স্নেহলতাও হাসলেন, তা তো দেখতেই পাচ্ছি।
আইজই আমরা রাইজদায় আইছি।
শুনেছি।
আঞ্জুমান বলতে লাগল, অন্য হগল বার এইহান থিকা যাওনের দিন আপনেগো বাড়ি আসি। এইবার কিলাম পেরথম দিনই আইলাম।
স্নেহলতা উত্তর দিলেন না। হাসিটুকু তার ঠোঁটে স্নিগ্ধ আভার মতো লেগে রইল।
আঞ্জুমান আবার বলল, এইবার রাইজদায় আইসা আমি আটাস (অবাক)!
স্নেহলতা উৎসুক হলেন, কেন?
বিহান বেলায় আপনেগো যুগইলার লগে এউকা সোন্দর ফুটফুইটা পোলা আমাগো বহরে গেছিল। শুনলাম পোলাগা নিকি আপনের নাতি। শুইনা আমার ধন্দ লাইগা গেল।
কেন?
আমি তো জানতাম আপনেগো পোলা মাইয়া নাই। নাই-ই যদিন, নাতিখান আইল কই থিকা? শ্যাষে যুগইলাই কইল, পোলাগা আপনের ভাগনীর ঘরের, কইলকাতা থিকা আসছে।
স্নেহলতা মাথা নাড়লেন, হ্যাঁ।
অঞ্জমান বলল, বিহান বেলায় নাতি গিয়া কইল সাপের খেলা দেখব, আমাগো আইতেও হইল। বড় মুখ কইরা নাতি দাওয়াত কইরা আইছে। হেই লেইগা পেরথম দিনই আইলাম।
ভাল করেছ।
টিয়াপাখির মতো লাল টুকটুকে ঠোঁট নেড়ে আঞ্জুমান বলল, মেলা কথা তো হইল। এইবার ভাগনী ভাগনী-জামাই দেখান। নাতিরে দেখছি, নাতিন দেখান।
স্নেহলতা বললেন, ভাগনী-জামাই তো দেখাতে পারব না। ক’দিন হল সে কলকাতায় গেছে। অন্য সবাই আছে, তাদের দেখাচ্ছি।
সুরমা সুধা এবং সুনীতির সঙ্গে আঞ্জুমানের আলাপ করিয়ে দিলেন স্নেহলতা।
আঞ্জুমান বলল, হগলের লগে আলাপ-সালাপ হইল, ভাগনী-জামাইরেই খালি দেখলাম না। আ আমার কপাল! বলতে বলতে তার চোখ সুরমার ওপর স্থির হল, আ গো বইনদিদি
স্নেহলতা সাড়া দিলেন কী বলছ?
ভাগনী আমাগো এমুন কাহিল ক্যান? শরীলখানে কিছু নাই য্যান ফুঁ দিলে উইড়া যাইব।
হ্যাঁ, ও ভারি রোগা। শরীরটা একেবারেই সারছে না। ওকে নিয়ে আমাদের বড্ড ভাবনা।
একটু চুপ করে থেকে আঞ্জুমান বলল, বাতাস লাগছে মনে লয়।
স্নেহলতা প্রায় হতাশার সুরেই বললেন, কী জানি, ক’বছর ধরেই তো এরকম চলছে। ডাক্তার কবিরাজ, ওষুধ বিষুধ বার মাস লেগেই আছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।
আঞ্জুমান বলল, ভাগনীরে একখান শিকড় দিয়া যামু। তামার তাবিজে ভইরা ভাগনীর কমরে (কোমরে) পরাইয়া দিয়েন। সাইরা যাইব।
আচ্ছা।
এবার সুধা সুনীতিকে ভাল করে লক্ষ করল আঞ্জুমান। বলল, কপালে সিন্দুর নাই, নাতিন দু’গা অবিয়াত মনে লাগে–
হ্যাঁ।
নাতিনগো বিয়ার সোময় দাওয়াত য্যান পাই। বলেই সুধা সুনীতির কাছে গিয়ে হাত ঘুরিয়ে ছড়া কাটল :
আইবা নি ভাই, যাইবা নি–
নাতিন খাওয়াইব সাধের মেজবানি!
বেদেনীর রকমসকম দেখে সুধা সুনীতি খিলখিল করে হেসে উঠল।
স্নেহলতা বললেন, নেমন্তন্ন তো করব, তোমাদের পাব কোথায়? ঘরদুয়ার কি কিছু আছে তোমাদের? সারা বছর শুধু ভেসে ভেসেই বেড়াও
কাক-পক্ষীর কাছে খবর দিয়া দিয়েন, ঠিক উড়াল দিয়া আইসা পড়ুম। আঞ্জুমান হাসতে লাগল।
খানিক নীরবতা।
তারপর আঞ্জুমান আবার শুরু করল, হগলের লগে দেখাশুনা হইল, হ্যামকত্তারেই খালি দেখি না।
তেনি কই?
স্নেহলতা বললেন, দুপুরবেলা আবদুলাপুর গেছে।
ফিরলে আমাগো কথা কইয়েন।
বলব।
পারলে আমাগো বহরে য্যান যায়।
আচ্ছা।
আঞ্জুমান বলল, আলাপ সালাপ হইয়া গেল। এইবার আমাগো পান-তামুক খাওয়ান গো বইনদিদি–
তার মুখ থেকে কথা খসবার আগেই যুগল আর করিম ছুটে গিয়ে তামাকের ডিবে, পানের ডাবর, আগুনের মালসা, হুঁকোটুকো নিয়ে এল। তারপর তামাক সেজে হুঁকোর মাথায় কলকে বসিয়ে আমাদের হাতে দিল। আঞ্জুমান এবং তার দুই সহচারী পালা করে তামাক খেতে লাগল এবং আয়েস করে নাকমুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে লাগল।
বিনু অবাক হয়ে গিয়েছিল। বেদেনী হলেও আঞ্জুমানেরা মেয়েমানুষ। আগে আর কখনও মেয়েমানুষকে তামাক খেতে দেখে নি বিনু। পায়ে পায়ে যুগলের কাছে এগিয়ে গিয়ে ডাকল, এই–
যুগল মুখ ফেরাল, কী ক’ন।
ফিসফিস গলায় বিনু বলল, ওই দেখ, বেজিয়ানীরা তামাক খাচ্ছে।
বিনু ঠিক কী বলতে চায়, বুঝতে না পেরে যুগল তাকিয়ে থাকল।
পরে খুব সহজ গলায় যুগল বলল, খাইব না ক্যান? নিশার জিনিস হগলেই খাইতে পারে। তার পুরুষমানুষ মাইয়ামানুষ নাই। খালি কি এই বাইদানীরাইকামারপাড়ায়, যুগীপাড়ায় ঘুইরা দ্যাখেন গা। হগল বাড়িতেই দু’গা চাউরগা কইরা মাইয়ামানুষ হুক্কা খায়।
যত সহজে যুগল কথাগুলো বলল, ঠিক তত সহজে মেনে নিতে পারল না বিনু। আবার কী বলতে যাচ্ছিল সে, ঠিক সেইসময় সাপের ঝাঁপি খুলল বেদেনীরা। তিনটে কাঁপ থেকে তিনটে কাল কেউটে বিদ্যুৎচমকের মতো সাঁ করে লেজের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াল।
এদিকে একটা বেদেনী তুমড়ি বাঁশ বার করে বাজাতে শুরু করেছে। বাঁশির তালে তালে সাপ তিনটে ফণা দোলাতে লাগল।
একজন বাঁশি বাজাচ্ছে। সাপের নাচের সঙ্গে সঙ্গে আঞ্জুমান সরু গলায় সুর করে গান ধরল :
চান্দ্ রাজার দাপট গেল বাতাসে মিশিয়া–
তৃতীয় বেদেনীটি গাইল :
হায় বিষহরির দোয়া!
আঞ্জুমান এক কলি করে গায়। তৃতীয় বেদেনীটি, হায় বিষহরির দোয়া’ বলে ধুয়ো ধরে। এই ভাবে গান চলতে লাগল।
বেউলা সতী কান্দে শোন আলুথালু হইয়া–
হায় বিষহরির দোয়া।
কালনাগিনী খাইল আজি সোনার লখাইরে–
হায় বিষহরির দোয়া।
সোনার অঙ্গ ভাসাইল গাঙ্গুনীর নীরে–
হায় বিষহরির দোয়া।
তাহার দোয়ায় সূর্য্য ওঠে পুবের আকাশে–
হায় বিষহরির দোয়া।
পরান পাইয়া ভেলায় বইসা লখাই হাসে–
হায় বিষহরির দোয়া।
