অবনীমোহন এবার আর কিছু বললেন না।
হেমনাথ বললেন, কলকাতায় আর কী দেখলে বল।
চারদিকে মিলিটারি ছাউনি পড়েছে। যেখানে যাবেন সেখানেই মিলিটারি। রাস্তাঘাটে যত গাড়ি দেখবেন তার বেশির ভাগই মিলিটারির-হেভি ট্রাক আর জিপের জন্যে হাঁটাই মুশকিল। মনে হয়, সমস্ত শহরটা মিলিটারির হাতে চলে গেছে। বলতে বলতে হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গেল অবনীমোহনের, আরেকটা ব্যাপার চোখে পড়ল মামাবাবু–
উৎসুক সুরে হেমনাথ জানতে চাইলেন, কী?
ব্যাঙের ছাতার মতো অলিতে গলিতে ব্যাঙ্ক গজাচ্ছে। পুজোর আগে যখন এখানে এলাম তখনও এত ব্যাঙ্ক দেখিনি। আমার তো ধারণা রোজ একটা করে ব্যাঙ্ক জন্মাচ্ছে।
যুদ্ধ বেধেছে, ইনফ্লেশন আরম্ভ হয়ে গেছে, ব্যাঙ্ক তো গজাবেই। দেখবে, টাকা এখন হাওয়ায় উড়তে থাকবে।
থাকবে কি, উড়তে শুরু করে দিয়েছে।
চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। হেমনাথ তাড়া লাগালেন, এবার খবরের কাগজ বার কর অবনী–
হিন্দুস্থানী কুলিরা বারান্দায় বাক্স টাক্স এবং মালপত্তর নামিয়ে রেখে গিয়েছিল। অবনীমোহন বাইরে গিয়ে সুটকেস খুলে মাসখানেকের খবরের কাগজ বার করলেন।
কাগজগুলো হাতে পাওয়া মাত্র হেমনাথ ঝুঁকে পড়লেন। তারপর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়তে লাগলেন, ২রা নভেম্বর। গ্রিসে ইতালীয় বাহিনীর অগ্রগতি। বৃটেন কর্তৃক টিরানায় বোমাবর্ষণ। তুরস্ক বর্তমানে যুদ্ধ বর্জন করিয়া চলিবে–প্রেসিডেন্ট ইনেনুর ঘোষণা।
৩রা নভেম্বর। মহারানী ভিক্টোরিয়ার জন্মস্থান কেনসিংটন প্রাসাদ বোমাবিধ্বস্ত। জার্মানির উপর প্রবল আক্রমণ–রাজকীয় বিমান-বহরের দাবী। জাপান হইতে আমেরিকানদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তন। রাষ্ট্রপতি আজাদ কর্তৃক কংগ্রেসের জরুরি অধিবেশন আহ্বান। ভারতরক্ষা আইনে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু গ্রেপ্তার, কারা প্রাচীরের অন্তরালে বিচার।
৪ঠা নভেম্বর। গ্রীসের সাহায্যার্থে বৃটিশ সেনাবাহিনীর অগ্রগতি। জাপান কর্তৃক শত্রুপক্ষের নৌবহর বাজেয়াপ্ত। জার্মান-অধিকৃত দেশগুলিতে-পোল্যান্ড, ডেনমার্ক, চেকোশ্লোভাকিয়া, হল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম ইত্যাদি ইত্যাদি নাৎসীদের নিদারুণ অত্যাচার।
৫ই নভেম্বর। দারদানেলেস সমস্যার সমাধান, জার্মানির মধ্যস্থতা। সোভিয়েট রাশিয়ার সহিত ইটালির সঙঘর্ষের সম্ভাবনা তিরোহিত। ডানিয়ুব সম্মেলন। বৃটিশ নোটের উত্তরে সোভিয়েট বক্তব্য এইরূপ, আমরা এই যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকিব। মলোটভের ইঙ্গিতপূর্ণ বার্লিন পরিদর্শন। দীর্ঘ ছাপ্পান্ন দিন পর লন্ডনবাসীদের একটি বোমাবর্ষণহীন রাত্রি অতিবাহিত।
৬ই নভেম্বর। প্রতিরক্ষা বাহিনীর সম্প্রসারণ, ভারতবর্ষের যুদ্ধকালীন পরিকল্পনা। সমর-প্রস্তুতির প্রাথমিক ব্যয় তেত্রিশ কোটি টাকা। পরবর্তী প্রতি বছরে ব্যয় ষোল কোটি টাকা। অর্থের জন্য নূতন কর বসানো হইবে।
৭ই নভেম্বর। রুজভেল্ট তৃতীয় বারের জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত। পশ্চিমের মরু রণাঙ্গনে বৃটিশ ট্যাঙ্কবাহিনী।
৮ই নভেম্বর। কালিনিনের সতর্কবাণী, রাশিয়া যুদ্ধ বর্জন করিয়া চলিবে। তবে কেহ তাহার সীমানা অতিক্রম করিতে চাহিলে চুর্ণ করিয়া দেওয়া হইবে।
৯ই নভেম্বর। আয়ারল্যান্ড নিরপেক্ষতা বজায় রাখিয়া চলিবে–ডি ভ্যালেরার ঘোষণা। টাওয়ার অফ লন্ডন বোমাবিধ্বস্ত। সোভিয়েট বাহিনীর প্রস্তুতি, সারা দেশে আপৎকালীন অবস্থা। ওয়ার্ধায় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির জরুরি সভা। রাজেন্দ্র প্রসাদ, কৃপালনী, গান্ধীজি, পন্থ, রাজাগোপালাচারি, প্রফুল্ল ঘোষ, শঙ্কর রাও দেও প্রভৃতি নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি।
১০ই নভেম্বর। ফুয়েরার কর্তৃক সর্বপ্রকার সমর সম্ভার দিয়া মুসোললিনিকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত। পরলোকে চেম্বারলেন। মিউনিক প্যাক্টের জনক, ইতিহাসে যাঁহাকে গৌরবময় ব্যর্থতা’ আখ্যা দেওয়া হইয়াছে, তিনি আর নাই। নর্থের পর এমন দুর্বল প্রধানমন্ত্রী বৃটিশ সাম্রাজ্যে আর কখনও দেখা যায় নাই।
১১ই নভেম্বর। আফ্রিকার মরু অঞ্চলে যুদ্ধ সম্প্রসারিত। গাবান রক্ষার্থে ফরাসি সিদ্ধান্ত। জেনারেল দ্য গলের দৃঢ়তা।
১২ই নভেম্বর। হিটলার কর্তৃক বার্লিনে মলোটভের সংবর্ধনা। রুদ্ধদ্বার কক্ষে দীর্ঘ আলোচনার সময় রিবেনট্রপের উপস্থিতি। ফুয়েরার কর্তৃক অক্ষশক্তির প্রতি সোভিয়েট সাহায্য প্রার্থনা। সোভিয়েট সংবাদপত্রগুলি এ ব্যাপারে নীরব। লন্ডনে জল্পনা-কল্পনা।
পূর্ব রণাঙ্গনে ভয়াবহ জাপানি আক্রমণ। হাইনান ও ফরমোসায় বিপুল সৈন্য সমাবেশ। সায়গন, ফরাসি ইন্দোচিন ও কামরণ উপসাগরে অতর্কিত আক্রমণে সম্ভাবনা। সিঙ্গাপুরে চাঞ্চল্য।
১৭ই নভেম্বর। দীর্ঘ বিরতির পর লন্ডনে প্রবলতম বোমাবর্ষণ, প্রচন্ড নৈশ আক্রমণ। লণ্ডনবাসীদের ভুগর্ভে আশ্রয় গ্রহণ।
১৮ই নভেম্বর। সর্দার প্যাটেল কারারুদ্ধ। সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে মামলা। ভুলাভাই দেশাই কর্তৃক সত্যাগ্রহের সিদ্ধান্ত।
হেমনাথ পড়ে যেতে লাগলেন।
অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল বিনু। কোথায় টিরানা, কোথায় আড্রিয়াটিক সাগর আর এজিয়ান সাগর, কোথায় দারদানেলেস আর ডানিয়ুব এবং ইন্দোচিন-ভূগোলের কোন প্রান্তে এই নামগুলো ছড়িয়ে আছে, কে বলবে। বিনুর কল্পনা অতদূর পৌঁছয় না। কালিনিন কি রিবেনট্রপ, ডি ভ্যালেরা কিংবা টিমোশেঙ্কো, গোয়েবলস অথবা ইনে–এই সব নাম যাঁদের, তাদের চেহারাগুলো কতখানি ভয়াবহ তাই বা কে জানে।
