কথাগুলো অবনীমোহনের উদ্দেশ্যে বলা। অবনীমোহন উত্তর দিলেন না, নিঃশব্দে হাসলেন শুধু।
নিবারণ বলতে লাগল, রাইজদার হ্যামকার বাড়ি, বাজিতপুরে অভয় কবিরাজের বাড়ি, সুনামগঞ্জে ইসমাইল মেরধার (মৃধা) বাড়ি, গিরিগুঞ্জে ছোভান (সোভান) আলি মৌলবীর বাড়ি, হাসাড়ায় মল্লিকগো বাড়ি–এই কয় বাড়িতে চিঠি লইয়া গ্যালে খাইতে হইবই।
অবনীমোহন এবার ঈষাৎ বিস্ময়ের সুরে বললেন, আপনি তো অনেকগুলো গ্রামের নাম করলেন—
হ।
এত এত গ্রামে আপনাকে ঘুরতে হয়?
মোটে তো চাইরখান গেরামের নাম কইলাম। আমারে বিশখান গেরামে ঘুরতে হয় জামাইকত্তা
অবনীমোহন হেমনাথের ভাগনী-জামাই। সেই সুবাদে এরই ভেতর জামাই কত্তা’ ডাকতে শুরু করেছে নিবারণ।
অবনীমোহন বললেন, বিশখানা গ্রাম একদিনে যান কী করে?
একদিনে ক্যাঠা (কে) যায়!
তবে?
নিবারণ এবার যা উত্তর দিল, সংক্ষেপে এইরকম। রাজদিয়া এবং আশেপাশের কুড়িখানা গ্রাম নিয়ে একটা মাত্র পোস্ট অফিস, আর ডাক পিওন বলতে একা নিবারণ। মস্ত ঝোলায় চিঠিপত্র বোঝাই করে প্রতি সোমবার সে বেরিয়ে পড়ে। পথে নদী খাল বিল পড়লে, নৌকোর মাঝিদের ডেকে ডেকে পাড়ি জমায়, কখনও বা ‘গয়নার নৌকো’ ধরে নেয়। যেখানেই যাক, এই জলের দেশে মানুষ বড় ভাল, বড় দয়ালু। দু’মুঠো না খাইয়ে কেউ ছাড়তে চায় না। রাত্রিবেলা কোথাও
কোথাও একটা আশ্রয় জুটে যায়ই।
সোম থেকে শনি, একটানা ছ’দিন চিঠি বিলির পর রাজদিয়ায় ফিরে আসে নিবারণ। মাঝখানে রবিবারটা বিশ্রাম। তারপর আবার সোমবার দূরের গ্রাম-গঞ্জ-জনপদে বেরিয়ে পড়া। পঁচিশ তিরিশ বছর ধরে এই রকমই চলছে।
সব শুনে অবনীমোহন কী বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই স্নেহলতা বলে উঠলেন, বকবকানি থামিয়ে এখন চান করতে যা নিবারণ। তোকে খেতে দেবার পর আমরা খাব।
‘এই যাই–’ ব্যস্তভাবে নিবারণ পুকুরঘাটের দিকে চলে গেল। একটু পর ফিরে এসে যখন খেতে বসল তখনও তার কথার শেষ নেই। খেতে খেতে গল্প করতে লাগল সে।
একধারে দাঁড়িয়ে বিনুর মনে হল, লোকটা যেন বকবক করার কল। দম দেওয়াই আছে, সব সময় গল গল করে কথা বেরিয়ে আসছে।
খাওয়াদাওয়ার পর নিবারণ বিনুকে নিয়ে পড়ল, তোমার লগে ভাল কইরা আলাপই হইল না নাতিবাবু। লও যাই, ইট্র গপসপ করি। বিনুকে সঙ্গে নিয়ে যুগলের ঘরে গিয়ে ঢুকল সে। বোঝা গেল, এ বাড়ির সব অন্ধিসন্ধিই তার চেনা। টের পাওয়া গেল, এতক্ষণ বকবক করেও তার সাধ মেটে নি, আরও কিছুক্ষণ সে গল্প করতে চায়।
লোকটাকে খুব খারাপ লাগছিল না বিনুর। যুগলের নিচু তক্তপোষে নিবারণের পাশাপাশি বসে উন্মুখ হয়ে থাকল সে।
একটা বিড়ি ধরিয়ে নিবারণ বলল, তোমরা তো কইলকাত্তার পোলা?
বিনু মাথা নাড়ল।
কইলকাত্তা দ্যাশখান ক্যামন কইবা—
কলকাতা কেমন শহর, কথায় কথায় তার মোটামুটি ছবি এঁকে নিবারণের চোখের সামনে যেন সেঁটে দিল বিনু।
শুনে কিছুক্ষণ বোবা হয়ে থাকল নিবারণ। তারপর বলল, আলিসান ব্যাপার,?
হ্যাঁ।
কইলকাত্তার কথা তো শুনলাম। এইবার আমাগো জলের দ্যাশের গপ শোন।
বলুন–
দেখা গেল নিবারণ লেকটা সত্যি সত্যি গল্পের খনি। বিপুল অভিজ্ঞতা তার। কবে কার্তিক মাসের ঝড়ে বড় গাঙে গয়নার নৌকো’ উলটে গিয়ে মরতে বসেছিল, তার পর দু’খানা মোটে হাতের ভরসায় দু’মাইল উথলপাথল নদী পাড়ি দিয়েছিল, কবে চরের মুসলমানদের সঙ্গে শুধু লাঠি পেটা করে একটা প্রকাণ্ড কুমির মেরে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কাছ থেকে দশ টাকার পুরস্কার পেয়েছিল, কবে কোথায় সাক্ষাৎ যমের মত ডানাওলা উড়ন্ত সাপ দেখেছিল, কোথায় দু’শ’ বছরের এক বুড়ো ফকিরের অলৌকিক মন্ত্রবলে বিশাল দীঘির সব জল দুধ হয়ে গিয়েছিল–হাত-পা চোখমুখ নেড়ে কত বিচিত্র বিস্ময়কর গল্প যে নিবারণ বলে গেল হিসেব নেই।
গল্প বলতে জানে বটে লোকটা! মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনে যাচ্ছিল বিনু। তার চোখে পলক পড়ছিল না।
গল্পে গল্পে বিনুকে জয় করে বিকেলের খানিক আগে নিবারণ চলে গেল। এখান থেকে পথে কারোর নৌকো ধরে সোজা সুজনগঞ্জ যাবে সে।
.
নিবারণ চলে যাবার কিছুক্ষণ পরে হেমন্তের ছায়া তখন আরও দীর্ঘ এবং ঘন হল সেই সময় সিনজুরি বন থেকে বেরিয়ে সুধা সুনীতি বাড়ি চলে এল।
পুবের ঘরের দাওয়ায় বসে সুরমা চুল বাঁধছিলেন। বিনু তার কাছেই ছিল। মেয়েদের দেখে সুরমা বললেন, কোথায় ছিলি রে তোরা এতক্ষণ?
সুনীতি বলল, বাগানে—
কী করছিলি?
গল্প।
কলকাতা থেকে নাকি চিঠি এসেছে?
সুনীতি থতমত খেয়ে যায়। আধফোঁটা গলায় বলল, হ্যাঁ।
সুরমা শুধলেন, কার চিঠি?
আমার–
তোকে আবার কে চিঠি দিলে?
আমার কলেজের এক বন্ধু, সেই যে বেলা বলে মেয়েটা, কলকাতায় আমাদের বাড়ি আসত–
সুরমা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
বিনু লক্ষ করল, সুধা সুনীতি চোরা চাহনিতে পরস্পরকে দেখতে দেখতে ঠোঁট টিপে হাসছে। বিনুর একবার ইচ্ছে হল, চিঠির আসল রহস্যটা ফাঁস করে দেয়। কী ভেবে শেষ পর্যন্ত চুপ করে থাকল, কিছু বলল না।
.
২.০৭
অঘ্রাণের মাঝামাঝি বিনুদের জমি কেনা হয়ে গেল।
রেজিস্ট্রি হবার পর অবনীমোহন বিনু আর সুরমা রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। মজিদ মিঞা, হেমনাথ তখনও অফিসের ভেতর। সুরমাকে এতদূর আসতে হয়েছে, কেননা জমি তার নামেই কিনেছেন অবনীমোহন।
