কাগজ পড়া শেষ করে হেমনাথ মুখ তুললেন। অবনীমোহনের উদ্দেশে বললেন, অবস্থা তা হলে রীতিমতো ঘোরালোই হয়ে উঠেছে।
তাই তো মনে হচ্ছে। অবনীমোহন মাথা নাড়লেন।
আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় রাশিয়া এই যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে পারবে?
কী জানি, বুঝতে পারছি না।
খানিক চিন্তা করে হেমনাথ বললেন, চারদিকে যেরকম বেড়া আগুন তাতে রাশিয়া কতদিন গা বাঁচিয়ে থাকতে পারবে, সেইটেই হচ্ছে কথা। টার্কি বা আয়ারল্যান্ড নিউট্রাল থাকুক বা যুদ্ধে নামুক, তার গুরুত্ব তেমন নয়। কিন্তু রাশিয়ার মতো এত বড় দেশ যদি যুদ্ধে নামেওয়ারের চেহারাই যাবে বদলে।
সংশয়ের সুরে অবনীমোহন বললেন, এই তো সেদিন রাশিয়ায় রেভোলিউশন হয়ে গেল, এর মধ্যে যুদ্ধ করার মতো শক্তি কি ওদের হয়েছে?
একটা ব্যাপার তুমি বোধ হয় লক্ষ কর নি।
কী?
বৃটেন আর জার্মানি–দুই দেশই চাইছে রাশিয়া নিউট্রাল থাক। এর অর্থ কী?
অবনীমোহন উৎসুক চোখে তাকালেন।
হেমনাথ বলতে লাগলেন, নিশ্চয়ই তার শক্তি আছে। যে পক্ষে রাশিয়া যাবে তার পাল্লা ভারী হবে। শত্রুর পাল্লা ভারী হোক, কে-ই বা তা চায়। একটু থেমে আবার বললেন, একটা কথা তোমার খেয়াল নেই অবনী–
কী?
রেভোলিউশনের পর রাশিয়ার খবর দুনিয়ার লোক বিশেষ কিছুই জানে না। চারদিকে আয়রন কারটেন ফেলে ভেতরে ওরা কতদুর এগিয়ে গেছে, কে বলবে। আমার তো ধারণা, ধীরে ধীরে খুবই শক্তিধর হয়ে উঠেছে।
অবনীমোহন কিছু বললন না, আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন। হেমনাথের কথাগুলো খুবই যুক্তি সঙ্গত। তার বিপক্ষে বলবার মতো কিছুই নেই।
কিছুক্ষণ চুপ। তারপর হেমনাথই আবার শুরু করলেন, আচ্ছা, এই যুদ্ধে বৃটেনের অবস্থা তোমার কী মনে হয়?
খুবই সঙ্গিন।
আমারও তাই মনে হয়। ব্যাটারা দারুণ ঠ্যাঙানি খাচ্ছে। হিটলার ওদের হাড়গোড় একেবারে ভেঙে দিচ্ছে। রয়াল এয়ার ফোর্স বলছে আমরা টিরানায় বোমা ফেলেছি, বার্লিন উড়িয়ে দিয়ে এসেছি–সব মিথ্যে, সব বাজে। ধাপ্পা দিয়ে দুনিয়ার কাছে মুখ রাখতে চাইছে আর কি। কিন্তু লোকে যা বুঝবার ঠিকই বুঝবে।
দেখা গেল, রাশিয়ার ব্যাপারে কিছু সংশয় থাকলেও বৃটেন সম্বন্ধে অবনীমোহন আর হেমনাথ সম্পূর্ণ একমত। চিন্তিত গম্ভীর মুখে হেমনাথ বলতে লাগলেন, ওয়ার বেধেছে, তা ঠেকাবার ক্ষমতা তো আমাদের নেই। তবে–
তবে কী?
ওয়ারটা যদি ইউরোপেই আটকে থাকত, মন্দের ভাল। নিজেরা কাটাকাটি করে মরত, আমরা দূরে থেকে দেখতাম। কিন্তু তা তো হচ্ছে না। আগুন একেবারে দরজার সামনে এসে পড়েছে।
তাই তো মনে হচ্ছে।
এদেশে খুব দুর্দিন আসছে অবনী, খুবই দুর্দিন–একই কথা দু’বার করে উচ্চারণ করলেন হেমনাথ।
অবনীমোহন বললেন, তা বুঝতে পারছি। এদিকে বৃটিশ গভর্নমেন্ট কংগ্রেস নেতাদের একে একে জেলে নিয়ে পুরছে, বিচারের নামে ফার্স করছে। ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট একখানা করেছে বটে!
যা বলেছ। হেমনাথ বলতে লাগলেন, ওয়ারের খরচ চালাবার জন্য আবার ট্যাক্স বসাবে। হরামজাদারা ইন্ডিয়াকে এবার ঝাঁঝরা করে ছাড়বে। সাধারণ মানুষের কী দুরবস্থা হয়, এবার দেখো।
অবনীমোহন এবং হেমনাথ আসন্ন দুর্দিনের চেহারাটা দেখবার চেষ্টা করতে লাগলেন যেন।
বিনু প্রায় কিছুই বুঝতে পারছিল না। তবু রাশিয়া-জাপান-হিটলার-চার্চিল-স্টালিন এবং মহাযুদ্ধ এই শব্দগুলির মধ্যে এমন প্রচন্ড আকর্ষণ আছে যে অন্য দিকে চোখ ফেরাতে পারছিল না সে, নিশ্বাস বন্ধ করে হেমনাথের আলোচনা শুনে যাচ্ছিল।
এদিকে আরেকটা ব্যাপার চলছিল। হেমনাথের পড়া খবরের কাগজগুলো নিয়ে সুধা-সুনীতি তক্তপোষের আরেক ধারে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। বিনুর কানে এখন তাদের ফিসফিসানি ভেসে আসছে।
সুনীতি বলছে, ‘দ্যাখ দ্যাখ’, ‘বিজলী’তে ‘পথ ভুলে’ আরম্ভ হয়েছে। প্রতিমা, ডি জি, পান্না, রণজিৎ রায় অভিনয় করছে। ইস, কলকাতায় থাকলে দেখতে পেতাম।
সুধা বলল, ‘উত্তরা’য় ন’সপ্তাহ ধরে ‘শাপমুক্তি’ চলছে। আসবার সময় দেখে এলাম। আর কোনও দিন দেখাই হবে না।
ধীরে ধীরে ঘুরে বসল বিনু। দেখল, দুই বোন সিনেমার পাতায় মুখ গুঁজে আছে। যুদ্ধ নিয়ে এত যে আলোচনা চলছে, সেদিকে তাদের এতটুকু লক্ষ্য নেই। তাদের দেখে মনে হয় না, পৃথিবীতে আদৌ কোনও সমস্যা আছে, দুই গোলার্ধ ঘিরে একটানা ভয়াবহ আগুনের চাকা ঘুরে চলেছে।
সুনীতি বলল, ‘ভবানীপুরে আমাদের বাড়ির কাছে ‘রূপালী’ সিনেমা। সেখানে হাঞ্চব্যাক অফ নতরদ্যাম’ চলছে। নাম ভূমিকায় চার্লস লটন।
সুধা বলল, চার্লস লটনের অ্যাক্টিং আমার খুব ভাল লাগে।
আমারও।
দ্যাখ সুধা, কলকাতায় কত ছবি চলছে। প্যারাডাইসে বন্ধন’, পূর্ণতে মধু বোস সাধনা বোসের রাজনৰ্তকী। কিছুই দেখতে পেলাম না।
কলকাতার মোহময় চিত্রজগৎ দুই বোনকে যেন হাতছানি দিয়ে চলেছে। নতুন নতুন কত বিচিত্র লোভনীয় ছবির মেলা বসেছে সেখানে, অথচ কিছুই তাদের দেখা হল না। সুধা সুনীতির কাছে এর চাইতে অপূরণীয় ক্ষতি আর কিছু নেই।
২.০৬-১০ অবনীমোহন কলকাতা থেকে ফিরে
২.০৬
অবনীমোহন কলকাতা থেকে ফিরে এসেছেন। খবর পেয়েই মজিদ মিঞা কেতুগঞ্জ থেকে ছুটে এল। বলল, তাহলে আর দেরি করনের কাম নাই মিতা। আপনের জমিন বুইঝা লন। কবে রেজিস্টারি করবেন, কন?
