হঠাৎ একটা লোকমাথার চুলে জট বাঁধা, মুখময় দাড়ি-গোঁফ, ভাঙা-ভাঙা নখ, পায়ে হাজা, লালচে উভ্রান্ত চোখ, সব মিলিয়ে পাগলাটে চেহারা–অবনীমোহনের সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, সালাম বাবু। আপনে বুঝিন জমিন কিনলেন?
অবনীমোহন অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বললেন, হ্যাঁ, কেন?
আপনের লগে একখান কথা আছে।
অবনীমোহন বললেন, কী কথা?
হলদে হলদে অসমান দাঁত বার করে লোকটা বলল, কার জমিন কিনলেন?
মজিদ মিঞার।
চোখের ওপর হাত রেখে ভুরু কুঁচকে লোকটা ভাবতে চেষ্টা করল যেন। বলল, কোন মজিদ মেঞা কন দেখি? বাড়ি কুনখানে?
অবনীমোহন বললেন, কেতুগঞ্জে। কেতুগঞ্জের মজিদ মো বড় ভালা মানুষ। লোকটার চোখমুখ আলো হয়ে উঠল, মেঞাভাইর কুন জমিন কিনলেন?
উত্তরের দিকের মাঠের।
উত্তরে চকের জমিন? বড় বাহারের জমিন। হেই ধারে সুজনগুঞ্জের হাট, আর এইধারে ধলেশ্বরীর গাঙ–এইর ভিতরে অ্যামন ভালা জমিন আর নাই।
অবনীমোহন অবাক হয়ে গিয়েছিলেন, তুমি এখানকার সব জমি চেনো নাকি।
চিনি আবার না! হগল চিনি, মোভাইর যেই জমিন আপনে কিনলেন হেয়াতে ধান দ্যান, পাট দ্যান, মুঙ-মুসৈরকলই–যা ইচ্ছা দ্যান, ফলন যা হইব—চোমৎকার–চোমৎকার–
একটু চুপ।
তারপর লোকটাই আবার শুরু করল, আপনের লগে এত কথা কইলাম, আপনে কে, হেয়াই জানলাম না।
অবনীমোহন নিজের পরিচয় দিলেন।
অপার বিস্ময়ে লোকটা খানিকক্ষণ হাঁ হয়ে থাকল। তারপর বলল, আপনে হ্যামকত্তার জামাই!
অবনীমোহন আস্তে করে মাথা নাড়লেন। হেমনাথের সঙ্গে সম্পর্ক থাকাটাই যেন এখানে পরমাশ্চর্য ঘটনা। এ লোকটার চোখেমুখে যে বিস্ময় তা রাজদিয়াবাসী প্রতিটি মানুষের চোখেই আগে দেখেছেন অবনীমোহন।
লোকটা বলল, আপনে নিয্যস কইলকাত্তায় থাকতেন?
হ্যাঁ। তোমায় কে বললে?
কে কইছিল মনে নাই। তয় শুনছিলাম, কইলকাত্তা থিকা হ্যামকত্তায় ক্যাঠা যিনি আইছে। ভাবছিলাম আপনেরে দেখতে যামু
যাও নি তো–
না।
গেলেই পারতে।
একটু ভেবে লোকটা বলল, যাওনের সোময় কই? চকে চকে মাঠে ঘাটে ঘুইরা দিন কাইটা যায়। কুনোখানে যাওনের ফুরসুত নাই।
বিনু একধারে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ভেবেই পেল না, মাঠে ঘাটে এত কী কাজ লোকটার! ইচ্ছে হল একবার জিজ্ঞেস করে, কী ভেবে আর করল না।
অবনীমোহন বললেন, নামটা কী ভাই?
তালেব–তালেব মেঞা—
তুমি এই রাজদিয়াতেই থাকো?
না।
তবে?
তালেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর উদাস গলায় অন্যমস্কের মতো বলল, বাড়ি আমার এই দ্যাশে না।
অবনীমোহন শুধদলেন, কোথায়?
হেই ম্যাঘনার পারে। তয়–
কী?
দ্যাশ কইতে কিছু নাই আমার। ম্যাঘনায় ঘরবাড়ি খাইছে, ভাসতে ভাসতে এইখানে চইলা আইলাম। দশ বিশ বচ্ছর ধইরা এইখানেই আছি।
তোমার কে কে আছে?
কেউ না। এক্কেরে ঝাড়া হাত-পাও।
অবনীমোহন হয়তো কৌতূহল বোধ করছিলেন, এখানে কোথায় থাকো তুমি?
তালেব বলল, থাকনের ঠিকঠিকানা নাই। যহন যেইহানে পারি হেইখানে পইড়া থাকি। তয় মাঠে ঘাটেই থাকি বেশি।
রাত্তিরেও?
হ।
সঙ্গে সঙ্গে কিছু বললেন না অবনীমোহন।
তালেব আবার কী বলতে যাচ্ছিল, সেই সময় মজিদ মিঞাকে নিয়ে হেমনাথ এসে পড়লেন। এতক্ষণ রেজিস্ট্রি অফিসের ভেতর মুহুরি আর উকিলের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন তারা।
হেমনাথকে দেখে অনেকখানি ঝুঁকে সম্ভ্রমের গলায় তালেব বলল, ছালাম বড়কত্তা, শরীল গতিক ভালা তো?
হেমনাথ বললেন, ভাল। তুই কেমন আছিস তালেব?
আপনেরা য্যামন রাখছেন।
আমরা রাখবার কে? আকাশের দিকে দেখিয়ে হেমনাথ বললেন, ভাল মন্দ যা রাখবার ওই ওপরওলাই রাখবেন।
তালেব জোরে মাথা নেড়ে বলল, লাখ কথার এক কথা। খোদাতাল্লা ছাড়া কে আর রাখতে পারে।
ওপাশ থেকে মজিদ মিঞা বলে উঠল, জমিন রেজিস্টারির খবর বুঝি পাইয়া গেছস?
নোংরা জট-পাকানো দাড়িগোঁফের ভেতর জগতের সরলতম হাসিটি ফুটিয়ে তালেব মাথা হেলিয়ে দিল।
মজিদ মিঞা আবার বলল, গন্ধ পাইয়াই বুঝি লৌড়াইয়া (দৌড়ে) আইছস?
হ।
হেমনাথ এই সময় তাড়া দিলেন, এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। বেলা হেলতে চলল, এবার বাড়ি ফেরা যাক।
মজিদ মিঞা ব্যস্ত হয়ে উঠল, হ হ, শুদাশুদি খাড়ইয়া থাকনের কুন কাম? লন যাই।
সুরমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। রাজদিয়ার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত, এতখানি রাস্তা তার মতো দুর্বল রোগা মানুষের পক্ষে একবার হেঁটে এসে আবার ফিরে যাওয়া অসম্ভব। শরীরে তা হলে আর কিছুই থাকবে না। তাই সকাল বেলাতেই লারমারের ফিটনখানা আনিয়ে রেখেছিলেন হেমনাথ।
সামনের দিকে একটা ডালপালা-ওলা বিশাল জামরুল গাছের তলায় লারমোরের ফিটনটা দাঁড়িয়ে ছিল। বয়স্ক, রুণ ঘোড়াটা আর কোচোয়ান কাদের দুজনেই ঝিমুচ্ছিল। হেমনাথরা সোজা সেখানে চলে এলেন।
মজিদ মিঞা গলা চড়িয়ে ডাকল, কাদের—
অতি কষ্টে চোখের পাতা দুটো ওপর দিকে টেনে তুলল কাদের। ঘুমন্ত গলায় সাড়া দিল, হ–
ঘুমাস নিকি?
না। বলতে বলতেই আবার কাঁদেরের চোখ বুজে এল।
ঘুমাস না তো চোখ বুইজা আছস ক্যান? মজিদ মিঞা বলতে লাগল, নে, চোখ টান কর। তর ঘোড়ারে জাগা। আমাগো কাম হইয়া গ্যাছে। এইবার বাড়ি যামু।
একে একে সবাই ফিটনে উঠল।
হেমনাথের সঙ্গে জামরুল তলায় তালেবও এসেছিল। সবাইকে গাড়িতে উঠতে দেখে সে উৎকণ্ঠিত হল। ফিটন ছাড়বার মুখে তাড়াতাড়ি অবনীমোহনকে ডাকল, জামাইকত্তা
