হ। হে তো ঠিক কথাই। যুগল মাথা নাড়ল। তারপর চারদিকে তাকাতে তাকাতে বলল, হগলরে দেখতে পাই, কিন্তুক এই বহর যার হেই আঞ্জুমান বেবাইজানীরে তো দেখি না। হে গেল কই?
এই যে আমি পেছন দিক থেকে চিলের মতো তীক্ষ্ণ, সরু গলায় কেউ চেঁচিয়ে উঠল।
মুখ ফেরাতেই বিনু দেখতে পেল, সব চাইতে বড় নৌকোটার গলুইতে একটা বুড়ি দাঁড়িয়ে আছে। চুলগুলো পাটের ফেঁসোর মতো লালচে, জট পাকানো। গায়ের চামড়া কুঁচকে শিথিল। হঠাৎ দেখলে মনে হয়, ঢিলে একটা খোলসই বুঝি পরে আছে। সারা গায়ে বেবাজিয়া পুরুষদের মতো উল্কি এবং রুপোর ভারী ভারী গয়না–মেখলা, তেঁতুলপাতা হার, চুটকি, কানে গোলাকার মস্ত চাকতি।
এত বয়স হয়েছে আঞ্জুমানের, তবু চোখের দৃষ্টি আশ্চর্য সজীব। যেমন ধারাল তেমনি দূরভেদী। চিকন তীরের মতো তা বুঝি বুকের ভিতরে বিধে যায়।
যুগলও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। এক মুখ হেসে বলল, আরে, এই যে তুমি। আছ ক্যামন?
আঞ্জুমান বেবাজিয়ানী বলল, ভালাই। বলেই ভুরুর ওপর হাত রেখে শুধলো, তুমি কেউগা? চিনা চিনা লাগে–
আমার নাম যুগল–
যুগল! চোখমুখ কুঁচকে স্মৃতির ভেতর কিছুক্ষণ হাতড়ে বেড়াল আঞ্জুমান বেবাজিয়ানী। তারপর বলল, তোমারে কই দেখছি কও তো বাসী–
যুগল বলল, হ্যামকত্তার বাড়ি। আমি তেনার কাছে কামলা খাঁটি।
হ হ, এইবার মনে পড়ছে। চোখের তারায় হঠাৎ যেন আলো খেলে গেল আঞ্জুমান বেবাজিয়ানীর। সাগ্রহে শুধলো, হ্যমকত্তায় ক্যামন আছে?
যুগল বলল, ভালা, হ্যামকত্তায় কুনো সোময়ে মোন্দ থাকে না।
দেখা যাচ্ছে, এই ভবঘুরে যাযাবরের দলও হেমনাথকে চেনে। বিনু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল।
আঞ্জুমান বেবাজিয়ানী কী বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ তার চোখ এসে পড়ল বিনুর ওপর। কিছুক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, অ যুগইলা, এই পোলাগা ক্যাঠা?
যুগল বলল, হ্যামকত্তার নাতি।
তাই নিকি?
হ।
ক্যামন নাতি? আমি জানতাম হ্যামকত্তার পোলা-মাইয়া নাই। তয় এই নাতিখান আইল কই থনে?
অঞ্জুমান বেবাজিয়ানী সোজা সহজ হিসেবটাই ধরে নিয়েছে। অর্থাৎ ছেলেমেয়ে থাকলে তবেই তো নাতি-নাতনীর সম্ভাবনা। যার ছেলেমেয়ে নেই তার ও সব আসবে কোত্থেকে? আকাশ থেকে নিশ্চয়ই পড়তে পারে না!
বিনুর সঙ্গে হেমনাথের সম্পর্কটা বুঝিয়ে দিল যুগল।
আঞ্জুমান বলল, হেই কও। ভাগনীর পোলা। কিন্তুক–
কী?
আমরা তো বচ্ছর বচ্ছর রাইজদা আসি। আইলেই হ্যামকত্তার বাড়ি যাই। কিন্তুক তেনার ভাগনী, ভাগনীর ঘরের নাতি-নাতকুড়েরে তো দেখি নাই।
যুগল বলল দেখবা ক্যামনে? ওনারা তো এইখানে এই পেরথম আইল।
আঞ্জুমান বেবাজিয়ানী শুধলল, আগে আছিল কই?
বিনুরা কোথায় ছিল, যুগল জানিয়ে দিল।
এবার বিনুর দিকে ফিরে আঞ্জুমান বেবাজিয়ানী সস্নেহে ডাকল, আসো গো ভাই, আমাগো নায়ে আসো–
দেশ-দেশান্তরের বেদেদের সম্বন্ধে অনেক ভয়ঙ্কর গল্প শুনেছে বিনু। আঞ্জুমান বেবাজিয়ানী ডাকতে তার বুকের ভেতরটা গুরগুর করে উঠল। নিজের অজান্তে সে গিয়ে দাঁড়াল যুগলের পেছনে। ভীরু গলায় বলল, না।
এইটা ক্যামন কথা হইল! তুমি আমাগো হ্যামকত্তার নাতি। এই তরি (এখন পর্যন্ত) আইসা বহরে না আইলে মন নি ভালা লাগে? আসো আসো, ইট্টু মিঠাই খাইয়া যাও। তোমার নানার বাড়ি গিয়া আমরা কত কী খাইয়া আসি। কত খাতির পাই।
বিনু উত্তর দিল না, চুপ করে থাকল। তার মনোভাব বুঝতে পেরেছিল যুগল। বলল, আপনে কইলকাতার পোলা, বেবাইজা দেইখা ডরান?
বিনু এবারও চুপ।
যুগল বলল, অরা চিনা মানুষ। লন যাই। আহ্লাদ কইরা ডাকলে যাইতে হয়।
ভয়ও হচ্ছিল, আবার বেদে-বহর সম্বন্ধে অপার কৌতূহলও বোধ করছিল বিনু। সেদিন সুজনগঞ্জ থেকে ফেরার সময় হেমনাথ জানিয়েছিলেন, এই জলের দেশে বেবাজিয়ারা নৌকোয় নৌকোয় ভেসে বেড়ায়। নৌকোতেই তাদের ঘর-সংসার। এখানে শিশু জন্মায়, বুড়োরা মরে। যৌবন অসীম সম্ভবনায় এখানেই পুষ্পিত হয়ে ওঠে। জগতের বিচিত্র ভাসমান এই মানবগোষ্ঠী নৌকোর ওপরেই জীবনের ধারা অব্যাহত রাখে। শোক-দুঃখ, সুখ-আনন্দ, জন্ম-মৃত্যু, জীবনের এমন কোনও লীলাই নেই যা পাঁচ-সাতখানা হাজারমণী বিশাল নৌকোর মধ্যে ঘটে না যায়।
আঞ্জুমান বেবাজিয়ানী আবার ডাকল, আসো গো শ্যামকত্তার নাতি। আমাগো ঘর-গিরস্থালি দেইখা যাও। ডরের কিছু নাই–
বুড়ি বেদেনী কি অন্তর্যামী? বেদে-বহরের ভেতরটা দেখার খুবই ইচ্ছা, তবু নিজের থেকে বিনু হয়তো যেত না। যুগলই একরকম জোর করে তাকে বেদে-বহরে নিয়ে তুলল।
আঞ্জুমান বেবাজিয়ানী শুধলো, আগে কী করবা কও?
বেদেনী কী বলতে চায়, বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকল বিনু।
আঞ্জুমান এবার বুঝিয়ে দিল, আগে পান-তামুক-মিঠাই খাইবা, না আমাগো ঘর-গিরস্থালি দেখবা?
বিনু বলল, পান-তামাক আমি খাই না।
বুড়ি বেদেনী বেশ রঙ্গিণী। কপালে একটা চাপড় মেরে বলল, আ আমার কপাল!
ভয়ে ভয়ে বিনু শুধলো, কী হল?
রসাল কৌতুকের গলায় আঞ্জুমান বেবাজিয়ানী বলল, পান খাও না, তামুক খাও না, কেমনতরো পুরুষ তুমি! বলতে বলতে বাদামী ভুরুর তলায় তার নীলচে চোখের মণি খাঁচার পাখির মতো ছটফট করতে লাগল।
বিনু এবার আর কিছু বলল না। তার মুখচোখ দেখে আঞ্জুমান কী বুঝল, কে জানে। তাড়াতাড়ি বলে উঠল, থাউক থাউক, পান-তামুক খাইতে হইব না। বলতে বলতে আঙুলের ডগায় বিনুর থুতনিটা তুলে অল্প অল্প নাড়তে লাগল, অখনও মোচ গজায় নাই, এক্কেরে পোলাপান। আগে দাড়িমোচ গজাউক, পুরুষমানুষ হও। হের পর পান-তামুক খাইও। অহন মিঠাই খাও।
