হেমনাথ কাছেই ছিলেন। হেসে ফেললেন, জমিটা অবনীকে না দেওয়া পর্যন্ত তোর দেখি ঘুম আসছে না!
তা যা কইছেন। মজিদ মিঞা বলতে লাগল, কুনো ব্যাপার একবার মাথার ভিতরে ঢুকলে যতক্ষণ হেইটা না হইতে আছে, আমার সোয়াস্তি নাই। হে কথা যাউক। আর কয়দিনের মইদ্যে ধান কাটা আরম্ভ হইয়া যাইব। তহন আর উয়াস (নিশ্বাস) ফেলানের সময় পামু না। ধানকাটার আগেই আমি জমিন রেজিস্টারি করতে চাই।
স্নেহলতা এ আসরে আছেন। তিনি বললেন, সেই ভাল। ধানকাটা শেষ হতে হতে পৌষ মাস হয়ে যাবে। পৌষ মাসে শুভ কাজ করতে হবে না। কেনাকাটা যা করবার এই অঘ্রাণেই একটা ভাল দিন দেখে সেরে ফেলা উচিত।
তক্ষুনি একটা পঞ্জিকা এসে পড়ল। পাতা উলটে উলটে সপ্তাখানেক বাদে একটা শুভদিনও ঠিক করে ফেললেন হেমনাথ।
দিন তারিখ স্থির হবার পর মজিদ মিঞা বলল, এইর ভিতরে একখান কথা আছে কিলাম মিতা–
অবনীমোহন শুধোলেন, কী কথা?
যে জমিন আপনেরে দিমু হেয়াতে ধান আছে। এই সনের ধান কিন্তুক আপনে পাইবেন না, কারণটা হইল বর্গাদারেরে উই জমিন চাষ করতে দিছিলাম। আমি ছাইড়া দিলেও বর্গাদার তো ছাড়ব না। ধান উইঠা গ্যালে জমিনের দখল পাইবেন।
অবনীমোহন তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, কী আশ্চর্য, ও ধান আমি নেব কেন? যারা খেটেছে ও ফসল তাদেরই প্রাপ্য।
তা হইলে কথা পাকা হইয়া গ্যাল।
জমি কেনার ব্যবস্থা পাকা হয়ে যাবার পর একদিন দুপুরবেলা খেয়েদেয়ে সুধা সুনীতি আর বিনু পুকুরঘাটে আঁচাতে যাচ্ছিল। হঠাৎ রাস্তার দিক থেকে উঁচু গলার ডাক ভেসে এল, হ্যামকত্তা আছেন, হ্যামকত্তা–
বিনুরা দাঁড়িয়ে পড়ল।
একটু পর রাস্তার দিক থেকে বাগানের ভেতর যে এসে পড়ল তার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মাথার চুল কাঁচা পাকায় মেশানো। শরীরের কোথাও বিন্দুমাত্র মেদ নেই। ছোটখাটো মানুষটি। চোখের দৃষ্টি কিছুটা অন্যমনস্ক, অনেকখানি উদাস। পোশাক আশাক আর কাঁধের ঝোলাখানা দেখে টের পাওয়া গেল, সে ডাক পিওন।
বিনুদের দেখে লোকটা দাঁড়িয়ে পড়েছিল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, আপনেরা?
লোকটা কী জানতে চায়, বুঝতে পেরেছিল সুনীতি। নিজেদের পরিচয় দিল সে। হেমনাথের সঙ্গে সম্পর্ক কী, তাও বলল।
লোকটার চোখমুখ আলো হয়ে উঠল, তিন মাস আমি এই বাড়ি আসি নাই। হেইর লেইগা জানতে পারি নাই। আগে আইলে আপনেগো লগে চিনা পরিচয় হইত। আমার নামখান কইয়া রাখি– নিবারণ ভুইমালী। আমি ডাকপিওন। হে যাউক, একখান কথা জিগাই–
কী?
আপনাগো ভিতরে কেও সুনীতিরানী বসু আছেন—
সুনীতি যেন চমকে উঠল, কেন?
নিবারণ বলল, একখান চিঠি আইছে।
কাঁপা গলায় সুনীতি এবার বলল, দিন। আমার নাম সুনীতি–
ঝোলার ভেতর থেকে একটা খাম বার করল নিবারণ। সুনীতির ডান হাত এঁটো, ভাত টাত মাখানো রয়েছে। কাজেই বাঁ হাতে খামটা নিল সুনীতি। খামের ওপরকার নামঠিকানা চোখ পড়তেই তার মুখে রক্তোচ্ছাস খেলে যেতে লাগল।
বিনু পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সুনীতির মুখের দ্রুত রংবদল দেখতে দেখতে সে অবাক হয়ে যাচ্ছিল। ভেবেই পেল না, সুনীতিকে কে চিঠি লিখতে পারে!
নিবারণ এই সময় বলে উঠল, হ্যামকায় বাড়ি আছেন?
সুনীতি বুঝিবা শুনতে পেল না। হাতের খামটার দিকে পলকহীন তাকিয়ে ছিল। তার মুখে নানা রঙের খেলা চলতে লাগল।
ওধার থেকে সুধা উত্তর দিল, দাদু নেই। সকালবেলা উঠে বেরিয়ে গেছেন। সন্ধের আগে ফিরবেন না।
নিবারণ এবার শুধলো, বৌ-ঠাইরেন আছে তো?
নিবারণ যে স্নেহলতার কথা বলছে, সুধা বুঝতে পারল। বলল, আছেন।
যাই, বৌ-ঠাইরেনের লগে দেখা করি গা। ঘরের দুয়ারে আইসা তেনার লগে দেখা না করলে রক্ষা নাই। নিয্যস আমার গর্দান যাইব। নিবারণ বড় বড় পা ফেলে ভেতর-বাড়ির দিকে চলে গেল।
একটু নীরবতা।
তারপর সুনীতির দিকে ঝুঁকে সুধা বলল, কার চিঠি রে দিদি? তার মুখচোখ থেকে কৌতূহল যেন উপচে পড়ছিল।
সুনীতি চকিত হয়ে বলল, কারোর না। বলে শাড়ির ভেতর খামটা লুকোতে যাবে, তার আগেই ডিঙি মেরে দেখে নিল সুধা।
বিনুরও খুব ইচ্ছে করছিল, সুধার মতো পায়ের বুড়ো আঙুলে ভর দিয়ে দেখে নেয়, কিন্তু একটু দেরি হয়ে গেল। ততক্ষণে চিঠিটা অদৃশ্য হয়েছে।
এদিকে সুধার চোখ কৌতুক এবং দুষ্টুমিতে ঝকমকিয়ে উঠেছে। ঠোঁট ছুঁচলো করে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে খুব রগড়ের গলায় সে বলল, ফ্রম আনন্দ ঘোষ। আনন্দচন্দ্র তা হলে কথা রাখল। চিঠি দেবে বলেছিল, ঠিক দিয়েছে।
শিউরে ওঠার মতো করে চারদিক একবার দেখে নিল সুনীতি। তারপর ভীতু গলায় বলল, অ্যাই সুধা, আই–চেঁচাচ্ছিস কেন? কেউ শুনতে পাবে।
শুনবে না। আমরা ছাড়া এখানে কেউ নেই।
না থাক, তুই মোটে চেঁচাবি না।
এক শর্তে চেঁচানো থামাতে পারি।
সংশয়ের গলায় সুনীতি শুধলো, কী? সুধা বলল, আমাকে চিঠিটা পড়াবি। আনন্দ মহাপ্রভু কেমন করে তোর ভজনা করেছে, দেখতে হবে।
জোরে জোরে প্রবলবেগে মাথা নেড়ে সুনীতি বলে, না না না–
তা হলে কিন্তু আমি সব্বাইকে বলে দেব।
সুনীতি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, হাত শুকিয়ে কড়কড়ি হলে গেল। চল আঁচিয়ে আসি।
সুধা বলল, আঁচাবার পর কিন্তু পড়াবি। না পড়ালে ছাড়ছি না।
পুকুরঘাটের দিকে যেতে যেতে সুনীতি ফিসফিস করল, কী অসভ্য লোক ভাই—
কার কথা বলছিস?
আহা, কার কথা যেন বুঝতে পারছে না–আনন্দদার কথা।
