আমার সুটকেসে–
অবনীমোহন উঠতে যাচ্ছিলেন, বাধা পড়ল। স্নেহলতা বললেন, উঁহু উঁহু, এখন না। যুদ্ধ নিয়ে মাতলে রাত কাবার হয়ে যাবে। ট্রেনে স্টিমারে দু’দিন কাটিয়ে এসেছে ছেলেটা। আগে হাত মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নিক। তারপর ওসব হবে।
হেমনাথ তক্ষুনি সায় দিলেন, সেই ভাল, সেই ভাল। যাও অবনী, তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে কাপড় ছেড়ে নাও।
সারা গায়ে দু’দিনের ক্লান্তি মাখা। আর আছে ট্রেন-স্টিমারের ধুলো। অবনীমোহন একেবারে স্নানই সেরে নিলেন।
হেমনাথের ধৈর্য থাকছিল না। পুবের ঘর থেকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, তোমার স্নান হয়েছে অবনী?
ওধারের কোনও একটা ঘর থেকে অবনীমোহনের গলা ভেসে এল, হয়েছে।
তা হলে এখানে চলে এস।
যাই মামাবাবু।
অবনীমোহন আবার যখন পুবের ঘরে এলেন তখন তার গায়ে দু’দিনের ধুলোবালি-ঘাম-মাখা পোশাক নেই। তার বদলে পাটভাঙা ধবধবে ধুতি আর হাফ শার্ট। চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। গালে, গলায় এবং ঘাড়ের কাছে এখনও ফোঁটা ফোঁটা জল। স্নানের পর ভাল করে মোছেন নি বোধহয়।
এবার হেমনাথ গলা তুলে স্ত্রীকে ডাকলেন, স্নেহ–স্নেহ– এই বয়সেও স্ত্রীকে তিনি নাম ধরে ডাকেন।
রান্নাঘরের দিক থেকে স্নেহলতা সাড়া দিলেন, কী বলছ?
অবনীর খাবার এ ঘরে দিয়ে যাও—
আচ্ছা।
একটু পরে স্নেহলতা এলেন। তার এক হাতে কাঁসার থালা, তাতে ঘি-মাখানো চিড়ে ভাজা, নারকেল-কোরা আর দুটো চমচম সাজানো। আরেক হাতে চায়ের কাপ।
স্নেহলতা বললেন, এখন তোমাকে ভাত দিলাম না অবনী—
অবনীমোহন বললেন, না না, এখনই ভাত খাব কী, সবে তো সন্ধে। এখন চা-ই খাই।
হেমনাথ অধীর হয়েই ছিলেন। বললেন, খেতে খেতে কলকাতার কথা বল। যুদ্ধের হালচাল কিরকম দেখে এলে, শোনাও–
চায়ে চুমুক দিয়ে অবনীমোহন বললেন, অবস্থা খুব খারাপ মামাবাবু। পরশুর আগের দিন রাত্তির থেকে কলকাতায় ব্ল্যাক আউট আর এয়ার-রেড প্রিকশানের মহড়া চলছে। চারদিকে কেমন একটা থমথমে ভাব।
এ কথা তো তুমি তখন বললে।
বলেছি নাকি?
হ্যাঁ। হেমনাথ ঘাড় কাত করলেন। সাগ্রহে শুধোলেন, তা মহড়াটা কিরকম হচ্ছে?
অবনীমোহন বলতে লাগলেন, সন্ধের পর কলকাতার সব আলো নিবিয়ে সাইরেন বাজানো হয়। শকুনের কান্নার মতো কাঁপা কাঁপা একটানা সুর। তখন রাস্তায় কেউ থাকতে পারে না। হয় কাছাকাছি কোনও বাড়ির ভেতর ঢুকে যেতে হবে। নইলে পার্ক টার্কের ট্রেঞ্চে গিয়ে লুকোতে হবে। তা না হলে এ-আর-পি’র লোকেরা ধরে নিয়ে যাবে। এক ঘণ্টা কি দুঘন্টা বাদে অল ক্লিয়ার সাউন্ড বাজলে আবার বাইরে বেরুনো চলবে।
তক্তপোষের একধারে বসে দম বন্ধ করে শুনে যাচ্ছিল বিনু, চোখে পলক পড়ছিল না। রাত্রিবেলা সব আলো নিবে যাবার পর নির্জন রাস্তায় একটানা কান্নার মতো কোনও সুর যদি বাজতে থাকে, কলকাতা শহর কতখানি ভীতিকর হয়ে উঠতে পারে? ভয়ের সে ছবিটা পুরাপুরি কল্পনা করতে পারল না বিনু, তবে তার গা ছমছম করতে লাগল।
হঠাৎ বিনু বলে উঠল, সাইরেন কী?
অবনীমোহন তার দিকে ফিরে বললেন, শত্রুদের বিমান আক্রমণের আগে হুঁশিয়ার করে দেবার জন্যে একরকম সুর বাজানো হয়, তাকে বলে সাইরেন।
বিনুর কৌতূহল অসীম। সে আবার বলল, এ-আর-পি কাকে বলে? ট্রেঞ্চ কী?
অবনীমোহন বুঝিয়ে দিলেন।
একটু চুপ।
তারপর হেমনাথের দিকে আবার ঘুরে অবনীমোহন বললেন, আপনি শেষ কবে কলকাতায় গিয়েছিলেন মামাবাবু?
এক মুহূর্তও না ভেবে হেমনাথ বললেন, নাইনটিন টোয়েন্টি ফাইভেসেই যেবার দেশবন্ধু মারা গেলেন। উঃ, কলকাতায় সে শোকের দৃশ্য কোনওদিন ভুলব না। বলতে বলতে অন্যমনস্ক, বিষণ্ণ হয়ে গেলেন হেমনাথ। তার চোখের সামনে শোকাচ্ছন্ন বিহ্বল মহানগর যেন ছবির মতো ফুটে উঠেছে।
অবনীমেহন বললেন, সেই কলকাতাকে এখন চিনতেই পারবেন না। পার্ক আর ফাঁকা জায়গা যেখানে যতটুকু পেয়েছে। ট্রেঞ্চ খুঁড়ে খুঁড়ে সর্বনাশ করে রেখেছে। শুধু কি ট্রেঞ্চ, প্রায় প্রত্যেকটা বাড়ির সদরে ব্যাফল ওয়াল তোলা হয়েছে, সেগুলোর সামনে বালির বস্তার স্তূপ। স্টেশনে, সিনেমা। হাউসে, রাস্তায়-ঘাটে–যেখানে যাবেন শুধু গভর্নমেন্টের পোস্টার।
কিসের পোস্টার?
নানা রকমের। যেমন গুজবে কান দেবেন না, গুজব রটাবেন না, দলে দলে সেনাবাহিনীতে নাম লেখান, দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ করলে ভারত রক্ষা আইনে গ্রেপ্তার হবেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।
হেমনাথকে বেশ চিন্তিত দেখাল। কপাল জুড়ে এলোমেলো গভীর রেখা ফুটতে লাগল তার। ধীরে ধীরে বললেন, তোমার কী মনে হয় অবনী?
কী ব্যাপারে? অবনীমোহন জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন।
কলকাতায় বোমা পড়তে পারে?
তার খুবই সম্ভাবনা।
কেমন করে বুঝলে?
অবনীমোহন বলতে লাগলেন, এই তো পরশুর আগের দিন এক সরকারি বড়কর্তা মিস্টার সেমন্ড রেডিওতে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। ফার ইস্টে অবস্থা যেভাবে ঘোরালো হয়ে উঠছে, তাতে কলকাতায় যে কোনওদিন বিমান আক্রমণ ঘটতে পারে। নইলে–
হেমনাথ শুধোলেন, নইলে কী?
এত ব্ল্যাক-আউট, এত ট্রেঞ্চ খোঁড়াখুঁড়ি আর এয়ার-রেড প্রিকশানের ঘটা চলছে কেন?
অন্যমনস্কের মতো হেমনাথ বললেন, তা তো বটেই। একটু চুপ করে থেকে গম্ভীর মুখে আবার বললেন, যুদ্ধ বাংলাদেশে এসে হাজির হলে সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। সব ছারখার হয়ে যাবে। ওয়ারের আফটার এফেক্ট যে কী, ভাবতেই শিউরে উঠছি।
