গান চলছে। তার মধ্যেই যুগল ডেকে উঠল, ছুটোবাবু—
চোখকান ধ্যানজ্ঞান বেদেনীদের দিকে রেখে সাড়া দিল বিনু।
যুগল শুধলো, এইটা কী গান জানেন?
না।
ভাসানের গান। মা মনসা আছে না?
হ্যাঁ।
মনসার গানেরে ভাসানের গান কয়। মনে কইরা রাইখেন।
বিনু মাথা হেলিয়ে দিল, মুখে কিছু বলল না।
যুগল আবার বলল, অখন থনে আপনেরা তো এই দ্যাশে থাকবেন। শাওন মাসের শ্যাষে যহন মনসা পূজা হইব তহন থিকা ঘরে ঘরে ভাসানের গান শুনতে পাইবেন।
তাই নাকি?
হ।
গানটানের পর সাপ খেলা দেখিয়ে ক্ষীর-মুড়কির ফলার করল বেদেনীরা। আরেক প্রস্থ পান তামাক খেল। তারপর বকশিস হিসেবে একডালা ধান, চার আনা পয়সা, কিছু আনাজপাতি আদায় করল।
পান চিবুতে চিবুতে আঞ্জুমান বলল, এইবার যাই গো বইনদিদি—
স্নেহলতা বললেন, এখনই যাবে?
হ। চকিদারে থাকতে তো দিব আড়াই দিন। এইর ভিতরে রাইজদার হগল বাড়ি যাইতে হইব। বাড়ি তো আর এউক্কা দু’গা না–
বেবাজিয়ানীরা সাপের ঝাপি, ধানের ডালা টালা মাথায় চাপিয়ে উঠে দাঁড়াল।
স্নেহলতা বললেন, আবার এস।
আঞ্জুমান বলল, এইবার আর আসন হইব না বইনদিদি। আইতে আইতে হেই ফিরা বচ্ছর।
হঠাৎ সেই কথাটা মনে পড়ে গেল স্নেহলতার। তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, চলে তো যাচ্ছ, ভাগনীকে শিকড় দিয়ে গেলে না?
আমার লগে তো নাই। নায়ে আছে। যুগইলারে আমার লগে পাঠাইয়া দ্যান, দিয়া দিমু অনে।
আঞ্জুমানদের সঙ্গে যুগলকে বেদে-বহরে পাঠিয়ে দিলেন স্নেহলতা।
.
২.০৫
অবনীমোহন বলেছিলেন, দিন সাতেকের ভেতর কলকাতার সব ব্যবস্থা করে ফিরে আসবেন। ফিরতে ফিরতে দু সপ্তাহ কেটে গেল।
সন্ধেবেলা পুবের ঘরের তক্তপোষে সুধা-সুনীতি-বিনু এবং ঝিনুক গা ঘেঁষাঘেঁষি করে পড়তে বসেছিল। তাদের সামনে দুটো ঝকঝকে হেরিকেন।
হেমনাথও এই ঘরেই আছেন। তক্তপোষের ধার ঘেঁষে একটা ক্যাম্প খাট। তার ওপর কাত হয়ে শুয়ে মূল বাল্মীকি রামায়ণ পড়ছেন।
সময়টা অঘ্রাণের মাঝামাঝি। নিয়ম অনুয়ায়ী পৌষ থেকে শীত শুরু। নিয়ম যা-ই থাক, এ বছর শীতের যেন আর তর সইছে না, তার বড় তাড়া। হেমন্ত থাকতে থাকতেই হিমঋতু এসে দরজায় দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করেছে। কদিন ধরেই এলোমেলো উত্তরে বাতাস ছেড়েছে। আজ যেন সেটা হিমালয়ের বরফ ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসছে। কাজেই বিনুরা চাদর বা কম্বল, যে যা পেরেছে তাই জড়িয়ে পড়তে বসেছে।
এখন কৃষ্ণপক্ষ। বাইরে যতদূর চোখ যায়, চাপ চাপ অন্ধকার। চাঁদটা আজ নিরুদ্দেশ। আকাশ পুকুর বা ধানখেত-কিছুই বোঝা যায় না। সব অদৃশ্য, নিরবয়ব। শুধু কাছাকাছি যে জোনাকিরা উড়ছিল তাদের দেখা যাচ্ছে। আলোর ছুঁচের মতো এই পোকাগুলো অন্ধকারকে বিধে বিধে যাচ্ছিল।
হঠাৎ বাইরের উঠোন থেকে অবনীমোহনের গলা ভেসে এল, বিনু, সুধাকে আছিস রে, একটা আলো, টালো নিয়ে আয়। বড্ড অন্ধকার–
বিনু তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। তারপর চেঁচামেচি জুড়ে দিল, বাবা এসেছে, বাবা এসেছে–
সুধা সুনীতি সামনের হেরিকেন দুটো নিয়ে বাইরে ছুটল। হেমনাথও রামায়ণ রেখে ব্যস্ত গলায় ডাকাডাকি শুরু করলেন, কোথায় গো, কোথায় গেলে সব–অবনী এসেছে–বলতে বলতে বাইরে এলেন। তার পিছু পিছু ঝিনুকও এল।
চেঁচামেচি শুনে রান্নাঘরের দিক থেকে স্নেহলতারাও ছুটে এলেন।
উঠোনের মাঝখানে অবনীমোহন দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার পেছনে তিন চারটে কুলি। কুলিদের মাথায় গন্ধমাদন চাপানো।
হেমনাথ বললেন, বড্ড ঠাণ্ডা। এস এস–ঘরে এস অবনী–
আলো দেখিয়ে অবনীমোহনকে ঘরে আনা হল। কুলিরা বারান্দায় মালপত্র নামিয়ে ভাড়া নিয়ে চলে গেল।
এখন সবাই অবনীমোহনকে ঘিরে বসে আছে। স্নেহলতা বললেন, তুমি কেমন মানুষ বল তো অবনী! সাতদিনের নাম করে গিয়ে চোদ্দ দিন কাটিয়ে এলে। না একটা খবর, না একটা কিছু।
অবনীমোহন অপ্রতিভের মতো হাসলেন, ঝামেলা মেটাতে মেটাতে দেরি হয়ে গেল।
হেমনাথ বললেন, আজ যে আসবে আগে জানালে না কেন? লালমোহন কি ভবতোষের ফিটন। নিয়ে স্টিমারঘাটে যেতাম। স্টিমারঘাট থেকে আমাদের বাড়ি তো একটুখানি পথ নয়। শুধু শুধু কষ্ট করতে গেলে।
অবনীমোহন বললেন, ভেবেছিলাম চিঠি লিখে জানাব। তারপর কেমন যেন আলস্য লেগে গেল। লিখি লিখি করে আর লেখা হল না।
সুরমা এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলেন। এবার মুখ বাঁকালেন, চিরদিন ওই এক স্বভাব।
আবনীমোহন হাসতে লাগলেন।
একটু নীরবতা। তারপর হেমনাথ বললেন, কলকাতার সব কাজ হয়ে গেছে তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আর যাবার দরকার নেই?
আজ্ঞে না। সমস্ত ঝাট চুকিয়েই এসেছি।
খানিক ভেবে হেমনাথ এবার শুধোলেন, তারপর বল, কলকাতায় গিয়ে কী দেখলে। ওখানকার হালচাল কী?
অবনীমোহন নড়ে চড়ে বসলেন। তাকে রীতিমতো উত্তেজিত দেখাল। বললেন, ওই ফিরেই আপনাকে খবরটা দেব, তা নয়। কথায় কথায় একেবারে ভুলে গেছি।
হেমনাথ উৎসুক হলেন, কী খবর?
আপনি যা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, অক্ষরে অক্ষরে তা মিলে গেছে মামাবাবু।
কিরকম, কিরকম?
সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। ইউরোপের যুদ্ধ বাংলাদেশের দিকে ছুটে আসছে। পরশু রাত্তিরে কলকাতায় প্রথম ব্ল্যাক-আউটের মহড়া হয়ে গেল। ট্রেঞ্চ খুঁড়ে খুঁড়ে শহরটার কী অবস্থা যে করেছে! পনের ষোল দিনের খবরের কাগজ এনেছি। পড়লেই বুঝতে পারবেন–
উত্তেজনায় হেমনাথের গলা কাঁপতে লাগল, কোথায় খববের কাগজ?
