সুধা বলল, অসভ্যের কী হল?
সুনীতি বলল, এমন করে চিঠি কেউ লেখে!
ঢঙ করিস না দিদি।
ঢঙের কী হল?
আনন্দদার চিঠির জন্যে তো হা-পিত্যেশ করে বসে ছিলি।
তোকে বলেছে!
বলিস নি। তবে–
তবে কী?
চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সুধা বলল, যেরকম উদাস উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতিস আর ফোত ফেঁত করে দীর্ঘশ্বাস ফেলতিস তাতে মনে হচ্ছিল আনন্দদার চিঠি না এলে বুজি আত্বহত্যা করে বসবি।
তবে রে বাঁদর মেয়ে–সুনীতি করল কি, এঁটো হাতেই সুধার পিঠে দুম করে কিল বসিয়ে দিল। পিঠ বাঁকিয়ে নাকি সুরে উঁ উঁ করতে করতে সুধা বলল, পেটে খিদে মুখে লাজ। সত্যি কথা বললেই দোষ।
সত্যি কথা তোকে বলাচ্ছি। আয়—
দ্বিতীয় কিলটি পড়বার আগেই ছুটে দূরে সরে গেল সুধা।
পুকুরঘাটে আঁচাতে আঁচাতে সুনীতি বলল, ভাগ্যিস পিত্তনটার সঙ্গে আমাদের দেখা হয়ে গিয়েছিল। বাবা কি দাদু টাদুর হাতে চিঠিটা পড়লে কী হত বল দেখি!
এক মুখ জল নিয়ে পিচকিরির মতো ছুঁড়ে দিল সুধা। তারপর বলল, খুব ভাল হত। ওঁরা বুঝতে পারতেন কী পাকাটাই না তুই পেকেছিস।
আমাকে নিয়ে বেশি মজা করো না, নিজের কথাটা একটু ভেবে দেখো।
আমার আবার কী কথা? সুধার চোখ কুঁচকে গেল।
সুনীতি বলল, শ্রীমান হিরণকুমার ঢাকায় বসে আছেন। তিনিও এইরকম চিঠি ছাড়তে পারেন। আর তা দাদু কি বাবার হাতে পড়তে পারে।
চমকে ওঠার মতো করে সুধা বলল, কক্ষনো না–
না নয়, হ্যাঁ।
সুধাকে এবার চিন্তিত দেখাল, তাই তো রে দিদি, কী করা যায় বল দেখি–
নারকেল-গুড়ি দিয়ে বাঁধানো ঘাটে দুই বোন পাশাপাশি বসল। বিনু তাদের সঙ্গেই ছিল, হাত নেড়ে নেড়ে হেমন্তের স্থির জলে ঢেউ তুলতে লাগল। কান দুটো কিন্তু তার সুধা সুনীতির দিকেই ফেরাননা।
সুনীতি বলল, আজই কলকাতায় চিঠি লিখে জানিয়ে দেব, আমাকে যেন আর চিঠি টিঠি না লেখে–
সুধা বলল, তোর কথা শুনবার জন্যে বসে আছে আনন্দদা।
তা হলে হিরণকুমারও তা-ই।
যা বলেছিস। বারণ করলে ওরা আরও বেশি করে চিঠি লিখবে।
একটু ভেবে সুনীতি হঠাৎ খুব উৎসাহিত হয়ে উঠল, একটা ফন্দি মাথায় এসেছে রে সুধা–
সুধা উৎসুক চোখে তাকাল, কী?
উত্তর না দিয়ে সুনীতি বিনুকে ডাকল। বিনু তাকাতেই বলল, পোস্ট অফিসটা কোথায় জানিস?
বিনু ঘাড় কাত করল, অর্থাৎ জানে।
দু’দিন পর পর একবার করে পোস্ট অফিসে যাবি ভাই?
কেন?
সুধার কি আমার চিঠি থাকলে নিয়ে আসবি।
চোখ কুঁচকে একটু ভাবল বিনু। তারপর বলল, যেতে পারি। কিন্তু—
সুনীতি উঠে এসে বিনুর গা ঘেঁষে বসে পড়ল, কিন্তু কী?
আমাকে কী দিবি?
কী আবার দেব? যাবি তো বাবা এখান থেকে ওখানে—
এখান থেকে ওখানে! সেই স্টিমারঘাট বরফকল ছাড়িয়ে তবে পোস্ট অফিস। পাক্কা দেড় দু’মাইল রাস্তা। এমনি এমনি অতখানি পথ আমি যেতে পারব না।
সুনীতি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আচ্ছা আচ্ছা, কী নিবি বল—
বিনু বলল, যেদিন পোস্ট অফিসে যাব সেদিন দু’আনা পয়সা দিবি।
দু’আনা! সুর টেনে সুনীতি বলল, তুই কী ডাকাত রে—
তা হলে যেতে পারব না।
আচ্ছা আচ্ছা, দু’আনাই দেব।
ওদিক থেকে সুধা ডাকল, দিদি—
সুনীতি আবার সুধার কাছে ফিরে গেল, কী বলছিস?
পোস্ট অফিসের ব্যাপারটা তো মিটল। এবার আনন্দদার চিঠি বার কর।
না না—
না বললে শুনছি না। বার কর– সুনীতির শাড়ির আড়াল থেকে চিঠিটা বার করার জন্য টানাটানি শুরু করে দিল সুধা।
শাড়ি সামলাতে সামলাতে বিব্রতভাবে চেঁচামেচি জুড়ে দিল সুনীতি, এই সুধা, এই—
সুধার এক কথা, বার কর, বার কর–
আত্মরক্ষার জন্য সুনীতি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ছাড় ছাড়, কী ছেলেমানুষি করছিস! বিনু রয়েছে না?
বিনু গেলে চিঠি দেখাবি?
সে দেখা যাবে।
সুধা এবার বিনুর উদ্দেশে বলল, তুই এখন যা তো বিনু—
বিনুর মোটেই যাবার ইচ্ছে নেই। আনন্দদা সুনীতিকে কী লিখেছে, জানবার ভারি কৌতূহল হচ্ছিল। সে বলল, না, যাব না।
যাবি না?
না।
একটা ছোটখাটো খণ্ডযুদ্ধ বেধে যাবার সম্ভাবনা ছিল। তার বদলে অগ্নিদৃষ্টিতে একবার বিকে দেখে নিয়ে সুধা বলল, চল দিদি, আমরা ওদিকে যাই। হনুমান ছেলে এখানে বসে থাক। সুনীতিকে সঙ্গে নিয়ে বাগানের উত্তর দিকে ঘন রোয়াইল আর সিনজুরি ঝোঁপের ভেতর চলে গেল সুধা।
একা একা ক্ষুণ্ণ মনে কিছুক্ষণ পুকুরঘাটে বসে থাকল বিনু। তারপর একসময় টুক করে উঠে পড়ে চঞ্চল পাখির মতো অস্থির পায়ে বাগানের ভেতর ঘুরে বেড়াতে লাগল। একবার ইচ্ছে হল, বোয়াইল আর সিনজুরি বনে ঘন ছায়ার ভেতর সুধা সুনীতি যেখানে বসে আছে সেখানে চলে যায়। পরক্ষণেই ভাবল ওরা যখন তাকে ফেলে চলেই গেছে, আর হ্যাংলার মতো যাবে না।
অনেকক্ষণ পর বাড়ির ভেতর চলে এল বিনু। এসেই অবাক।
রান্নাঘরের দাওয়ায় নিবারণ পিওন একটা মোটা গামছা পরে প্রায় খালি গায়ে তেল মাখছিল। কোথায়ই বা তার ইউনিফর্ম, কোথায়ই বা তার চিঠি পত্তরের ঝোলা! তার মুখে অনবরত খই ফোঁটার মতো কথা ফুটছিল।
স্নেহলতা-সুরমা-শিবানী-অবনীমোহন, বাড়ির প্রায় সবাই নিবারণের সামনে দাঁড়িয়ে। পায়ে পায়ে বিনুও গিয়ে সেখানে দাঁড়াল। তার মনে হল, এত যখন তেল মাখার ঘটা, নিবারণ এখানে খাবেও।
নিবারণ বলছিল, চিঠি লইয়া এই বাড়িত যেদিনই আসি হেইদিনই ছান-খাওয়া সাইরা যাই। হেইদিন খাওন আমার বান্ধা। না খাইয়া গ্যালে হ্যামকত্তা আর বৌ-ঠাইরেন আস্তা রাখব না।
