, কি রে, কোথায় ঘর তুলবি?
