শুধু মিঠাই না, পাকা অমৃতসাগর কলা আর ক্ষীরাইও বিনুদের খেতে দিল আঞ্জুমান। খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে সারা বহর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিজেদের ঘর-সংসার দেখাতে লাগল।
মোট সাতখানা নৌকো। একটা নৌকোয় শুধু সাপের ঝাপি। ছোটবড়, চৌকো, গোল–নানা আকারের অগণিত বেতের ডালা পর পর সাজানো। সেগুলোর ভেতর অসংখ্য রকমের সাপ– শঙ্খচূড়, কালজাতি, দুধরাজ, খরিস, লাউডগা, পাহাড়ী অজগর, শামুকভাঙা, চন্দ্ৰবোড়া। আরও কত কী!
একেকটা ডালা খোলে আঞ্জুমান, আর বিদচমকের মতো সাঁ করে সাপগুলো লেজের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ায়। লিকলিকে সরু জিভ বার করে ফণা দোলাতে দোলাতে কুটিল চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। আঞ্জুমান তাদের নাম-ধাম বংশ-পরিচয় মুখস্থ বলার মতো গড় গড় করে বলে যায়। সাপ দেখতে দেখতে এবং তাদের ইতিহাস শুনতে শুনতে বুকের রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছিল বিনুর।
কোনও নৌকোয় শুধুই বিছানা। কালো চিটচিটে শতরঞ্চি-জড়ানো কাঁথা বালিশের স্তূপ একেবারে ছইয়ের মাথা পর্যন্ত ঠেকেছে। একটা নৌকোয় এসে দেখা গেল, সেখানে শুধু পশু আর পাখি। ছাগল, গরু, খচ্চর, ভেড়া, গোটা দুই বাঁদর এবং অগুনতি খাঁচার ভেতর নানারকম পাখি–শালিক, ময়না, টিয়া, মোহনচূড়া, ঝুটকলি, সিদ্ধিগুরু, কোড়াল, এমন কি বাজও রয়েছে।
আঞ্জুমানের পিছু পিছু ঘুরতে ঘুরতে শেষ নৌকোখানায় এসে পড়ল বিনুরা। বেবাজিয়া বহরের এটাই সব চাইতে ছোট নৌকো। আঞ্জুমান বলল, এইটা আমাগো পান্হা ঘর–
আঞ্জুমানকে অনেকক্ষণ দেখছে। বুড়ি বেদেনীর সহজ, আন্তরিক ব্যবহারে ভয় কেটে গিয়েছিল। বিনু শুধলো, পান্হা ঘর কী?
দেখ– সামনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল আঞ্জুমান।
দেখা গেল, উঁচু একটা বেদির ওপর মাটির সপ্তনাগ। তার মাথায় দেবী মনসার সিংহাসন। এমন মানসা-মূর্তি আগে আর কখনও দেখে নি বিনু। মাথার পেছন থেকে বরুণ ছত্র ধরেছে কালীয় নাগ। খরিস আর শঙ্খচূড় সাত লহর হার হয়ে বুকের কাছে ঝুলছে। মণিবন্ধে কঙ্কণ হয়েছে খৈজাতি। দেবীর সুডৌল বক্ষকুম্ভ কাঁচুলি হয়ে ঢেকেছে চক্রচুড় আর উদয়নাগ। লাউডগা আর কালচিতি, চন্দ্ৰবোড়া আর গোক্ষুর বুনে বুনে ঘাঘরা বানানো হয়েছে। দেবীর কটিতট থেকে তা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, আঙুলে আঙুলে অঙ্গুরী হয়েছে সুতোশঙ্খ। পায়ে জড়িয়ে জড়িয়ে মল হয়েছে দাঁড়াস। কর্ণভূষণ হয়ে দোদুল দুলছে সাদা চিতির ফণা। দেবীর চোখে বিষের কাজল, নিশ্বাসে গরল ঝরছে যেন অবিরল।
মনসামূর্তির সামনে অনেকগুলো ধুনুচি। সেগুলো থেকে ধূপের গন্ধ উঠে আসছে। খানকতক পেতলের সরাও চোখে পড়ল, সেগুলোতে কাঁচা দুধ আর সবরি কলা সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
আঞ্জুমান বেবাজিয়ানী বলল, এইটাই আমাগো আসল জাগা। মা মনসার ঘরে আমরা কুনো পাপ করি না, শত্রুরও যদি এইখানে আইসা আশয় লয় তার গায়ে হাত তুলি না। রোজ সন্ধ্যায় মনসার নামে এইখানে ছদ্গা (উৎসর্গ) হয়। আমরা বেবাইজা মাইয়ারা তখন ল্যাংটা হইয়া ধূপতি (ধুনুচি) নাচ নাচি। ‘ছদ্গা’র সময় পুরুষমানুষ এই ঘরে আইতে পারে না।
সবটা বুঝতে না পারলেও বিনু এটুকু বুঝল, এই পাহা ঘর বেদেদের কাছে অতি পবিত্র জায়গা। এখানে এমন কিছু তারা করে না যা অশুচি, যা অন্যায়, যা ধর্মবিরুদ্ধ।
আরও কিছুক্ষণ গল্পটল্প করার পর যুগল হঠাৎ বলল, অনেকখানি সোময় তোমাগো এইহানে কাটাইয়া গ্যালাম। অহন আমরা যাই।
আঞ্জুমান বলল, আইচ্ছা—
আমাগো বাড়ি যাইবা তো?
নিয্যস য্যামু। রাইজদায় আইসা হামকত্তার বাড়িত যামু না, আমার ঘেটিতে কয়টা মাথা! হেয়া ছাড়া–
কী?
কইলকাতা থনে তেনার নাতি আইছে, নাতিন আইছে, ভাগনী আইছে। যাইতে আমাগো হইবই। বিকালে যামু।
আইচ্ছা। এই বেলা ছুটবাবুরে কিছুই দেখাইলা না। উই বেলা গিয়া সাপখেলা দেখাইবা কিলাম।
দেখামু।
মনসার গান শুনাইবা—
শুনাম।
বিনু এইসময় বলে উঠল, যাবে কিন্তু। নিশ্চয়ই যাবে।
কিছুক্ষণ পর বাড়ির দিকে ফিরতে ফিরতে বেদেদের সম্বন্ধে আরও কিছু চমকপ্রদ খবর দিল। যুগল। এরা অদ্ভুত জাত। মনসা পুজোও করে, আবার কেউ কেউ নামাজও পড়ে। অনেক খ্রিস্টানও এখানে এসে জুটেছে। সাপখেলা, বাঁদারখেলা, ছাগলখেলা, নানারকম শারীরিক কসরত এবং ভেল্কিবাজি দেখিয়ে ওরা পয়সা রোজগার করে। তা ছাড়া, সাপে কামড়ালে ওঝাগিরিও করে। কিন্তু এসব দিনের আলোর ব্যাপার। রাতের অন্ধকারেই ওদের আসল খেলা–সেটা হল চুরি। যেখানে বেবাজিয়া বহর ভেড়ে সে জায়গায় বাসিন্দাদের চোখ থেকে ঘুম ছুটে যায়। সর্বক্ষণ তারা তটস্থ হয়ে থাকে।
আঞ্জুমান বেবাজিয়ানীরা এসেছে। রাজদিয়াতে এবার চুরির ধুম পড়ে যাবে।
.
বিকেলবেলা সত্যি সত্যিই আঞ্জুমান হেমনাথের বাড়ি এল। তার সঙ্গে এসেছে দু’টো যুবতী বেদেনী। আঞ্জুমান এবং তার সঙ্গিনীদের মাথায় পর পর সাজনো অনেকগুলো করে সাপের ঝাপি।
বাগান পেছনে ফেলে বার-বাড়ির উঠোনে পা দিয়েই আঞ্জুমান চিলের মতো সরু গলায় পেঁচিয়ে উঠল, কই গ্যালেন হগলে–
বেদেনীরা যে আসবে সে খবর বাড়ি ফিরে ওবেলাই দিয়ে রেখেছিল বিনু। আঞ্জুমানের গলা পেয়ে সুরমা সুধা সুনীতি স্নেহলতা বিনু কিংবা যুগল-কেউ আর ঘরে বসে থাকতে পারল না। এধার থেকে ওধার থেকে ছুটোছুটি করে বেরিয়ে এল।
মাথা থেকে সাপের ঝাপি মাটিতে নামাল আঞ্জুমান। তারপর স্নেহলতার দিকে ফিরে বলল, আইলাম গো বইনদিদি– বলে হাসল।
